
আলী কদর পলাশ
বিশ্ব রাজনীতির সবচেয়ে নির্ভরযোগ্য ঘটনা হলো- যে মানুষ ক্ষমতায়, তার হাতে “শান্তি” শব্দটা সবচেয়ে বেশি নিরাপদ। আর যে মানুষ ক্ষমতার বাইরে, তার মুখে “মানবতা” শব্দটা সবচেয়ে বেশি ব্যবহৃত হয়। দুই শব্দের এই জোট বাঁধার পর যে বাক্যটি তৈরি হয়, সেটাই এখন আন্তর্জাতিক নীতিবাক্য। “আমার পক্ষে যা, সেটাই মানবতা, আমার ফল যা, সেটাই শান্তি।”
এই সূত্র মেনেই ভেনেজুয়েলার বিরোধী নেত্রী ও নোবেলজয়ী মারিয়া কোরিনা মাচাদো বলছেন, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্পের পদক্ষেপ মানবতার জন্য বিরাট পদক্ষেপ এবং ট্রাম্প “নোবেল শান্তি পুরস্কারের যোগ্য।” শুনতে একটু অবাক লাগলেও অবাক হওয়ার দরকার নেই। কারণ এখন নোবেল শান্তি পুরস্কারও অনেক সময় শান্তির পুরস্কার নয়।শান্তির স্লোগানের পুরস্কার।
এখন প্রশ্ন হলো, ভেনেজুয়েলায় ট্রাম্প কী এমন “মানবতা” উদ্ধার করলেন, যে মানবতা এত বড় যে নোবেলের মঞ্চও ছোট হয়ে গেল? মানবতা কি মাচাদোর দলীয় কার্যালয়ে থাকে? না কি মানবতা থাকে ওয়াশিংটনের কূটনৈতিক হোয়াইটবোর্ডে। যেখানে দেশের নামগুলো লেখা হয় রং দিয়ে, আর জনগণের নাম থাকে অদৃশ্য কালি দিয়ে?
মাচাদোর বক্তব্যের অর্থ খুব পরিষ্কার। তিনি ট্রাম্পকে নোবেল দেওয়ার কথা বলছেন, কারণ ট্রাম্প তার রাজনৈতিক উদ্দেশ্যের জন্য কার্যকর। এটাই স্বাভাবিক। বিরোধী রাজনীতিতে বাইরে থেকে “মুক্তিদাতা” চাওয়া নতুন কিছু নয়। দুনিয়ার ইতিহাসে বহুবার দেখা গেছে—বিপদের সময় মুক্তিদাতা ডাকলে সে আসে কিন্তু মুক্তির বিনিময়ে সে “পাওনা”ও নিয়ে যায়। তারপর মুক্তিদাতার নাম বদলে হয় “হস্তক্ষেপকারী।”
এখানে সবচেয়ে ব্যঙ্গাত্মক বিষয় হলো—মাচাদো নিজে নোবেলজয়ী। তাই তার মুখে “নোবেল-যোগ্য” শব্দটি শুনলে মনে হয়, যেন একজন মুদ্রণযন্ত্র নিজেই নতুন নোট ছাপার অনুমতি দিলেন। কিন্তু মুদ্রণযন্ত্রেরও কাগজ লাগে, কালি লাগে। আর রাজনীতির নোবেল মুদ্রণের জন্য লাগে ক্ষমতার অনুমোদন।
ট্রাম্পের ক্ষেত্রে “শান্তি” মানে কী—এটা বিশ্ব জানে। শান্তি মানে এমন এক পরিস্থিতি, যেখানে যুদ্ধ হবে না। যদি তোমার শর্ত মানা হয়। শান্তি মানে এমন এক সমাধান, যেখানে তোমার পছন্দের সরকার থাকবে, তোমার পছন্দের চুক্তি হবে, তোমার পছন্দের বাজার খুলবে। এটাকে কূটনীতি বলা হয় কিন্তু বাস্তবে এটি হলো “শান্তির নামে শর্ত”।
আর নোবেল শান্তি পুরস্কার—যে পুরস্কার একসময় যুদ্ধ থামানোর স্বীকৃতি ছিল—এখন অনেক সময় হয়ে দাঁড়ায় রাজনৈতিক বার্তার আন্তর্জাতিক স্ট্যাম্প। কেউ যুদ্ধ বন্ধ করেও পায়, কেউ যুদ্ধ শুরুর আগেই পায়, কেউ যুদ্ধকে “প্রতিরোধ” বানিয়ে ফেলেও পায়। তাই ট্রাম্পকে নোবেল-যোগ্য বলাটা অবাস্তব নয়, এটা বরং নোবেল ব্যবস্থার সমসাময়িক বাস্তবতার সঙ্গে সামঞ্জস্যপূর্ণ।
কিন্তু ভেনেজুয়েলার মানুষের প্রশ্ন আলাদা। তাদের প্রশ্ন হলো—এই নোবেল, এই ট্রাম্প, এই “মানবতার বিরাট পদক্ষেপ”—এসবের মধ্যে তাদের খাদ্য, ওষুধ, স্থিতি, নিরাপত্তা কোথায়? নাকি শান্তি মানে শুধু নেতৃত্ব বদল, আর মানবতা মানে শুধু ভিসার লাইনে দাঁড়ানো মানুষ?
সবচেয়ে বড় ব্যঙ্গ হলো- শান্তির পুরস্কার দেওয়ার আগে শান্তিকে দেখা উচিত। কিন্তু আন্তর্জাতিক রাজনীতিতে শান্তি দেখা হয় না, শান্তি ধরা হয়। ধরা হয় তেলের দামে, ধরা হয় নিষেধাজ্ঞার তালিকায়, ধরা হয় নতুন সরকারের ঘোষণায়। এই “ধরা শান্তি” যদি নোবেল পায়, তাহলে নোবেল শান্তি পুরস্কারকে সত্যি সত্যি একটি নতুন নাম দেওয়া যায়:
“ভূরাজনৈতিক স্থিতিশীলতা পুরস্কার।”
মাচাদোর বক্তব্যের ভেতর দিয়ে আসলে একটি পুরোনো সত্য নতুন করে সামনে আসে।
শান্তি এখন আর মানবতার লক্ষ্য নয়—শান্তি এখন ক্ষমতার কৌশল।
আর নোবেল হয়ে উঠেছে সেই কৌশলের সম্ভাব্য পদক।
ট্রাম্প নোবেল-যোগ্য কি না, তা নোবেল কমিটি ঠিক করবে। কিন্তু দুনিয়া একথা জানে—আজকাল যে কেউ নোবেল-যোগ্য হয়ে যায়, যদি সে যথেষ্ট শক্তিশালী হয়, যথেষ্ট দৃশ্যমান হয় এবং যথেষ্ট প্রয়োজনীয় হয়ে ওঠে।
মানবতা তখন পাশে দাঁড়িয়ে শুধু দেখে—তার নামটা কে কোন বাক্যে ব্যবহার করল।
আমাদের স্পষ্ট বার্তা শান্তির নামে ক্ষমতার খেলা যতদিন চলবে, ততদিন “নোবেল-যোগ্যতা” কোনো নৈতিক মানদণ্ড নয়, কেবল রাজনৈতিক সুবিধার সার্টিফিকেট—আর মানবতা থাকবে বিজ্ঞপ্তির শিরোনামে, বাস্তবের পাতায় নয়।
৬ জানুয়ারি ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা।
লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক এই আমার দেশ, THE BUSINESS in Magazine, প্রধান সম্পাদক দৈনিক মুখপাত্র





