বিশ্বকাপের প্রধান অতিথি যখন কুকুর

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

প্রিয় পাঠক,

বিশ্বকাপের ট্রফি উঁচিয়ে ধরছেন ববি মুর, পেছনে হাততালিতে মুখর পুরো ইংল্যান্ড। ১৯৬৬ সালের ফুটবল বিশ্বকাপের এই চেনা ছবিটি আমরা কমবেশি সবাই দেখেছি। কিন্তু ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে গৌরবময় এই মুহূর্তটি হয়তো কোনোদিনই আসত না, যদি না মাঝখান থেকে এক চারপেয়ে গোয়েন্দা এসে উদ্ধারকর্তার ভূমিকায় অবতীর্ণ হতো!
এটি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে রোমাঞ্চকর এবং হাস্যরসাত্মক এক নেপথ্য গল্প। যেখানে বিশ্বখ্যাত গোয়েন্দা সংস্থা স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড যা পারেনি, তা করে দেখিয়েছিল ‘পিকলস’ নামের এক সাধারণ পোষা কুকুর।
পরিত্যক্ত এক বাগানের ঝোপঝাড়, খবরের কাগজে মোড়ানো এক গুপ্তধন আর একটা কুকুরের নাক কীভাবে বদলে দিয়েছিল ১৯৬৬ বিশ্বকাপের ভাগ্য?

সময়টা ১৯৬৬ সালের মার্চ মাস। বিশ্বকাপ শুরু হতে আর মাত্র চার মাস বাকি। ফুটবল বিশ্বকাপের আসল ট্রফি, যা তখন ‘জুলে রিমে ট্রফি’ নামে পরিচিত ছিল- তা নিয়ে আসা হয়েছে লন্ডনে। ইংল্যান্ড ফুটবল অ্যাসোসিয়েশন (এফএ) পাঠকদের প্রদর্শনের জন্য সেন্ট্রাল লন্ডনের ওয়েস্টমিনস্টার সেন্ট্রাল হলে ট্রফিটি রাখার ব্যবস্থা করে।
কড়া নিরাপত্তা, সার্বক্ষণিক পুলিশি পাহারা সবই ছিল। কিন্তু ২০ মার্চ, এক রবিবারের সকালে ঘটল সেই অবিশ্বাস্য কাণ্ড। চার্চের ভেতর যখন প্রার্থনা চলছে, ঠিক সেই সুযোগে চোরেরা পেছনের দরজা দিয়ে ঢুকে নিরাপত্তারক্ষীদের বুড়ো আঙুল দেখিয়ে উধাও করে দিল নিখাদ সোনার তৈরি ফুটবল বিশ্বের সবচেয়ে মূল্যবান সেই ট্রফিটি!
পরদিন সোমবার পুরো বিশ্বের সংবাদপত্রের প্রধান শিরোনাম হলো এই চুরির খবর। বিশ্বজুড়ে ইংল্যান্ডের সুনামে বিশাল ধাক্কা লাগল। তৎকালীন ফিফা সভাপতি তো রাগে ক্ষোভে বলেই বসলেন, “ইংল্যান্ড ট্রফি খুঁজে না পেলে বিশ্বকাপই বাতিল করা হতে পারে!”
স্কটল্যান্ড ইয়ার্ড তাদের সেরা গোয়েন্দাদের মাঠে নামাল। চোরেরা এর মধ্যে এফএ সভাপতির কাছে ১৫ হাজার পাউন্ড মুক্তিপণ চেয়ে চিঠিও পাঠাল। পুলিশ ফাঁদ পেতে একজনকে গ্রেপ্তার করলেও সে ছিল কেবলই এক মধ্যস্থতাকারী, আসল ট্রফির কোনো হদিস মিলল না।

