
রংপুর প্রতিনিধি
এক সময় চিঠি ছিল মানুষের হৃদয়ের ভাষা ভালোবাসা, অভিমান, সুখ-দুঃখ আর প্রতীক্ষার এক জীবন্ত দলিল। কিন্তু প্রযুক্তির অগ্রগতিতে সেই চিঠির দিন আজ অনেকটাই ফিকে হয়ে এসেছে। রংপুর জেলা জুড়ে এখন আর আগের মতো পোস্ট অফিসে ভিড় দেখা যায় না, বরং অনেক জায়গায় তা নীরবতার প্রতীক হয়ে দাঁড়িয়েছে। রংপুর জেলায় ৮টি উপজেলা, ৩টি পৌরসভা এবং ১টি সিটি কর্পোরেশনের আওতায় রয়েছে ৮৩টি ইউনিয়ন পরিষদ। প্রায় প্রতিটি ইউনিয়নে এক বা দুটি করে পোস্ট অফিস থাকলেও, চিঠির ব্যবহার কমে যাওয়ায় অনেকগুলোই এখন কার্যত অচল বা বন্ধ। ১৫১৯টি গ্রামের বিস্তৃত এই অঞ্চলে এক সময় ডাকপিয়নের নিয়মিত যাতায়াত ছিল গ্রামীণ জীবনের অবিচ্ছেদ্য অংশ, যা এখন অতীতের গল্প হয়ে গেছে।
অনেক পোস্ট অফিস বন্ধ হয়ে গেছে, আর যেগুলো চালু আছে, সেগুলোও টিকে আছে সীমিত কার্যক্রম নিয়ে। চিঠি মানেই ছিল এক একটি গল্প যেখানে কালি দিয়ে লেখা থাকতো মানুষের মনের গভীর অনুভূতি। এক একটি চিঠিতে থাকতো সুসংবাদ, দুঃসংবাদ, প্রেম, অভিমান কিংবা পরিবারের খোঁজখবর। গ্রামের মানুষরা ডাকপিয়নের অপেক্ষায় থাকতেন দিনের পর দিন। বিকেলের দিকে ডাকপিয়নের হাঁক শুনলেই ছুটে যেতেন বাড়ির সবাই। চিঠি পড়ার সময় পরিবারের সবাই একত্র হতেন এ যেন ছিল এক সামাজিক আয়োজন। চিঠি পড়তে পড়তে অনেকেই অনুভব করতেন, প্রিয় মানুষটি যেন ঠিক সামনে বসে কথা বলছে। গ্রামের নির্জন দুপুর কিংবা রাতের নিস্তব্ধতায় ডাকপিয়নের অপেক্ষা ছিল এক বিশেষ অনুভূতি। চিঠি হাতে পাওয়ার আনন্দ কিংবা দেরি হলে উদ্বেগ এই আবেগগুলো আজকের প্রজন্মের কাছে অনেকটাই অচেনা।
বর্তমান সময়ের তরুণদের কাছে পোস্ট অফিস যেন এক অচেনা স্থান। রংপুর কারমাইকেল কলেজের অনার্স বাংলা বিভাগের সুজন নামে এক শিক্ষার্থীর অভিজ্ঞতায় উঠে আসে এই পরিবর্তনের চিত্র। তিনি জানান, প্রথমবার চিঠি পোস্ট করতে গিয়ে আমি নিজের এলাকার পোস্ট অফিসই খুঁজে পাইনি। পরে জানতে পারি সেটি অনেক আগেই বন্ধ হয়ে গেছে। তিনি আরও বলেন, এখন মানুষ চিঠি লেখে না বলেই পোস্ট অফিসগুলো বন্ধ হয়ে যাচ্ছে। প্রয়োজন না থাকলে মানুষ জায়গাটার অস্তিত্বও ভুলে যায়। এই অভিজ্ঞতা শুধু একজনের নয় রংপুর জেলার প্রায় সকল উপজেলার ইউনিয়ন পোস্ট অফিস গুলোতে একই চিত্র। রংপুর জেলার উপজেলা গুলোতে যেসব পোস্ট অফিস এখনও চালু রয়েছে, সেখানে গেলে মনে হয় সময় যেন থমকে আছে। পুরনো দেয়াল, কাঠের কাউন্টার, সীমিত আসনব্যবস্থা সব মিলিয়ে এক ধরনের অতীতের আবহ তৈরি হয়।
