
মোছাঃ সামিয়া সুচি
কেউ বই বলতে বুঝে জ্ঞান, সংস্কৃতি, সভ্যতা ও যোগাযোগের অন্যতম বাহন।আবার অনেকেই অতীত, বর্তমান,ভবিষ্যত ও কল্পনার সাথে যোগসূত্র স্থাপন করে থাকে এ বই দ্বারাই।তবে সব বই হয়তো বা এক নয়। কিছু কিছু বইয়ে লুকিয়ে রয়েছে এমন কিছু রহস্য যা আজও আপনাকে আমাকে ভাবাতে বাধ্য করে এ পৃথিবী বড়ই অদ্ভুত। কোডেক্স গিগাস এমনই একটি বই। যেটিকে বলা হয় (দ্যা ডেভিলস বাইবেল) অর্থাৎ শয়তানের বাইবেল।
ঘটনাটি অনেক পুরোনো। সাল ১২১২।বোহেমিয়ার পডলাজিসে অবস্থিত একটি মনেস্ট্রিতে একটি মামলা চলছিল। আর অপরাধী হিসেবে ছিল সেই মনেস্ট্রিরই একজন মঙ্ক অথবা মঠ সন্ন্যাসী (হারমান ইনক্লুসাস)। একজন পূর্ণাঙ্গ মঙ্ক হওয়ার পূর্বে একজন ব্যাক্তির কাছ থেকে বেশ কিছু প্রতিজ্ঞা করানো হয়। যেমন-সে মিথ্যা বলতে পারবে না,কাউকে ধোঁকা দিতে পারবে না, লোভ-লালসা করতে পারবে না, ঘুষ বা কারো দিকে বদনজর দিতে পারবে না ইত্যাদি। আর এর মধ্যে অনেক ছোট ছোট প্রতিজ্ঞা ইতোমধ্যেই হারমান ভঙ্গ করে ফেলেছিল। কিন্তু হারমান এবার একটি বড় অপরাধ করে বসে। একটি মেয়ের সাথে সে অবৈধ সম্পর্কে লিপ্ত হয়ে যায়। এ ঘটনাটি মনেস্ট্রির প্রধানদের কানে যেতেই হারমানকে দোষী রূপে উপস্থিত করা হয়। আস্তে আস্তে উঠে আসে অতীতে করা তার সকল ভুলের প্রমাণ। মামলা টি এক পর্যায়ে চরম আকার ধারণ করে। মনেস্ট্রি থেকে হারমানের জন্য ঘোষণা করা হয় এক মর্মান্তিক শাস্তি। শাস্তিটি ছিল এমন যে তাকে জীবন্ত অবস্থায় দেওয়ালে ইটের গাঁথুনি দিয়ে আটকে ফেলে হত্যা করা হবে। হারমান এটি শুনার পর নিজের প্রাণ ভিক্ষা চাইতে থাকে। সে বলে ঈসা (আঃ)-এর ওপর যারা নির্যাতন করেছিল তাদেরও তিনি মাফ করেছিলেন তাই তাকেও সবাই যেন একটা শেষ সুযোগ দেয়। কিন্তু কেউই তার কথা শুনতে রাজি ছিল না। শেষে ধর্মের দোহাই দেওয়ায় মনেস্ট্রির প্রধানরা কোনো উপায় না পেয়ে হারমানের সামনে একটি শর্ত দেয়। তারা বলেছিল যে “মনেস্ট্রি হারমানকে মাফ করে দিবে তবে হারমানকে এমন একটি গ্রন্থ লিখতে হবে যেটিতে মানব জাতির সকল জ্ঞান রয়েছে তাও আবার এক রাতের মধ্যেই। হারমান মৃত্যুভয়ে শর্ত তো মেনে নেয় কিন্তু এটি আসলে অসম্ভব একটি বিষয়। মানব জাতির সকল জ্ঞান একই গ্রন্থে তাও আবার এক রাতের মধ্যে এটি কোনো মানুষের দ্বারা সম্ভব ছিল না। আর শর্ত ছিল যে হারমান এই কাজটি করতে না পারলে দেওয়ালের মধ্যে তার জীবন্ত সমাধি দেওয়া হবে। হারমানকে এক রাতের জন্য সে কক্ষে আটকে দেওয়া হয়। পরের দিন সকালে যখন কক্ষ টির দরজা খোলা হয় তখন সবাই অবাক হয়ে যায়। সামনে হারমান উপস্থিত ছিল এবং তার সামনে ছিল বিশাল একটি গ্রন্থ। যেটি আকারে ছিল ৩ফুট লম্বা, পনে ২ফুট চওড়া ৯ ইঞ্চির একটি বই, যার ওজন ছিল প্রায় ৭৫ কেজি,মোট পৃষ্ঠা সংখ্যা ৬৪৪টি এবং পৃষ্ঠা গুলো ছিল একপ্রকার গাধার চামড়া থেকে তৈরী যা তখন প্রায় লাখ টাকার সমতুল্য ছিল কিন্তু কথা হলো সেই বন্ধ কক্ষে মনেস্ট্রির সামান্য মঙ্ক এতোকিছু