ট্রফি চুরির ঠিক সাত দিন পরের ঘটনা। ২৭ মার্চ, দক্ষিণ লন্ডনের আপার মিক্সহ্যাম এলাকার বাসিন্দা ডেভিড করবেট তাঁর চার বছর বয়সী মিক্সড-ব্রিড কোলিস জাতের কুকুর ‘পিকলস’-কে নিয়ে রাতের খাবার শেষে হাঁটতে বেরিয়েছেন।
হাঁটতে হাঁটতে হঠাতই পিকলস তার মালিকের হাত থেকে ছুটে গিয়ে প্রতিবেশীর বাড়ির সামনের এক ঝোপের ভেতর নাক ঘষতে শুরু করল। সে তীব্রভাবে লেজ নাড়ছিল আর মাটিতে আঁচড় কাটছিল।
ডেভিড করবেট ভাবলেন, হয়তো কোনো বিড়াল বা হাড়গোড় দেখে পিকলস এমন করছে। তিনি কাছে গিয়ে দেখলেন, মাটির ওপর খবরের কাগজে শক্ত করে মোড়ানো একটা ভারী প্যাকেট পড়ে আছে। করবেট কৌতুহলী হয়ে কাগজের কিছুটা অংশ ছিঁড়লেন। ভেতরে চকচক করে উঠল সোনালী রঙের কিছু একটা।
প্রথমে তিনি ভেবেছিলেন কোনো চোরের ফেলে যাওয়া সাধারণ সস্তা জিনিস। কিন্তু কাগজটা পুরোপুরি সরাতেই তাঁর চোখ চড়কগাছ! তিনি দেখলেন, একটা ডানাওয়ালা নারী মূর্তি ওপরের দিকে একটি কাপ ধরে আছে, আর তার নিচে খোদাই করে লেখা—জার্মানি, উরুগুয়ে, ইতালি!
হ্যাঁ, ওটি আর কিছুই নয়, স্বয়ং জুলে রিমে ট্রফি! চোরেরা পুলিশের ভয়ে তা খবরের কাগজে মুড়িয়ে ঝোপের ভেতর লুকিয়ে রেখেছিল।

করবেট দ্রুত ট্রফিটি নিয়ে স্থানীয় থানায় হাজির হলেন। পুলিশ প্রথমে করবেটকেই চোর সন্দেহ করে গভীর রাত পর্যন্ত জেরা করে! তবে পরে তাঁর নির্দোষিতা প্রমাণিত হয় এবং রাতারাতি তারকা বনে যায় কুকুর ‘পিকলস’।
গোটা ইংল্যান্ড স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলে। পিকলস পরিণত হয় জাতীয় নায়কে।
বিশ্বকাপের উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে পিকলসকে প্রধান অতিথি হিসেবে আমন্ত্রণ জানানো হয়। আর জুলাই মাসে যখন ইংল্যান্ড ফাইনালে পশ্চিম জার্মানিকে হারিয়ে বিশ্বচ্যাম্পিয়ন হয়, তখন লন্ডনের ক্যাফে রয়্যাল-এ আয়োজিত অফিশিয়াল সেলিব্রেশন ডিনারে পিকলসকে বিশেষভাবে আমন্ত্রিত করা হয়। সেদিন দলের ফুটবলাররা ব্যালকনি থেকে ট্রফি উঁচিয়ে ধরার পর ডিনার টেবিলে পিকলসের সামনে পরিবেশন করা হয়েছিল রাজকীয় সব খাবার।
মালিক ডেভিড করবেট পুরস্কার হিসেবে পেয়েছিলেন প্রায় ৬ হাজার পাউন্ড (যা তৎকালীন সময়ে একটি ভালো বাড়ির দামের চেয়েও বেশি ছিল)। আর পিকলস পেয়েছিল আজীবন বিনামূল্যে ডগ-ফুড পাওয়ার অধিকার, রূপালী পর্দার সিনেমায় অভিনয়ের সুযোগ এবং একটি মেডেল।

আজও যদি ফুটবল ইতিহাসের সবচেয়ে বড় চুরির ঘটনা নিয়ে আলোচনা হয়, তবে স্কটল্যান্ড ইয়ার্ডের ব্যর্থতা আর পিকলসের সেই জাদুকরী নাকের গল্প সবার আগে আসবে। ফুটবল মাঠের বাইরেও যে ড্রেসিংরুম বা স্টেডিয়ামের সীমানা ছাড়িয়ে বিশ্বকাপের ভাগ্য লেখা হতে পারে, ১৯৬৬ সালের সেই বসন্তে পিকলস তা প্রমাণ করেছিল।
১৯৬৭ সালে এই বীর কুকুরটি মারা যাওয়ার পর তার মেডেল এবং কলার ম্যানচেস্টারের ন্যাশনাল ফুটবল মিউজিয়ামে সংরক্ষণ করা হয়।

সোনার অক্ষরে ফুটবলারদের নাম তো অনেক লেখা হয়েছে, কিন্তু চার পায়ের ছাপে বিশ্বকাপের ইতিহাস বাঁচানোর গল্প ফুটবল বিশ্বে আর একটিও নেই।

[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...