
খুলনা প্রতিনিধি
খুলনার ডুমুরিয়া উপজেলায় চলতি বোরো মৌসুমে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমকে কেন্দ্র করে নানা অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। প্রভাবশালী চক্রের দৌরাত্ম্য, আবেদন প্রক্রিয়ার দুর্বলতা এবং কৃষি বিভাগের পর্যাপ্ত তদারকির অভাবে অনেক প্রকৃত কৃষক সরকারি নির্ধারিত মূল্যে ধান বিক্রির সুযোগ থেকে বঞ্চিত হয়েছেন বলে অভিযোগ পাওয়া গেছে।
সরকার চলতি অর্থবছরে ডুমুরিয়া উপজেলায় ২ হাজার ৪৩১ মেট্রিক টন বোরো ধান সংগ্রহের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করে। প্রতি মণ ধানের মূল্য নির্ধারণ করা হয় ১ হাজার ৪৪০ টাকা এবং প্রতি কৃষকের কাছ থেকে সর্বোচ্চ ১ মেট্রিক টন ধান সংগ্রহের সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। এ লক্ষ্যে কৃষি অ্যাপের মাধ্যমে ২ হাজার ৪৭৬ জন আবেদন করেন।
তবে স্থানীয় কৃষকদের অভিযোগ, আবেদনকারীদের বড় একটি অংশ প্রকৃত কৃষক নন। কৃষি কার্ডের পরিবর্তে শুধু জাতীয় পরিচয়পত্র (এনআইডি) ব্যবহার করে আবেদন করার সুযোগ থাকায় একটি অসাধু চক্র গ্রামাঞ্চল থেকে সাধারণ মানুষের এনআইডি সংগ্রহ করে ব্যাপকভাবে আবেদন করেছে। ফলে প্রকৃত কৃষকদের অংশগ্রহণ কমে গেছে।
গত ৬ মে ধান সংগ্রহ কার্যক্রমের উদ্বোধন করা হলেও আবেদন গ্রহণের শেষ সময় ছিল ২০ মে। কৃষকদের দাবি, এ বিষয়ে মাঠপর্যায়ে পর্যাপ্ত প্রচারণা হয়নি। কৃষি অফিস মাইকিংয়ের দাবি করলেও অধিকাংশ কৃষক জানান, ধান কাটার ব্যস্ত মৌসুমে তারা এ সংক্রান্ত তথ্য সময়মতো জানতে পারেননি।
গুটুদিয়া গ্রামের কৃষক শংকর মহলদার বলেন,
“কখন মাইকিং হয়েছে তা আমি জানি না। ধান ঘরে তোলার পর বিক্রির প্রস্তুতি নিতে গিয়ে জানতে পারি আবেদনের সময় শেষ হয়ে গেছে। এ বছর উৎপাদন খরচ অনেক বেশি ছিল। বৈরী আবহাওয়া, শ্রমিক সংকট ও বাড়তি দামে ডিজেল কিনতে হয়েছে। সরকারি দামে ধান বিক্রি করতে না পেরে শেষ পর্যন্ত প্রতি মণ ১ হাজার টাকায় ধান বিক্রি করেছি।”
স্থানীয় কৃষকদের মতে, সরকারি মূল্যের সঙ্গে বাজার মূল্যের বড় পার্থক্যের কারণে অনেক কৃষক আর্থিকভাবে ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। বিশেষ করে ছোট ও প্রান্তিক কৃষকেরা সবচেয়ে বেশি ভোগান্তির শিকার হয়েছেন।
উপজেলা খাদ্য গুদামের ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা এসএম আমিনুর রহমান বুলবুল বলেন, “কৃষি অ্যাপের তালিকা অনুযায়ী ধান সংগ্রহ করা হচ্ছে। এ পর্যন্ত ৪৫০ মেট্রিক টনের বেশি ধান সংগ্রহ করা হয়েছে। আবেদন প্রক্রিয়ার জটিলতা ও বিভিন্ন কারণে কিছু প্রকৃত কৃষক ধান বিক্রি থেকে বঞ্চিত হয়েছেন, এটি সত্য। তবে খাদ্য গুদামে ধান গ্রহণে কোনো অনিয়ম হচ্ছে না। কিছু প্রভাবশালী মহলের চাপ থাকলেও মানসম্মত ধান ছাড়া গ্রহণ করা হচ্ছে না।”
তিনি আরও জানান, আবেদন গ্রহণের শুরুতে সার্ভারজনিত সমস্যার কারণে সরকার আবেদন করার সময়সীমা অতিরিক্ত ১৫ দিন বৃদ্ধি করেছিল।
এ বিষয়ে উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা মো. নাজমুল হুদা বলেন, “কৃষি অফিসে আসা আবেদনগুলো যাচাই-বাছাই করে অনুমোদন দেওয়া হয়েছে। তবে কৃষি কার্ড ছাড়াই শুধু এনআইডির ভিত্তিতে আবেদন গ্রহণের সুযোগ থাকায় কিছু অকৃষকের আবেদন অনুমোদিত হয়ে থাকতে পারে। স্বল্প সময়ে প্রতিটি আবেদন বিস্তারিতভাবে যাচাই করা কঠিন ছিল।”
এদিকে কৃষকদের দাবি, ভবিষ্যতে সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে কৃষি কার্ড বাধ্যতামূলক করা, মাঠপর্যায়ে ব্যাপক প্রচারণা চালানো এবং প্রকৃত কৃষক শনাক্তে কঠোর যাচাই-বাছাই নিশ্চিত করা না হলে সরকারি সহায়তার মূল সুবিধাভোগী কৃষকেরা বারবার বঞ্চিত হবেন।
স্থানীয় সচেতন মহলও সরকারি ধান সংগ্রহ কার্যক্রমে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহিতা নিশ্চিত করতে সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের কার্যকর পদক্ষেপ কামনা করেছেন।





