
আসন্ন ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচন ও গণভোটকে ঘিরে আনুষ্ঠানিক প্রচারণা শুরু হয়েছে। নির্বাচনের আবহে দেশজুড়ে রাজনৈতিক উত্তাপ বাড়বে—এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু প্রচারণার নামে জনচলাচলে বিঘ্ন সৃষ্টি করে সড়ক-মহাসড়ক দখল করে সভা-সমাবেশ, মিছিল-শোডাউন বা যানবাহনের বহর—এসব আর “স্বাভাবিক” নয়; এগুলো জনজীবনের উপর সরাসরি চাপ, অর্থনীতির উপর বাড়তি বোঝা এবং আইনশৃঙ্খলার জন্য অপ্রয়োজনীয় ঝুঁকি। তাই নির্বাচন কমিশন (ইসি) যখন স্পষ্ট করে বলছে—জনগণের চলাচলে বিঘ্ন ঘটাতে পারে এমন সড়ক, মহাসড়ক ও জনপথে জনসভা-পথসভা বা সমাবেশ করা যাবে না—তখন এটিকে কেবল একটি বিধিনিষেধ হিসেবে নয়, গণতান্ত্রিক শিষ্টাচারের মৌল শর্ত হিসেবে দেখাই উচিত।
বাংলাদেশের শহর—বিশেষত ঢাকা—আগেই যানজটে ক্লান্ত। সামান্য একটি সড়ক বন্ধ হলে জরুরি সেবা, রোগী পরিবহন, শিক্ষার্থী, কর্মজীবী মানুষ—সবাই ক্ষতিগ্রস্ত হয়। নির্বাচন আসলে মানুষের অধিকার নিশ্চিত করার উৎসব; কিন্তু যদি সেই উৎসবই সাধারণ মানুষের জীবনে দুর্ভোগ বাড়ায়, তাহলে নির্বাচনের নৈতিক ভিত্তিই প্রশ্নের মুখে পড়ে। ইসি’র নির্দেশনা তাই সময়োপযোগী: প্রচারণা হবে, কিন্তু জনজীবন অচল করে নয়; প্রতিদ্বন্দ্বিতা হবে, কিন্তু শিষ্টতা-আইনের সীমারেখা লঙ্ঘন করে নয়।
ইসি’র আচরণবিধিমালায় পোস্টার নিষিদ্ধ, পরিবেশ-ক্ষতিকর অপচনশীল সামগ্রী নিষেধ, ব্যানার-লিফলেটের সাদা-কালো সীমা, অনুমতি ও সমন্বয়ের বাধ্যবাধকতা, যানবাহনে প্রচারসামগ্রী না লাগানো, যান্ত্রিক বাহন নিয়ে শোডাউন না করা, তোরণ-ক্যাম্প-দেয়াল লিখন নিষিদ্ধ—এসবের মূল কথা একটাই: ব্যক্তি বা দলের প্রচারণার সুবিধা, জনস্বার্থকে অগ্রাহ্য করতে পারে না।অতীতে আমরা দেখেছি—দেয়াল লিখন, পোস্টার-ব্যানার, প্লাস্টিক-রেক্সিনের জঞ্জাল শহরের সৌন্দর্য নষ্ট করে, ড্রেনেজ বন্ধ করে জলাবদ্ধতা বাড়ায়, পরিশেষে পরিষ্কার-পরিচ্ছন্নতার ভার গিয়ে পড়ে নাগরিকের করের অর্থে। প্রচারণা শেষ হয়, কিন্তু বর্জ্য থেকে যায়; ভোগান্তি থেকে যায়। তাই বিধিনিষেধ মানে “প্রচার বন্ধ” নয়; বরং “দায়িত্বশীল প্রচার” নিশ্চিত করা।
তবে কাগজে আইন থাকলেই বাস্তবে শৃঙ্খলা আসে না—এখানেই বড় চ্যালেঞ্জ। আচরণবিধিমালা কার্যকর করতে হলে তিনটি বিষয় জরুরি।
প্রথমত, সমান প্রয়োগ। আইন যদি কেবল দুর্বলদের উপর পড়ে, শক্তিশালীরা ছাড় পেয়ে যায়—তাহলে বিধিমালা পরিণত হয় প্রহসনে। ইসি, প্রশাসন ও আইনশৃঙ্খলা বাহিনীকে রাজনৈতিক পরিচয় নির্বিশেষে একই মানদণ্ডে ব্যবস্থা নিতে হবে। অনুমতি ছাড়া সমাবেশ, সড়ক অবরোধ, শব্দদূষণ, বিধি ভঙ্গ করে ব্যানার-ফেস্টুন—এসবের ক্ষেত্রে দ্রুত ও দৃশ্যমান ব্যবস্থা নিতে না পারলে নিয়মের প্রতি ভয়-সম্মান তৈরি হবে না।