বদরগঞ্জ শহরের একটি বড় পোস্ট অফিসে গিয়ে দেখা যায়, বিশাল জায়গা ফাঁকা পড়ে আছে। গ্রাহকদের বসার জন্য মাত্র দুইটি চেয়ার। লম্বা কাউন্টারের ওপাশে কর্মীরা কাজ করছেন, নেই একজন সেবাভোগী। রফিক নামে এক ভদ্রলোক আসলো চিঠি পাঠাতে তার চোখে মুখে বইছে আনন্দ। তাকে জিজ্ঞেস করলাম এতো খুশি কেনো? লোকটি বললো আমার চাকরি হয়েছে সেই চিঠি এসেছে কিছু কাগজপত্র চেয়েছিলো সেগুলো দিতে আসছি। তাকে জিজ্ঞেস করলাম এতো কষ্ট না করে আপনি তো ডিজিটাল যুগের সেবা নিতে পারতেন? তিনি বললো কষ্ট করে চাকরি হয়েছে পোষ্ট অফিসের চিঠির মাধ্যমে তাই কষ্ট করে সফলভাবে চিঠির মাধ্যমেই সব কাগজপত্র দিতে চাই তাতে আমার কষ্ট হবে না। তবে তার এই কথার মধ্যেও কিছু মানুষ নিয়মিত চিঠি পোস্ট করতে আসেন। তাদের কাছে চিঠি শুধু যোগাযোগ নয়, একটি অনুভূতির প্রকাশ।
এক সময় ডাকটিকেট সংগ্রহ ছিল শিশু-কিশোরদের অন্যতম প্রিয় শখ। বিদেশ থেকে আসা চিঠির খামের স্ট্যাম্প সংগ্রহ করা নিয়ে হতো প্রতিযোগিতা। ডাকটিকেট ছিল বিশ্বের বিভিন্ন দেশ সম্পর্কে জানার এক অনন্য মাধ্যম। বর্তমানে ইন্টারনেটের সহজলভ্যতায় সেই আগ্রহ অনেকটাই কমে গেছে। অনেকেই তাদের পুরনো স্ট্যাম্প অ্যালবাম এখন স্মৃতিচিহ্ন হিসেবে রেখে দিয়েছেন।রংপুর সদর উপজেলার মমিনপুর এলাকার আব্দুর ছাত্তার নামে এক ৮০ বছরের বৃদ্ধ বলেন, আমাদের সময় ডাকটিকেট ছিল খুব মূল্যবান। আমার পরিবারের সবাই বাহিরে থাকতো আমি নিয়মিত তাদের পোষ্ট অফিসে গিয়ে চিঠি পাঠাতাম ও ওপার থেকে ছেলে মেয়েদের চিঠি নিয়ে এসে পড়তাম মনটা জুড়ায় যেতো চিঠি পড়ে। আর এখনকার ছেলেমেয়েরা হয়তো এর গুরুত্ব বুঝবেই না।
রংপুর ডাক বিভাগের এক কর্মকর্তা বলেন,
ডিজিটাল প্রযুক্তির কারণে মানুষের যোগাযোগের ধরন বদলে গেছে। মোবাইল ফোন, ই-মেইল, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যম সব মিলিয়ে চিঠির ব্যবহার অনেক কমে গেছে। তিনি জানান,
আগে প্রতিদিন হাজার হাজার চিঠি আদান-প্রদান হতো। এখন সেই সংখ্যা খুবই কম। তবে সরকারি নথি ও কিছু অফিসিয়াল কাজে এখনও ডাক বিভাগের প্রয়োজন রয়েছে। ডাক বিভাগের আধুনিকায়ন প্রসঙ্গে তিনি বলেন, পোস্ট অফিসগুলোকে ডিজিটাল সেবা কেন্দ্র হিসেবে গড়ে তোলার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। আর্থিক লেনদেন, অনলাইন সেবা এসব চালুর মাধ্যমে মানুষকে আকৃষ্ট করার চেষ্টা চলছে। কালুপাড়া ইউনিয়নের গুটির ডাঙার স্থানীয় বাসিন্দা রহিমা বেগম বলেন,
