
সুমন চক্রবর্তী
শরতের নীল আকাশ। মাঠের ধারে সাদা কাশফুল। ভোরের বাতাসে শিউলির গন্ধ। প্রকৃতির এই চিরচেনা রূপের সঙ্গে এবার যোগ হয়েছে ঢাকের অপেক্ষা। দেশজুড়ে যেন পুজো পুজো গন্ধ লেগেছে।
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় উৎসব শারদীয় দুর্গাপূজাকে সামনে রেখে দেশের মন্দির ও পূজামণ্ডপগুলো এখন শেষ মুহূর্তের প্রস্তুতিতে ব্যস্ত। কোথাও প্রতিমায় পড়ছে শেষ রঙের তুলির আঁচড়, কোথাও তৈরি হচ্ছে প্যান্ডেল। চলছে আলোকসজ্জা, তোরণ নির্মাণ ও মণ্ডপ সাজানোর কাজ। মৃৎশিল্পী, সাজসজ্জাকর্মী ও আয়োজকদের ব্যস্ততা বাড়ছে প্রতিদিন।
ঢাকা থেকে চট্টগ্রাম, বরিশাল থেকে দিনাজপুর, ফরিদপুর, মুন্সিগঞ্জ, রাজশাহী, যশোরসহ বিভিন্ন জেলা ও উপজেলা থেকে একই চিত্র পাওয়া যাচ্ছে। একই সঙ্গে শান্তিপূর্ণ ও উৎসবমুখর পরিবেশ নিশ্চিত করতে স্থানীয় প্রশাসন, আইনশৃঙ্খলা বাহিনী এবং পূজা উদযাপন কমিটিগুলোও প্রস্তুতি নিচ্ছে।
মুন্সিগঞ্জে এবার ৩৫৭টি স্থায়ী ও অস্থায়ী মণ্ডপে দুর্গাপূজার আয়োজন হচ্ছে। দিনাজপুরের ১৩ উপজেলায় প্রস্তুতি চলছে ১ হাজার ৩১৭টি মণ্ডপে। বরিশাল জেলা ও মহানগরে ৬৩৭টি এবং ফরিদপুরে ৭৮১টি মণ্ডপে পূজা আয়োজনের প্রস্তুতি চলছে। চট্টগ্রাম নগর ও জেলায় আড়াই হাজারের কাছাকাছি মণ্ডপে আয়োজনের প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে।
দেশের বিভিন্ন এলাকার মতো যশোরের মণিরামপুরেও পূজার আমেজ ছড়িয়ে পড়েছে। সেখানে এবার ১০৩টি মন্দিরে দুর্গাপূজা অনুষ্ঠিত হবে বলে জানিয়েছেন বাংলাদেশ পূজা উদযাপন ফ্রন্টের কেন্দ্রীয় কমিটির সদস্য ও মণিরামপুর উপজেলা শাখার আহ্বায়ক সন্তোষ স্বর।
মণিরামপুরের বিভিন্ন পূজামণ্ডপ ঘুরে দেখা গেছে, মৃৎশিল্পীরা দিনরাত কাজ করছেন। বাঁশ, খড়, সুতলি ও মাটির কাঠামো পেরিয়ে প্রতিমাগুলো এখন পূর্ণ অবয়ব পাচ্ছে। কোথাও চলছে রং করা, কোথাও অলংকার ও সাজসজ্জার কাজ। দুর্গার পাশাপাশি লক্ষ্মী, সরস্বতী, কার্তিক, গণেশ ও অসুরের প্রতিমাও তৈরি করছেন শিল্পীরা।
সন্তোষ স্বর জানান, প্রতিমা তৈরির কাজ প্রায় শেষ পর্যায়ে। পাশাপাশি ডেকোরেশন, প্যান্ডেল ও আলোকসজ্জার কাজও এগিয়ে চলছে। এবার আরও সুন্দর ও উৎসবমুখর পরিবেশে দুর্গাপূজা উদযাপনের প্রত্যাশা করছেন তারা।
মণিরামপুরের মশিয়াহাটি, হাজিরহাট, ঢাকুরিয়া ও মোহনপুরে প্রতিবছরই বড় পরিসরে পূজার আয়োজন হয়। এবারও এসব এলাকার আয়োজকেরা সাজসজ্জায় বিশেষ গুরুত্ব দিচ্ছেন।