কিভাবে পেল। বইটি দেখে সকলের চোখ যেন কপালে উঠে গেছিলো। এক রাতের মধ্যে এমন বিশাল এক বই লিখা কিভাবে সম্ভব। তখন হারমান উঠে বলল “এইটা তো আমি লিখি নি এই বইটি লিখার জন্য আমি প্রার্থনা করেছি।” তখন মনেস্ট্রির সকলে বলেছে তুমি এতো পাপ করেছো, এতো প্রতিজ্ঞা ভঙ করেছো তাহলে ঈশ্বর তোমার প্রার্থনা কেন শুনবেন। তখন হারমান জবাব দিল “কে বলল আমি প্রার্থনা ঈশ্বরের কাছে করেছি।” যেহেতু হারমান নিজের শর্ত পূরণ করেছিল তাই মনেস্ট্রির সকলে তাকে মাফ করে দেয় এবং তাকে মুক্ত করে দেয়। কিন্তু যখনই হারমান সেই কক্ষের বাইরে পা ফেলে তার মৃত্যু হয়ে যায়। এই রহস্যময় মৃত্যুর পর যখন সেই বইটিকে খোলা হয় তখন সবাই আরও হতবাক হয়ে যায়। কারণ সেখানে মানবজাতির জ্ঞান তো উপস্থিত ছিল কিন্তু সেটা কখনো ঈশ্বর দ্বারা প্রদও ছিল না। সেটার লেখার ধরণ, ভাষা, বিশ্বাস এসকল কিছু দেখে মনে হচ্ছিল যে এটা আসলে ঈশ্বর নয় বরং শয়তানের লেখা। অর্থাৎ সেই রাতে হারমান শয়তানের কাছে প্রার্থনা করেছিল সেই বইটি সম্পূর্ণ করার জন্য। আর সে নিজের আত্মার সাথে চুক্তি করে বইটি লিখিয়েছিল যেন দেওয়ালে আটকায়ে মরার মতো মর্মান্তিক মৃত্যুর চাইতে সে যেন একটা সহজ মৃত্যু পায়। মনেস্ট্রির প্রধানরা যখন সেই বইটিকে পড়া শুরু করে তখন তাদের আত্মা কেঁপে উঠেছিল। তারা সিদ্ধান্ত নিলো যে এটিকে আসলে মানবজাতির খোঁজ থেকে দূরে রাখায় উওম নাহলে এটি সকলের ধংস্স ডেকে আনবে। বহুবছর এ বইটি পড়ার ওপরও কঠোর নিষেধাজ্ঞা ছিল। এমন কি ছিল সে বইটিতে যা মানবজাতির ধংস্স ডেকে আনবে? এ বইয়ের ৫৮০নং পৃষ্ঠায় একটি চিত্র আঁকা আছে যেটি দেখলে মনে হয় শয়তান যেন তার প্রতিকৃতি স্বয়ং নিজে এঁকেছে। চিত্রটির লাল অংশগুলো ধারণা করা হয় যে রক্ত দিয়ে লিখা হয়েছে যেন শয়তান তা দ্বারা এই বইটিতে জীবিত থাকতে পারে। লোকমুখে কথিত আছে, এ বইটিকে যে বিশ্বাস করে সন্মান করে শয়তান তার জীবনে সকল কিছু এনে দেয়। কিন্তু এ বইটিকে যে সন্মান দেয় না, অপমান করে শয়তান তাকে বরবাদ করে দেয়। মনেস্ট্রি বইটি উদ্ধার করার পর সেটির কোনো সন্মান করতো না। একটি বন্ধ কক্ষে ফেলে রাখতো যার ফলে মনেস্ট্রিতে একের পর এক বিপদ আসতেই থাকে। কোনো কোনো সময় মনেস্ট্রি প্রধানের অস্বাভাবিক মৃত্যু হয় কোনো সময় আবার বড় দূর্ঘটনা ঘটে সেখানে আসা মানুষদের সাথে। সেজন্য মানুষ আসতে আসতে সেখানে আসা বন্ধ করে দেয়। মনেস্ট্রিতে থাকা মানুষদের আর্থিক অবস্থা এতোটাই খারাপ হয়ে যায় যে তারা ঠিক মতো খাবারও পেত না। আসতে আসতে মনেস্ট্রির সকলে তাদের মূল্যবান সকল জিনিস বন্ধক রাখতে শুরু করে। এভাবেই তারা জীবন পার করছিলো কিন্তু যখন সব জিনিস শেষ হয়ে যায় তখন তারা সেই কোডেক্স গিগাস(দ্যা ডেভিলস বাইবেল) কে মনেস্ট্রির বন্ধ কক্ষ হতে বের করে। ১২৯৫ সালে এ বইকে তারা সেডল্যাক এ্যাবি তে দিয়ে দেয় আর এ বছরই বইটিকে সেডল্যাক এ্যাবি থেকে বেনেডিক্টাইন মনেস্ট্রি কিনে নেয়। কিন্তু মজার কথা হলো