আগে মাসে কয়েকটা চিঠি আসতো। এখন আর চিঠির নাম-গন্ধ নেই। সব কিছু মোবাইলেই হয়ে যায়। রংপুর সরকারি কলেজের সুমাইয়া নামে এক শিক্ষার্থী বলেন, চিঠি লেখার মধ্যে যে আবেগ, সেটা কোনো মেসেজে পাওয়া যায় না। কিন্তু আমরা সেই অভ্যাস হারিয়ে ফেলেছি। রংপুর বেগম রোকেয়া কলেজের এক শিক্ষক চিঠির স্মৃতিচারণ করে বলেন, ডাকপিয়নের জন্য অপেক্ষা করাটা ছিল জীবনের অংশ। এখন সব কিছু দ্রুত হয়েছে, কিন্তু সেই আনন্দটা আর নেই।
বদরগঞ্জ উপজেলার লোহানীপাড়া ইউনিয়নের মাঠের হাট পোস্ট অফিসের এক পিয়ন বলেন, এক সময় ডাক হরকরা বা রানাররা গ্রাম থেকে গ্রামে চিঠি পৌঁছে দিতেন। রাতের আঁধারে হাতে হারিকেন, কাঁধে ব্যাগ আর বিপদসংকুল পথে চলার সেই সাহসী মানুষগুলো ছিল যোগাযোগ ব্যবস্থার অগ্রদূত। আজ সেই পেশা প্রায় বিলুপ্ত। প্রযুক্তির উন্নয়নে যোগাযোগ সহজ হলেও, সেই মানবিক গল্পগুলো হারিয়ে যাচ্ছে সময়ের সাথে। ডিজিটাল প্রযুক্তি মানুষের জীবনকে সহজ করেছে এতে কোনো সন্দেহ নেই। মুহূর্তের মধ্যে বিশ্বের এক প্রান্ত থেকে অন্য প্রান্তে যোগাযোগ সম্ভব হচ্ছে। কিন্তু এই সহজতার মধ্যেই হারিয়ে যাচ্ছে কিছু মূল্যবান অনুভূতি। চিঠির মাধ্যমে যে ধৈর্য, অপেক্ষা আর আবেগের প্রকাশ ঘটতো, তা এখনকার দ্রুতগতির যোগাযোগে নেই বলেই মনে করেন অনেকে।বিশেষজ্ঞদের মতে, ডাকব্যবস্থাকে টিকিয়ে রাখতে আধুনিকায়নের পাশাপাশি ঐতিহ্য সংরক্ষণের উদ্যোগ নেওয়া জরুরি। স্কুল-কলেজে চিঠি লেখার চর্চা চালু করা, ডাকটিকেট প্রদর্শনী আয়োজন, পোস্ট অফিসকে বহুমুখী সেবাকেন্দ্রে রূপান্তর—এসব উদ্যোগ এই ঐতিহ্যকে নতুন প্রজন্মের কাছে তুলে ধরতে পারে। ডাক বিভাগকে সময়োপযোগী করে গড়ে তুলতে পারলে, এটি আবারও মানুষের জীবনে গুরুত্বপূর্ণ ভূমিকা রাখতে পারে। সময়ের পরিবর্তনে অনেক কিছুই হারিয়ে যায়, আবার নতুন কিছু আসে। কিন্তু কিছু স্মৃতি, কিছু অনুভূতি কখনো মুছে যায় না। রংপুরের মানুষের হৃদয়ে এখনও বেঁচে আছে সেই চিঠির দিন যেখানে প্রতিটি খাম ছিল এক একটি গল্প, প্রতিটি ডাকপিয়ন ছিল আবেগের দূত। প্রযুক্তির এই যুগেও সেই স্মৃতি যেন পুরোপুরি হারিয়ে না যায় এই প্রত্যাশাই রয়ে গেছে সবার মনে।





