বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি: দক্ষিণ এশিয়ার দাবার বোর্ডে নতুন চাল

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

বাংলাদেশ–যুক্তরাষ্ট্র বাণিজ্য চুক্তি এখন শুধু শুল্কছাড়ের খবর নয়। এটি দক্ষিণ এশিয়ার ভূরাজনীতিতে এক নতুন সমীকরণের সূচনা। ১ শতাংশ শুল্ক কমার আর্থিক স্বস্তির সঙ্গে যুক্ত হয়েছে প্রতিরক্ষা ক্রয়, জ্বালানি বিকল্প ও ডিজিটাল নীতির মতো দীর্ঘমেয়াদি অঙ্গীকার। ফলে প্রশ্ন উঠেছে—এটি কি কেবল বাজারসুবিধার চুক্তি, নাকি আঞ্চলিক শক্তির দাবার বোর্ডে বাংলাদেশের অবস্থান পুনর্নির্ধারণের একটি কৌশলগত চাল। লাভ-ক্ষতির অঙ্ক তাই কেবল রপ্তানির টেবিলে নয়; রাষ্ট্রের নীতিস্বাধীনতার পরিসরেও।

এই চুক্তির ইতিবাচক দিক অস্বীকার করার সুযোগ নেই। যুক্তরাষ্ট্র বাংলাদেশের প্রধান রপ্তানি বাজার। শুল্ক কমা মানে কিছু পণ্যে দামের প্রতিযোগিতা বাড়বে। বিশেষ করে পোশাক খাতে। সেখানে শ্রমিকের জীবন-জীবিকা জড়িত। রপ্তানির ধারাবাহিকতা জড়িত। বৈদেশিক মুদ্রার স্থিতি জড়িত। বৈশ্বিক মন্দা ও অর্ডার অনিশ্চয়তার সময়ে বাজার ধরে রাখাও এক ধরনের নিরাপত্তা।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, সুবিধাটির চরিত্র কী। এটি কি নিখাদ বাজারভিত্তিক ছাড়। নাকি শর্তযুক্ত ছাড়। শুল্ক ছাড়ের সঙ্গে যদি নির্দিষ্ট উৎস থেকে কাঁচামাল নেওয়ার বাধ্যবাধকতা জুড়ে থাকে, তবে তা “সাপ্লাই চেইনের স্বাধীনতা” সীমিত করে। একদিকে স্বস্তি দেয়। অন্যদিকে নির্ভরতা বাড়ায়। স্বল্পমেয়াদে লাভ দেখা যায়। দীর্ঘমেয়াদে প্রতিযোগিতা ও দরকষাকষির ক্ষমতা কমে যায়।

চুক্তির সবচেয়ে স্পর্শকাতর দিক প্রতিরক্ষা অধ্যায়। সেখানে বলা হয়েছে, বাংলাদেশ মার্কিন সামরিক সরঞ্জাম কেনা বাড়ানোর চেষ্টা করবে। একই সঙ্গে নির্দিষ্ট কিছু দেশ থেকে ক্রয় সীমিত করবে। এটি বাণিজ্যচুক্তির স্বাভাবিক ভাষা নয়। প্রতিরক্ষা ক্রয় সিদ্ধান্ত হওয়ার কথা কৌশলগত প্রয়োজন, সক্ষমতা, রক্ষণাবেক্ষণ, প্রযুক্তি স্থানান্তর এবং বাজেট—এসব বিবেচনায়। কিন্তু যখন তা শুল্ক ছাড়ের বিনিময়ে অঙ্গীকারে পরিণত হয়, তখন একটি রাষ্ট্রের নীতিনির্ধারণের জায়গা সংকুচিত হওয়ার ঝুঁকি তৈরি হয়।

এর পরেই আসে জ্বালানি ও পারমাণবিক প্রশ্ন। চুক্তিতে এমন বিধিনিষেধ রয়েছে, যাতে বাংলাদেশ এমন কোনো দেশ থেকে পারমাণবিক চুল্লি, জ্বালানি বা ইউরেনিয়াম কিনতে পারবে না যা মার্কিন স্বার্থের ক্ষতি করে বলে বিবেচিত। শব্দগুলো কূটনৈতিক। কিন্তু পরিণতি বাস্তব। জ্বালানি নিরাপত্তা বহু দশকের পরিকল্পনা। সেখানে বিকল্প দরজা খোলা রাখা রাষ্ট্রের শক্তি। কোনো চুক্তি যদি সেই দরজা আগেই সরু করে দেয়, ভবিষ্যৎ সরকারগুলোর সামনে দরকষাকষির জায়গা কমে।

ডিজিটাল অধ্যায়ে ঝুঁকি আরও সূক্ষ্ম। ডেটা প্রবাহ, ডিজিটাল করনীতি, সাইবার সহযোগিতা—এসব বিষয়ে বাধ্যতামূলক কাঠামো ভবিষ্যতের ডিজিটাল অর্থনীতি নিয়ন্ত্রণে প্রভাব ফেলতে পারে। আজকের ডিজিটাল নীতি মানে আগামী দিনের রাজস্ব। মানে ভোক্তা অধিকার। মানে ডেটা সুরক্ষা। উন্নয়নশীল দেশ হিসেবে বাংলাদেশ কখনো কখনো ডেটা লোকালাইজেশন বা ডিজিটাল সেবায় কর আরোপের মতো সিদ্ধান্ত নিতে পারে। ভবিষ্যৎ নীতির এই জায়গাগুলো যদি আগেই সংকুচিত হয়, ক্ষতি পরে এসে ধরা দেয়।

