নির্বাচনের পথে বিষবাষ্প

Date:

spot_img

বিশেষ প্রতিনিধি

আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ঘিরে দেশের রাজনীতিতে যে উত্তেজনা জমছে, তা কেবল প্রচার-প্রতিযোগিতার স্বাভাবিক উত্তাপ নয়—এটি এক ধরনের সামাজিক মনস্তত্ত্বও তৈরি করছে। যেখানে ভিন্নমতকে প্রতিপক্ষ নয়, শত্রু ভাবার প্রবণতা বাড়ছে। কথার লড়াই যখন যুক্তি-তর্কের সীমানা ছাড়িয়ে কটূক্তি, অবমাননা এবং ব্যক্তিগত আক্রমণে গড়ায়, তখন তা কেবল রাজনৈতিক সংস্কৃতিকে ক্ষতিগ্রস্ত করে না। নাগরিক জীবনের নিরাপত্তা, নির্বাচন ব্যবস্থার গ্রহণযোগ্যতা এবং গণতান্ত্রিক ভবিষ্যৎকেও অনিশ্চিত করে তোলে। নির্বাচন মানে মতের প্রতিদ্বন্দ্বিতা, ক্ষমতার বদল, নীতির বিতর্ক—কিন্তু সহিংসতা, হুমকি আর উসকানি কখনও নির্বাচনের ‘অবশ্যম্ভাবী’ অনুষঙ্গ হতে পারে না।

অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে রাজনীতি

ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনকে সামনে রেখে দেশের রাজনীতি কিছুটা অসহিষ্ণু হয়ে উঠছে—এমন পর্যবেক্ষণ কাগজের পাতায় থাকলেও বাস্তব রাস্তাঘাটে এর প্রতিফলন উদ্বেগজনকভাবে স্পষ্ট। প্রচারের ভাষা যত কঠিন হচ্ছে, ততই প্রতিপক্ষকে ‘অগ্রহণযোগ্য’ হিসেবে চিহ্নিত করার প্রবণতা বাড়ছে। ধর্ম, মুক্তিযুদ্ধ, রাষ্ট্রীয় পরিচয়—সবই টেনে আনা হচ্ছে প্রতিশ্রুতি যাচাইয়ের বদলে চরিত্রহননের উপকরণ হিসেবে। রাজনীতির মাঠে তর্ক থাকবে, সমালোচনা থাকবে কিন্তু যখন বক্তব্যে পরোক্ষ-প্রত্যক্ষ হুমকি, ষড়যন্ত্রের অভিযোগ আর ব্যক্তিগত আক্রমণের সুর জোরালো হয়, তখন সাধারণ মানুষও বিভক্তির রাজনীতিতে টেনে নেওয়া হয়—এটাই সবচেয়ে বিপজ্জনক।

কথার আগুন থেকে ঘটনার আগুনে
শুধু বক্তব্যেই নয়, ঘটনাপ্রবাহেও উত্তাপ বাড়ছে। নির্বাচন ঘিরে দেশে একের পর এক সহিংসতার খবর সামনে আসছে—গুলি, অবৈধ অস্ত্র, হামলা, প্রাণহানি—এসব ইঙ্গিত দেয় যে রাজনৈতিক প্রতিযোগিতা কোথাও কোথাও ‘ক্ষমতার প্রদর্শনীতে’ রূপ নিচ্ছে। বিশেষ করে নতুন বছরের শুরুতেই নির্বাচনী প্রেক্ষাপটে সহিংস ঘটনা এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি নিয়ে জনমনে উদ্বেগ বাড়ার কথাও উঠে এসেছে সংবাদ প্রতিবেদনে।
কেরানীগঞ্জে রাজনৈতিক সহিংসতার সঙ্গে গুলির ঘটনার প্রসঙ্গও সংবাদমাধ্যমে এসেছে, যা দেখায় মাঠপর্যায়ে উত্তেজনা কতটা বিপজ্জনক হতে পারে।
ঢাকার প্রার্থী এনসিপির নাসির উদ্দিন পাটোয়ারীর ওপর ডিম ও ময়লা পানি নিক্ষেপের মতো ঘটনা প্রথম দৃষ্টিতে ‘প্রতীকী অপমান’ মনে হলেও আসলে তা সামাজিক শিষ্টাচারের ভাঙন। এই ভাঙনই পরে বড় সংঘাতে রূপ নিতে সময় নেয় না।

