
নিজস্ব প্রতিবেদক
কার্যক্রম নিষিদ্ধ আওয়ামী লীগ এবারের নির্বাচনে নেই। তবু নির্বাচনের আলোচনায় দলটির ভোটই এখন বড় প্রশ্ন। কে ভোট দিতে যাবেন। কে যাবেন না। আর গেলে কার দিকে যাবে সেই সমর্থন। এই দ্বিধা আর ভয়ই তৃণমূলে সবচেয়ে বেশি শোনা যাচ্ছে।
ঠাকুরগাঁওয়ে আওয়ামী লীগের সাবেক মন্ত্রী রমেশ চন্দ্র সেনের মৃত্যুর পর একটি ঘটনা রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ হয়ে ওঠে। বিএনপির প্রার্থী ও মহাসচিব মির্জা ফখরুল ইসলাম আলমগীর যান সমবেদনা জানাতে। কিছুক্ষণ পর সেখানে দেখা যায় জামায়াতের প্রার্থী দেলোয়ার হোসেনকেও। প্রতিদ্বন্দ্বী দুই প্রার্থী একই বাড়িতে ছুটে যাওয়ার পেছনে মূল লক্ষ্য একটাই- আওয়ামী লীগের ভোট।

ভোট বর্জন বার্তা, কিন্তু মাঠের বাস্তবতা ভিন্ন
আওয়ামী লীগ বলছে ভোট বর্জনের কথা। সামাজিক মাধ্যমে প্রচারণা চলছে। “নো বোট, নো ভোট”। এমন স্লোগানও দেখা যাচ্ছে। সজীব ওয়াজেদ জয়ও একে “সাজানো নির্বাচন” বলে ভোট না দেওয়ার আহ্বান জানিয়েছেন।
কিন্তু মাঠপর্যায়ে চিত্র একরকম নয়। অনেক সাধারণ সমর্থকের মধ্যে ভয় কাজ করছে। কেউ কেউ মনে করছেন, ভোট না দিলে তারা চিহ্নিত হয়ে পড়বেন। আবার ভোট দিলে অন্তত নিজেদের অস্তিত্ব জানান দেওয়া যাবে। এমন ভাবনাও আছে।
তৃণমূলে দুই রকম হিসাব
পরিচয় গোপন রেখে এক তৃণমূল নেতা জানান, তিনি ভোটে যাবেন না। তার যুক্তি পরিষ্কার। নেত্রীর নির্দেশ মানা। আর ভোটে না গেলে উপস্থিতি কমবে। উপস্থিতি কম হলে নির্বাচন নিয়ে গ্রহণযোগ্যতার প্রশ্ন উঠবে। এটাই তাদের হিসাব।
অন্যদিকে কিছু সমর্থক বলছেন, ভোটে না গেলে আক্রান্ত হওয়ার ঝুঁকি বাড়ে। তারা মনে করছেন, এলাকায় টিকে থাকতে হলে ভোটকেন্দ্রে যেতেই হবে। ভয়ই তাদের প্রধান কারণ।
আরও একটি কারণও উঠে আসে। অনেকের মধ্যে সংশয় আছে আওয়ামী লীগ ফিরতে পারবে কি না। ফলে কেউ কেউ যে কোনো একটা সাইডে সরে যাওয়ার চেষ্টা করছেন। ব্যবসা-বাণিজ্য, সামাজিক অবস্থান, নিরাপত্তা। সবকিছু মিলিয়ে তারা নতুন আশ্রয় খুঁজছেন। দলগুলো থেকেও চাপ আসছে বলে অভিযোগ আছে।
আওয়ামী লীগের ভোট কতটা- নিশ্চিত তথ্য নেই
আওয়ামী লীগের ভোটব্যাংক কতটা অবশিষ্ট আছে, তার সুনির্দিষ্ট তথ্য নেই। তবে অতীতের নির্বাচনী হিসাব আলোচনায় আসে। নির্বাচন কমিশনের হিসাবে ১৯৭৩ সালে দলটির সর্বোচ্চ ভোট ৭৩ শতাংশ। ১৯৭৯ সালে তা নেমে যায় ২৪ শতাংশে, যা ইতিহাসের সর্বনিম্ন। এরপর ধীরে ধীরে ভোট বাড়ে। ২০০৮ সালে তা ৪৮ শতাংশে পৌঁছেছিল।
বিশ্লেষকদের কেউ কেউ ধারণা করছেন, বর্তমান পরিস্থিতিতে আওয়ামী লীগের সমর্থন ২০ থেকে ৩০ শতাংশের মধ্যে থাকতে পারে। ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও বিশ্লেষক জোবাইদা নাসরীন মনে করেন, আওয়ামী লীগকে নির্বাচনের সুযোগ না দিলে বড় একটি ভোটারগোষ্ঠী কার্যত বাইরে থেকে যায়। এতে অন্তর্ভুক্তিমূলক নির্বাচন প্রশ্নের মুখে পড়ে।
‘গেইম চেঞ্জার’ কেন
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী ও বিশ্লেষকদের মতে, আওয়ামী লীগের ভোট এবারের নির্বাচনে তিনভাবে গুরুত্বপূর্ণ।
এক, আওয়ামী ভোটাররা কেন্দ্রে গেলে ভোটার উপস্থিতি বাড়তে পারে। না গেলে উপস্থিতি কমে যেতে পারে।
দুই, আওয়ামী ভোটাররা যদি কোনো একটি দলে বেশি ঝুঁকে পড়ে, ফলাফলে বড় প্রভাব পড়তে পারে।
তিন, আওয়ামী ভোটাররা না গেলেও যদি ভোটের হার বেশি থাকে, তাহলে সেটি আওয়ামী লীগের জন্য নতুন রাজনৈতিক বার্তা হয়ে দাঁড়াতে পারে।
রাষ্ট্রবিজ্ঞানী সাব্বির আহমেদের ধারণা, আওয়ামী লীগের মোট ভোট যদি ৩০ শতাংশ ধরা হয়, তার বড় অংশ ভোটে যাবে না। পাঁচ থেকে দশ শতাংশ যেতে পারে। এর বেশি হওয়ার সম্ভাবনা কম। তবে এই ছোট অংশও যদি কোনো একদিকে ঝুঁকে পড়ে, ফল পাল্টে দিতে পারে।
শেষ কথা
এ নির্বাচনে লড়াই কেবল বিএনপি-জামায়াতের মধ্যে নয়। আওয়ামী লীগের ভবিষ্যৎ অবস্থানও অনেকটা নির্ভর করছে এই ভোটের ওপর। ভোট বর্জনের আহ্বান একদিকে। তৃণমূলের ভয় আর টিকে থাকার বাস্তবতা অন্যদিকে। আর এই টানাপড়েনের মাঝেই আজ বৃহস্পতিবারের ভোটের চিত্র তৈরি হবে।





