
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের ৮১তম অধিবেশনের সভাপতি পদে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী ড. খলিলুর রহমানের নির্বাচিত হওয়া দেশের কূটনৈতিক ইতিহাসে একটি গুরুত্বপূর্ণ ও গৌরবময় অধ্যায়। প্রায় চার দশক পর আবারও বিশ্বের সবচেয়ে প্রতিনিধিত্বশীল আন্তর্জাতিক ফোরামের নেতৃত্বে একজন বাংলাদেশির আসীন হওয়া শুধু একটি পদ লাভের ঘটনা নয়; এটি বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক গ্রহণযোগ্যতা, কূটনৈতিক সক্ষমতা এবং বৈশ্বিক পরিসরে ক্রমবর্ধমান গুরুত্বের প্রতীক।
১৯৮৬ সালে হুমায়ুন রশীদ চৌধুরী জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব পালন করেছিলেন। দীর্ঘ ৪০ বছর পর সেই মর্যাদাপূর্ণ আসনে বাংলাদেশের প্রত্যাবর্তন নিঃসন্দেহে তাৎপর্যপূর্ণ। ১৯৩ সদস্য রাষ্ট্রের মধ্যে ১৯০টি দেশের অংশগ্রহণে অনুষ্ঠিত নির্বাচনে ড. খলিলুর রহমানের ৯৯ ভোট পাওয়া প্রমাণ করে যে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের একটি বড় অংশ তার নেতৃত্ব ও বাংলাদেশের সক্ষমতার ওপর আস্থা রেখেছে।
বিশ্ব বর্তমানে এক অস্থির সময় অতিক্রম করছে। ইউক্রেন যুদ্ধ, মধ্যপ্রাচ্যের সংঘাত, জলবায়ু পরিবর্তনের ভয়াবহ প্রভাব, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক বৈষম্য এবং মানবাধিকার সংকট আন্তর্জাতিক ব্যবস্থাকে কঠিন পরীক্ষার মুখে দাঁড় করিয়েছে। এমন প্রেক্ষাপটে জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির দায়িত্ব কেবল আনুষ্ঠানিক নয়; এটি বৈশ্বিক সংলাপ, ঐকমত্য গঠন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতাকে এগিয়ে নেওয়ার একটি গুরুত্বপূর্ণ প্ল্যাটফর্ম। ড. খলিলুর রহমান তার নির্বাচনী অঙ্গীকারে যুদ্ধ বন্ধ, মানবাধিকার প্রতিষ্ঠা এবং সকল দেশের সমান অংশগ্রহণ নিশ্চিত করার যে প্রত্যয় ব্যক্ত করেছেন, তা বাস্তবায়নের সুযোগ এখন তার সামনে উপস্থিত।
একই সঙ্গে এই নির্বাচন বাংলাদেশের জন্যও একটি বার্তা বহন করে। আন্তর্জাতিক অঙ্গনে সম্মান ও মর্যাদা অর্জন তখনই অর্থবহ হয়, যখন দেশের অভ্যন্তরে গণতান্ত্রিক চর্চা, সুশাসন, জবাবদিহিতা এবং মানবাধিকারের পরিবেশ আরও শক্তিশালী হয়। বিশ্বমঞ্চে নেতৃত্বের আসনে বসা একটি দেশের কাছে আন্তর্জাতিক সম্প্রদায়ের প্রত্যাশাও স্বাভাবিকভাবেই বৃদ্ধি পায়। ফলে বাংলাদেশের জন্য এই অর্জন যেমন গর্বের, তেমনি দায়িত্বেরও।
ড. খলিলুর রহমানের দীর্ঘ কূটনৈতিক অভিজ্ঞতা, জাতিসংঘ ব্যবস্থার সঙ্গে তার নিবিড় সম্পৃক্ততা এবং উন্নয়ন ও আন্তর্জাতিক অর্থনীতি বিষয়ে তার গভীর জ্ঞান এই দায়িত্ব পালনে সহায়ক হবে বলেই আশা করা যায়। তবে ব্যক্তিগত যোগ্যতার পাশাপাশি এ অর্জনকে দেশের সামগ্রিক কূটনৈতিক সাফল্যে রূপ দিতে রাষ্ট্রের ধারাবাহিক ও দূরদর্শী পররাষ্ট্রনীতিরও প্রয়োজন রয়েছে।
জাতিসংঘ সাধারণ পরিষদের সভাপতির পদে একজন বাংলাদেশির নির্বাচন নিঃসন্দেহে জাতীয় গৌরবের বিষয়। এখন প্রত্যাশা, এই সুযোগকে কাজে লাগিয়ে বাংলাদেশ বিশ্বশান্তি, ন্যায়বিচার, টেকসই উন্নয়ন এবং বহুপাক্ষিক সহযোগিতার পক্ষে আরও শক্তিশালী ও কার্যকর ভূমিকা পালন করবে। চার দশক পর অর্জিত এই মর্যাদা যেন ভবিষ্যতে বাংলাদেশের আন্তর্জাতিক অবস্থানকে আরও সুদৃঢ় করার ভিত্তি হয়ে ওঠে, সেটিই হোক আমাদের প্রত্যাশা।