রাজনৈতিক দলের দায়িত্ব: প্রতিদ্বন্দ্বীকে শত্রু বানাবেন না

নির্বাচনের সময় দলগুলো সাধারণত নিজেদের ‘কোর ভোট’ ধরে রাখতে উত্তেজক ভাষা ব্যবহার করে কারণ সহজ আবেগ দ্রুত জনসমর্থন জোগায়। কিন্তু রাষ্ট্র পরিচালনার আকাঙ্ক্ষায় দাঁড়ানো কোনো দলকে মনে রাখতে হবে—আজকের প্রতিপক্ষই আগামী দিনের সংসদে সহযাত্রী; গণতন্ত্রের ভিত্তি ‘সহাবস্থান’। যখন শীর্ষ নেতারা পরস্পরকে ‘নিশানা’ করে কথা বলেন, মাঠপর্যায়ে কর্মী-সমর্থকেরা সেটাকে ‘অনুমোদন’ হিসেবে ধরে নেয়। ফলে উসকানি দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, ছোট ঘটনা বড় হয়ে যায়। রাজনৈতিক দলগুলোর উচিত প্রচারনীতিতে স্পষ্টভাবে সহিংসতাবিরোধী অবস্থান নেওয়া, প্রার্থী ও কর্মীদের জন্য আচরণবিধি কঠোর করা এবং উত্তেজক বক্তব্যে শাস্তির নজির তৈরি করা। মতের পার্থক্য থাকবে—কিন্তু ভাষা ও আচরণে শালীনতা না থাকলে নীতির আলোচনা আর সমাজে পৌঁছায় না।

আইনশৃঙ্খলা ও নির্বাচন ব্যবস্থাপনা: নিরপেক্ষতা না থাকলে আস্থা থাকে না

নির্বাচনী পরিবেশ শান্ত রাখতে আইনশৃঙ্খলা বাহিনী ও প্রশাসনের ভূমিকা সবচেয়ে সংবেদনশীল। সহিংসতার ঘটনার দ্রুত তদন্ত, অপরাধী শনাক্ত, এবং রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে ব্যবস্থা—এই তিনটি জায়গায় সামান্য পক্ষপাতের ধারণাও জনআস্থা নষ্ট করে। সহিংসতার খবরে বারবার যখন একই প্রশ্ন ওঠে—“কারা জড়িত, কারা ছাড় পায়”—তখন বোঝা যায় আস্থার জায়গায় ফাঁক তৈরি হয়েছে। সংবাদমাধ্যমে যে ধরনের নির্বাচনী সহিংসতা ও অবৈধ অস্ত্র ব্যবহারের আশঙ্কা উঠে এসেছে, তা কেবল ‘ঘটনা’ নয়—এটি ‘ব্যবস্থার সক্ষমতা’ নিয়েও প্রশ্ন তোলে।
নির্বাচনের মাঠকে নিরাপদ রাখতে চাইলে প্রশাসনকে দৃশ্যমান ও সমান আচরণের বার্তা দিতে হবে—এটাই প্রতিরোধের সবচেয়ে কার্যকর উপায়।