মোহনপুর সার্বজনীন কালী ও দুর্গাপূজা মন্দিরে চলছে বড় আয়োজন। মন্দির কমিটির সভাপতি দেবাশীষ সরকার বাবু, সাধারণ সম্পাদক মদনমোহন ঘোষ এবং সহসম্পাদক সুকান্ত ঘোষ টপি জানান, প্রতিমা, সাজসজ্জা ও আলোকসজ্জাকে ঘিরে তারা এবার বিশেষ প্রস্তুতি নিয়েছেন। কুষ্টিয়া থেকে বিশেষ আলোকসজ্জার সরঞ্জাম আনার কথাও জানিয়েছেন আয়োজকেরা।
শুধু মণিরামপুর নয়, দেশের বিভিন্ন জেলার পূজামণ্ডপে এবার আলোকসজ্জা ও নান্দনিক উপস্থাপনার পাশাপাশি নিরাপত্তার বিষয়টিকেও গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে। বিভিন্ন জেলা প্রশাসনের প্রস্তুতি সভায় মণ্ডপে স্বেচ্ছাসেবক রাখা, সিসি ক্যামেরা স্থাপন, নিরবচ্ছিন্ন বিদ্যুৎ সরবরাহ, যানজট নিয়ন্ত্রণ এবং আইনশৃঙ্খলা পরিস্থিতি স্বাভাবিক রাখার ওপর জোর দেওয়া হয়েছে।
শারদীয় দুর্গোৎসব কেবল ধর্মীয় আচারেই সীমাবদ্ধ থাকে না। এটি বাঙালির দীর্ঘদিনের সামাজিক ও সাংস্কৃতিক উৎসবও। মণ্ডপে মণ্ডপে তাই পূজা ও অঞ্জলির পাশাপাশি থাকবে সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান, প্রসাদ বিতরণ এবং আত্মীয়স্বজন ও পরিচিতজনের মিলন।
সনাতন ধর্মীয় বিশ্বাস অনুযায়ী, অসুর শক্তির বিনাশ এবং শুভ শক্তির জয়ের প্রতীক দেবী দুর্গা। প্রতিবছরের মতো এবারও ভক্তরা দেশ, মানুষ ও পরিবারের শান্তি, কল্যাণ ও সমৃদ্ধির প্রার্থনা করবেন।
১০ অক্টোবর মহালয়ার মধ্য দিয়ে দেবীপক্ষের সূচনা হবে। এরপর ১৬ অক্টোবর থেকে দুর্গাপূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হবে। এবারের তিথি বিন্যাসে সপ্তমীর আচার ১৭ ও ১৮ অক্টোবর পর্যন্ত বিস্তৃত। ১৯ অক্টোবর মহাষ্টমী, ২০ অক্টোবর মহানবমী এবং ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর মধ্য দিয়ে শেষ হবে শারদীয় দুর্গোৎসব।
এবার দুর্গাপূজাকে ঘিরে সরকারি কর্মচারীরা টানা পাঁচ দিনের ছুটি পাচ্ছেন। ২০ অক্টোবর মহানবমী ও ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর ছুটির সঙ্গে ২২ অক্টোবর অতিরিক্ত ছুটি এবং পরের দুই দিনের সাপ্তাহিক ছুটি মিলিয়ে ২০ থেকে ২৪ অক্টোবর পর্যন্ত ছুটি থাকবে।
আর এর আগেই দেশজুড়ে শুরু হয়েছে উৎসবের ক্ষণগণনা। মাটির প্রতিমায় শিল্পীর শেষ স্পর্শ, নতুন কাপড় কেনার ব্যস্ততা, মণ্ডপে আলো ঝোলানোর প্রস্তুতি আর শরতের বাতাসে শিউলির গন্ধ জানান দিচ্ছে, দুয়ারে শারদীয়া।