যে, বেনেডিক্টিন মনেস্ট্রি এই বইটিকে অভিশাপ নয় বরং সন্মানের চোখে দেখতে লাগল তারা বইটিকে জন সাধারণের কাছে প্রকাশ করলো। মানুষ দূরদূরান্ত থেকে আসতে লাগল বইটি দেখার জন্য। যার কারণে এক সময় তারা প্রচুর পরিমাণ অর্থ উর্পাজন করে। বেনেডিক্টিন মনেস্ট্রি শুধুমাএ তাদের লোভ-লালসার জন্য এ বইটিকে সন্মান দিয়েছিল। কিন্তু সেই সন্মান দেওয়ার কারণেই সে মনেস্ট্রি এতো উন্নতি করেছিল। বেনেডিক্টিন মনেস্ট্রি ১২৯৫ হতে ১৪৭৭ সাল পর্যন্ত প্রচুর অর্থ উর্পাজনের পর এটিকে ব্রমোভের একটি মনেস্ট্রির লাইব্রেরীতে দান করে দেয়। এ লাইব্রেরীতেও বইটিকে যথাযথ সম্মান দেওয়া হতো এবং অনেক মানুষ দেখতে আসত। পরে কিছু যুদ্ধের মধ্যে বইটি লাইব্রেরী থেকে লুট হয়ে যায়। পরবর্তীতে সুইডিশদের হাতে বইটি পড়ে। ১৬৪৯ সালে বইটি সুইডিশ রয়াল লাইব্রেরীতে আসে। এখানেও বেশ অনেক বছরই বইটিকে রাখা হয়। কিন্তু এর মধ্যেও অনেক ঘটনা ঘটে। যেমন এক রাতে সে লাইব্রেরীতে একজনার অস্বাভাবিক মৃত্যু হয়। একদিন পুরো লাইব্রেরীতে আগুন লেগে যায়। এ অগ্নিকাণ্ডে লাইব্রেরীর অনেক বই পুড়ে যায় কিন্তু কোডেক্স গিগাসের আসলে কিছুই হয়েছিল না। তবে সে দুর্ঘটনাতে বইটির প্রায় ১২ টি পৃষ্ঠা গায়েব হয়ে যায়। ধারণা করা হয় যে সে দূর্ঘটনার অযুহাতে কিছু মানুষ সেটা গায়েব করেছে। এতে মনেস্ট্রির সকলে অনেক ভয় পায়। কারণ সে পৃষ্ঠাগুলো খারাপ কারো হাতে পড়লে এ পৃথিবীর বুকে শয়তানের উপাসনা শুরু হয়ে যাবে।
বর্তমানে ন্যাশনাল লাইব্রেরী অফ সুইডেন এ বইটিকে কঠোর নিরাপত্তায় রাখা হয়েছে। স্পর্শ বা খুলে পড়ার অনুমতি এখন কারোরই নেই। কারণ বইটিতে এমন কিছু মন্ত্র রয়েছে যার দ্বারা আত্মাকে এ পৃথিবীতে আনা সম্ভব। কঠিন কঠিন রোগ ঠিক করা সম্ভব। কিন্তু শয়তানের কাছ থেকে নেওয়া একটা উপকারও আপনার জীবন ধংস্স করতে পারে। কোডেক্স গিগাসের ঘটনাটিকে অনেকে কাল্পনিক বলে মনে করেন কিন্তু কাল্পনিক জিনিসের কোনো অস্তিত্ব হয় না পক্ষান্তরে কোডেক্স গিগাসের অস্তিত্ব এখনও এ পৃথিবীর বুকে বিদ্যমান রয়েছে। নির্ভরযোগ্য সূত্র ও প্রমাণ থাকায় কোডেক্স গিগাসের ঘটনাটিকে সত্য বলেই মনে করা হয়। কিন্তু কিছু অস্পষ্ট রহস্য তো থেকেই যায় আপনার আমার আমাদের সকলের মনে। কিন্তু সকল রহস্য আসলে উদ্ধার করা ঠিক না। তাই কোডেক্স গিগাসের মতো ভয়ংকার একটি বই আপনাদের না পড়াই উত্তম।
[বিঃদ্রঃ বইটির একটি ডিজিটাল সংস্করণ অনলাইনে পাওয়া যায়। তবে ব্যক্তিগত নিরাপত্তা ও সতর্কতার বিষয়টি বিবেচনা করে সেটি না পড়াই উত্তম। তবুও কেউ যদি নিজ দায়িত্বে এটি পড়েন, সে ক্ষেত্রে এর জন্য আমি বা অন্য কেউ কোনোভাবে দায়ী থাকব না।]
লেখক পরিচিতি:
১. নাম: মোছাঃ সামিয়া সুচি
২. ঠিকানা: জেলা: রাজশাহী , উপজেলা: পুঠিয়া, গ্রাম: কৃষ্ণপুর।
পুঠিয়া , রাজশাহী।
৩. শিক্ষা প্রতিষ্ঠান : পদ্মা সরকারি কলেজ, রাজশাহী (জাতীয় বিশ্ববিদ্যালয়)
শ্রেণি: বি.বি.এ অনার্স (৩য় র্বষ)
বিভাগ: ইতিহাস