এখন আসা যাক আঞ্চলিক প্রভাবের কথায়। দক্ষিণ এশিয়ায় “চাল” কখনো একা থাকে না। এর প্রতিক্রিয়া ঢেউয়ের মতো ছড়ায়। ভারতের চোখে এটি দুইভাবে পড়তে পারে। একদিকে, রপ্তানি প্রতিযোগিতায় বাংলাদেশ কিছু সুবিধা পেতে পারে। অন্যদিকে, যুক্তরাষ্ট্রের সঙ্গে বাংলাদেশের এমন চুক্তি একটি কৌশলগত বার্তাও দেয়। আঞ্চলিক ভারসাম্যে একটি নতুন সংযোগ রেখা তৈরি হয়।

চীনের ক্ষেত্রে বিষয়টি আরও জটিল। বাংলাদেশের শিল্প আমদানির বড় অংশ চীননির্ভর। যন্ত্রাংশ, কাঁচামাল, ইলেকট্রনিক্স—সবকিছুর সঙ্গে চীনের সরবরাহ শৃঙ্খল জড়িত। প্রতিরক্ষা ক্ষেত্রেও বাংলাদেশের পূর্ববর্তী ক্রয়-বাস্তবতা বিবেচনায় আনতে হবে। “নির্দিষ্ট দেশ থেকে ক্রয় সীমিত” ধরনের ধারা বাস্তবে প্রয়োগ হলে সরবরাহ, দাম, রক্ষণাবেক্ষণ এবং কৌশলগত ভারসাম্য—সবখানেই চাপ তৈরি হতে পারে।

পাকিস্তান প্রসঙ্গে সরাসরি ধারা কম হলেও দক্ষিণ এশিয়ার রাজনীতিতে ত্রিভুজ সবসময় সক্রিয়। ভারত–চীন–পাকিস্তান সমীকরণে বাংলাদেশ প্রায়ই পরোক্ষভাবে আলোচনায় আসে। এই চুক্তি সেই আঞ্চলিক গণনায় যুক্তরাষ্ট্রকে আরও দৃশ্যমান করে। ফলে ঢাকার কূটনীতি আগের চেয়ে বেশি সূক্ষ্ম হতে বাধ্য।

সবচেয়ে বড় প্রশ্ন হলো সময় ও প্রক্রিয়া। অন্তর্বর্তী সরকারের মেয়াদের শেষ পর্যায়ে এমন চুক্তির বৈধতা শুধু স্বাক্ষরে নেই। বৈধতা আসে স্বচ্ছতায়। জনআলোচনায়। খাতভিত্তিক প্রস্তুতিতে। সংসদীয় পর্যালোচনায়। রাষ্ট্রীয় অঙ্গীকার যখন প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও ডিজিটালের মতো উচ্চ-সার্বভৌম বিষয়ে যায়, তখন প্রক্রিয়ার গুরুত্ব দ্বিগুণ হয়।

এই সম্পাদকীয় কোনো সহজ সিদ্ধান্তে যেতে চায় না। চুক্তি দরকার হতে পারে। বাজারও দরকার। কিন্তু নীতি ও সার্বভৌমতার প্রশ্নে “দামের ট্যাগ” স্পষ্ট থাকা দরকার। তাই আমাদের প্রস্তাব পাঁচটি।

প্রথমত, চুক্তির পূর্ণাঙ্গ পাঠ ও সব সংযুক্তি জনসমক্ষে প্রকাশ করতে হবে। বাংলা ব্যাখ্যাসহ খাতভিত্তিক সারসংক্ষেপ দিতে হবে।

দ্বিতীয়ত, অর্থনীতি, প্রতিরক্ষা, জ্বালানি ও ডিজিটাল নীতির বিশেষজ্ঞদের নিয়ে একটি স্বাধীন প্রভাব-সমীক্ষা করতে হবে। দ্রুতও হতে পারে। কিন্তু হালকা হতে পারবে না।

তৃতীয়ত, চুক্তিতে নিয়মিত পর্যালোচনার ব্যবস্থা থাকতে হবে। যাতে নির্বাচিত সরকার প্রয়োজনে বিতর্কিত ধারাগুলো পুনঃআলোচনা করতে পারে।

চতুর্থত, প্রতিরক্ষা ক্রয় সিদ্ধান্তকে বাণিজ্য ছাড়ের সঙ্গে বাঁধা যাবে না—এটি নীতিগতভাবে স্পষ্ট করতে হবে। রাষ্ট্রের নিরাপত্তা নীতি কোনো বাজার সুবিধার উপধারায় চলতে পারে না।

পঞ্চমত, ডিজিটাল নীতিতে ভবিষ্যৎ নীতিস্বাধীনতা রক্ষায় “লাল দাগ” নির্ধারণ করতে হবে। ডেটা সুরক্ষা, করনীতি, জাতীয় নিরাপত্তা—এসব বিষয়ে রাষ্ট্রের হাত বাঁধা চলবে না।

এই চুক্তির লাভ আছে। তা বাস্তব। কিন্তু ক্ষতির সম্ভাবনাও বাস্তব। ক্ষতি যদি হয়, সেটি ধীরে আসে। নীরবে আসে। তখন “শুল্ক ১% কমেছিল” বাক্যটি ইতিহাসে ছোট হয়ে যায়। বড় হয়ে দাঁড়ায় নীতিস্বাধীনতা কতটা কমেছিল—সেই প্রশ্ন। দক্ষিণ এশিয়ার দাবার বোর্ডে নতুন চাল হয়েছে। এখন দরকার বাংলাদেশের নিজের ঘুঁটির নিরাপদ অবস্থান নিশ্চিত করা।

১২ ফেব্রুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...