
আলী কদর পলাশ
২৫ জানুয়ারি ২০২৬—সাবেক বিবিসি সাংবাদিক স্যার মার্ক টালির মৃত্যু সংবাদ আমাদের সামনে আবারও একটি পুরোনো কিন্তু জরুরি সত্যকে দাঁড় করায়। যুদ্ধের ময়দানে শুধু বন্দুকই নয়, সত্য—আর সত্যকে বহন করার সাহস—ইতিহাসকে বদলে দেয়। বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের সময় পাকিস্তানি সামরিক শাসনের কঠোর নিয়ন্ত্রণ, সেন্সরশিপ, ভয়ভীতি এবং প্রচারণার ঘন কুয়াশার ভেতর থেকে নিরপেক্ষ সংবাদ তুলে ধরা ছিল প্রায় অসম্ভব। সেই অসম্ভবকে সম্ভব করার কাজে যাঁরা ভূমিকা রেখেছিলেন, মার্ক টালি তাঁদের অন্যতম।
মুক্তিযুদ্ধের দিনগুলোতে দেশের ভেতরের সংবাদপত্রগুলো কার্যত ছিল দখলদার বাহিনীর নিয়ন্ত্রণে। “কী ঘটছে”—এই প্রশ্নের উত্তর তখন স্থানীয় গণমাধ্যমে পাওয়া যেত না। পাওয়া যেত নির্দেশিত বিবৃতি, সাজানো বয়ান আর ভয়ের ছায়া। অন্যদিকে সীমান্তের ওপার থেকে প্রচারিত অনেক খবরও ছিল আবেগমিশ্রিত, অসম্পূর্ণ বা যাচাইবিহীন। ঠিক এই শূন্যতায় বিবিসির মতো আন্তর্জাতিক গণমাধ্যম এক ধরনের ভরসার জায়গা হয়ে ওঠে—আর সেই ভরসার নাম হয়ে ওঠেন মার্ক টালি। রেডিওর সামনে বসে সাধারণ মানুষ অপেক্ষা করত “সঠিক খবর” শোনার জন্য—এটা কোনো ব্যক্তিপূজা নয়; এটা ছিল তথ্যের তৃষ্ণার স্বাভাবিক প্রতিক্রিয়া।
এই প্রেক্ষাপটে মার্ক টালির অবদানকে শুধু “একজন বিদেশি সাংবাদিকের কাজ” বলে সীমিত করলে আমরা ইতিহাসের গভীরতা হারাই। ১৯৭১-এর যুদ্ধ শুধু ভূখণ্ডের লড়াই ছিল না; ছিল সত্য বনাম মিথ্যার, মানবতা বনাম নৃশংসতার, আর ন্যায়বোধ বনাম রাষ্ট্রীয় সন্ত্রাসের সংঘর্ষ। সেই সংঘর্ষে আন্তর্জাতিক জনমত গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রেখেছে। আন্তর্জাতিক জনমত তৈরি হয় মূলত তথ্য দিয়ে—বিশ্বকে জানাতে হয় কোথায় কী ঘটছে। সেন্সরশিপের দেয়াল ভেঙে ঘটনাকে ভাষা দেওয়াই ছিল সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ। মার্ক টালির প্রতিবেদনে যে বিষয়টি বিশেষভাবে উজ্জ্বল—তা হলো “নিরপেক্ষতা”কে তিনি কাগুজে শব্দ হিসেবে নেননি; বরং ভয়, চাপ এবং রাজনৈতিক ক্ষোভের মুখেও সেটিকে পেশাগত নীতির মতো ধারণ করেছেন।
শুধু রিপোর্টিং নয়, মুক্তিযুদ্ধকালে তাঁর কাজ আমাদের জন্য আরও একটি গুরুত্বপূর্ণ পাঠ রেখে যায়—সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় শক্তি হচ্ছে বিশ্বাসযোগ্যতা। যুদ্ধের সময় মানুষ কেবল খবর চায় না, সত্য চায়; এবং সত্যের সঙ্গে তারা এমন একটি কণ্ঠ খোঁজে, যে কণ্ঠ আতঙ্কে কাঁপে না, পক্ষপাতের উল্লাসে অন্ধ হয় না। তাই একাত্তরে বাংলাদেশে “বিবিসি মানেই মার্ক টালি”—এই কথার গভীরে আছে সংবাদমাধ্যমের প্রতি জনমানুষের আস্থার ইতিহাস। আস্থার সেই জায়গা গড়ে ওঠে বছরের পর বছর ধরে তৈরি করা পেশাদার মান, যাচাই, নৈতিকতা এবং সাহসের ওপর ভিত্তি করে। এটাই সাংবাদিকতার সবচেয়ে বড় সম্পদ—এবং সবচেয়ে বড় দায়।