নাগরিক সমাজ ও গণমাধ্যম: উত্তেজনা নয়, সত্যের শৃঙ্খলা

এ ধরনের সময় গণমাধ্যম ও সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের ভূমিকাও দ্বিমুখী—একদিকে সচেতনতা তৈরি করতে পারে, অন্যদিকে ভুল তথ্য, গুজব ও উসকানিকে বহুগুণ বাড়াতে পারে। তাই সংবাদ পরিবেশনে দায়িত্বশীলতা, তথ্য যাচাই, এবং উত্তেজনা ছড়ায় এমন ভাষা এড়িয়ে চলা জরুরি। একই সঙ্গে নাগরিক সমাজ—শিক্ষক, পেশাজীবী, সাংস্কৃতিক সংগঠন, তরুণেরা—রাজনৈতিক সহিংসতাকে ‘দলের ব্যাপার’ বলে ছেড়ে দিলে চলবে না। কারণ সহিংসতার খেসারত শেষ পর্যন্ত দেয় সাধারণ মানুষ: নিরাপত্তাহীনতা, বিভাজন, অর্থনৈতিক ক্ষতি, আর ভোটাধিকার নিয়ে অনিশ্চয়তা। রাজনৈতিক পরিবেশ ক্রমে অসহিষ্ণু হয়ে ওঠার যে উদ্বেগ বিভিন্ন লেখালেখিতেও উঠে এসেছে, তা আমাদের সতর্ক করে দেয়—এখনই লাগাম না টানলে পরে ক্ষতি বড় হবে।

কীভাবে উত্তাপ কমানো যায়

এখন সবচেয়ে প্রয়োজন তিনটি ন্যূনতম ঐকমত্য। প্রথমত, সব দলকে প্রকাশ্যে ঘোষণা দিতে হবে—হুমকি, ঘৃণা-ভাষণ, ব্যক্তিগত আক্রমণ ও সহিংসতা কোনোভাবেই গ্রহণযোগ্য নয়; প্রমাণ মিললে দলীয় শাস্তি হবে। দ্বিতীয়ত, নির্বাচন কমিশন ও প্রশাসনের সমন্বয়ে দ্রুত প্রতিক্রিয়া ব্যবস্থাপনা দরকার—কোথাও সংঘাতের আশঙ্কা দেখা দিলে আগেভাগেই সংলাপ, নজরদারি, এবং আইনগত ব্যবস্থা। তৃতীয়ত, প্রার্থীদের বক্তব্য ও প্রচারের একটি ন্যায্য মাঠ নিশ্চিত করা—কারও সভা ভাঙচুর, কারও পোস্টার ছিঁড়ে ফেলা, কারও ওপর অপমানজনক হামলা—এসবকে ‘রাজনীতির অংশ’ বানালে নির্বাচনের নৈতিক ভিত্তি ধসে পড়ে।

শেষ কথা: ভোটের পথে গণতন্ত্র বাঁচুক

নির্বাচন গণতন্ত্রের উৎসব—কিন্তু উৎসব তখনই উৎসব থাকে, যখন মানুষ ভয় ছাড়া ভোটকেন্দ্রে যেতে পারে, ভিন্ন মত প্রকাশ করতে পারে, এবং পরাজিত পক্ষও ফলকে রাজনৈতিকভাবে মোকাবেলা করতে পারে। রাজনীতি যদি অসহিষ্ণু হয়ে ওঠে, তবে তা কেবল একটি নির্বাচনের সমস্যা নয়—এটি ভবিষ্যৎ প্রজন্মের রাজনীতি শেখার পদ্ধতিকে বিষাক্ত করে। তাই আজই সিদ্ধান্ত নিতে হবে: আমরা কি প্রতিদ্বন্দ্বিতাকে গণতান্ত্রিক সৌন্দর্যে ফিরিয়ে আনব, নাকি উত্তেজনা-সহিংসতার অন্ধকারে দেশকে ঠেলে দেব? ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন সামনে—এই মুহূর্তটিই রাজনীতিকে সংযত, শালীন ও সহনশীল পথে ফেরানোর সবচেয়ে বড় সুযোগ।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...