দ্বিতীয়ত, পূর্বপ্রস্তুতি ও সমন্বয়। বিধিমালা বলছে, কর্মসূচি আগে জমা, একই স্থানে একাধিক কর্মসূচি হলে কর্তৃপক্ষ সমন্বয় করবে, অনুমতির কপি নির্বাচন অফিসে জমা, ২৪ ঘণ্টা আগে পুলিশকে জানানো—এসব প্রক্রিয়া যেন “কাগজপত্রের বিড়ম্বনা” না হয়, বরং বাস্তবসম্মত সমাধান হয়। কোথায় সভা হবে, কখন হবে, কীভাবে হবে—এটা আগে ঠিক হলে সংঘর্ষের আশঙ্কাও কমে, জনদুর্ভোগও কমে।
তৃতীয়ত, প্রচারণার সংস্কৃতিগত বদল। আধুনিক নির্বাচনী প্রচারণা মানে সড়ক দখল নয়—এখন ডিজিটাল যোগাযোগ, ছোট পরিসরের উঠান বৈঠক, ওয়ার্ডভিত্তিক মতবিনিময়, পাড়া-মহল্লায় নির্ধারিত স্থানে শৃঙ্খল সমাবেশ, নীতিনির্ভর বিতর্ক—এসবই কার্যকর হতে পারে। প্রার্থীর পরিচয়, কর্মসূচি, প্রতিশ্রুতি—এসব জনসম্মুখে উপস্থাপন হোক যুক্তি দিয়ে, ভিড় দেখিয়ে নয়। শব্দের আগ্রাসন নয়, কর্মপরিকল্পনার স্বচ্ছতা হোক প্রচারের প্রধান অস্ত্র।
আরেকটি বিষয়ও স্মরণ রাখা দরকার: ইসি নিষেধ করেছে ব্যক্তিগত কুৎসা, অশালীন আক্রমণ, ধর্মীয়/সাম্প্রদায়িক উসকানি, উপাসনালয়-শিক্ষাপ্রতিষ্ঠান-সরকারি অফিসে প্রচারণা—এসব নিষেধাজ্ঞা শুধু আইন নয়, সামাজিক শান্তির রক্ষাকবচ। নির্বাচনী উত্তেজনায় বিভাজনের রাজনীতি সহজেই মাথাচাড়া দেয়। একটি দায়িত্বহীন বক্তব্য মুহূর্তে সমাজে আগুন লাগাতে পারে। তাই প্রার্থী-দল—সবাইকে মনে রাখতে হবে, ক্ষমতা আসা-যাওয়া করে; কিন্তু সমাজে ক্ষত তৈরি হলে তা দীর্ঘস্থায়ী হয়।
সর্বোপরি, নির্বাচন কমিশনের এই বার্তা স্পষ্ট: গণতন্ত্রের পথে হাঁটতে হলে নিয়ম মেনে হাঁটতে হবে। প্রচারণা নাগরিক অধিকার, কিন্তু নাগরিকের শান্তি, চলাচল, নিরাপত্তা ও পরিবেশ—এসবের উপর আঘাত করে নয়। রাজনৈতিক দলগুলোরও এটি বুঝতে হবে—জনদুর্ভোগ সৃষ্টি করে জনসমর্থন পাওয়া যায় না; বরং ক্ষোভ জমে। সুশৃঙ্খল, জনবান্ধব প্রচারণাই রাজনৈতিক পরিপক্বতার পরিচয়।
এখন দেখার বিষয়—নিয়ম কাগজে থাকবে, নাকি মাঠেও থাকবে। ইসি যদি কঠোরতা ও নিরপেক্ষতার সঙ্গে বিধিমালা প্রয়োগ করে, প্রশাসন যদি রাজনৈতিক চাপের ঊর্ধ্বে উঠে দায়িত্ব পালন করে, আর দলগুলো যদি জনস্বার্থকে অগ্রাধিকার দেয়—তাহলেই নির্বাচন হতে পারে উৎসবমুখর, শান্তিপূর্ণ এবং সত্যিকারের অর্থে গণতান্ত্রিক। জনচলাচলে বিঘ্ন ঘটিয়ে নয়—জনমানসে আস্থা তৈরি করেই হোক নির্বাচনী প্রচারণা।