সরকারি স্বীকৃতি হিসেবে তাঁকে ‘মুক্তিযুদ্ধ মৈত্রী সম্মাননা’ প্রদান করা হয়েছে—এটি কেবল একজন ব্যক্তিকে সম্মান নয়; এটি সাংবাদিকতাকে সম্মান। কারণ মুক্তিযুদ্ধ শুধু অস্ত্রের জয়ে স্বাধীনতা অর্জন করেনি; সত্যের পক্ষের মানুষদের সম্মিলিত ভূমিকা সে স্বাধীনতাকে বিশ্বদরবারে ন্যায়সঙ্গত করেছে। মার্ক টালির মতো সাংবাদিকেরা সেই “সত্যের পক্ষ”কে দৃশ্যমান করেছিলেন।
আজকের বাংলাদেশে—যেখানে তথ্যের সংকট নেই, বরং তথ্যের অতিভার; যেখানে রেডিওর বদলে ফোনের স্ক্রল, আর একটিমাত্র বিশ্বস্ত বুলেটিনের বদলে হাজারো কন্টেন্ট—সেখানেও মার্ক টালির শিক্ষা প্রাসঙ্গিক। এখন সেন্সরশিপ অনেক সময় দৃশ্যমান নয়; থাকে অ্যালগরিদমে, থাকে গুজবে, থাকে ট্রলের হুমকিতে, থাকে পক্ষপাতদুষ্ট প্রচারণার “শব্দদূষণে”। তথ্যের যুগে সত্য চাপা পড়ে যেতে পারে “খুব বেশি তথ্য” দিয়েই। তাই সাংবাদিকতার মূল কাজ আজও একই: যাচাই করা, ভারসাম্য রাখা, মানবিকতা বজায় রাখা, আর ক্ষমতার মুখোমুখি দাঁড়িয়ে সঠিক প্রশ্ন তোলা।
মার্ক টালির জীবনের আরেকটি দিকও স্মরণযোগ্য—তিনি উপমহাদেশকে কেবল ‘কভার’ করেননি; তিনি এই অঞ্চলের ইতিহাস, মানুষ, রাজনীতি, ধর্মীয় ও সামাজিক টানাপড়েনকে বুঝতে চেয়েছেন। ‘দূর থেকে দেখা’ আর ‘ভেতর থেকে বোঝা’—এই দুইয়ের মধ্যে যে পার্থক্য, পেশাদার সাংবাদিকতার জন্য সেটিই সবচেয়ে জরুরি। সেই উপলব্ধি আমাদের মিডিয়ার জন্যও গুরুত্বপূর্ণ: ঘটনাকে শুধু শিরোনামে আটকে না রেখে প্রেক্ষিত, দায় এবং মানবিক পরিণতি দেখাতে পারলে সাংবাদিকতা সত্যিকার অর্থে সমাজের সেবা হয়।
মার্ক টালির মৃত্যুতে আমরা একজন কণ্ঠ হারালাম, কিন্তু তাঁর রেখে যাওয়া উত্তরাধিকার আমাদের জন্য একটি মানদণ্ড: যুদ্ধের সময়, সংকটের সময়, ক্ষমতার কড়াকড়ির সময়—সাংবাদিকতা যদি সত্যের পাশে দাঁড়ায়, তবে তা ইতিহাসের অংশ হয়ে যায়। আর সত্যের পাশে দাঁড়াতে যে সাহস লাগে, সেটাই একজন সাংবাদিককে কেবল সংবাদদাতা নয়—মানবতার সাক্ষী করে তোলে।
বাংলাদেশের মুক্তিযুদ্ধের ইতিহাসে যে বন্ধুত্বের নামগুলো লেখা আছে, সেখানে মার্ক টালি নিঃসন্দেহে একটি উজ্জ্বল নাম। এই নাম আমাদের মনে করিয়ে দেয়—সত্যের বন্ধুতা কোনো সীমান্ত মানে না।
২৭ জানুয়ারি, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা





