
আলী কদর পলাশ
গণতন্ত্রের মূল শক্তি জনগণের আস্থা। সেই আস্থা টিকে থাকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং প্রতিষ্ঠানের নিরপেক্ষতার ওপর। কিন্তু যখন অভিযোগ ওঠে, গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের প্রচারের জন্য বাংলাদেশ ব্যাংকের তহবিল থেকে অর্থ দেওয়া হয়েছে, তখন প্রশ্ন ওঠে শুধু একটি অনুদান নিয়ে নয়, রাষ্ট্রীয় প্রতিষ্ঠানের নৈতিক অবস্থান নিয়েও।
প্রকাশিত খবরে বলা হয়েছে, ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদ নির্বাচনের সঙ্গে অনুষ্ঠিত গণভোটে প্রচারের জন্য বৈষম্যবিরোধী ছাত্র আন্দোলন বাংলাদেশ ব্যাংক থেকে এক কোটি টাকা অনুদান পেয়েছিল। একই সময়ে ব্যাংকগুলোর সিএসআর তহবিল থেকে সুজন আড়াই কোটি টাকা এবং ডিবেট ফর ডেমোক্রেসি ২০ লাখ টাকা পেয়েছে বলেও খবর এসেছে। অর্থ কীভাবে বরাদ্দ হলো, কোন নীতিতে ছাড় হলো এবং ব্যয় কতটা যথাযথ হয়েছে, এসব প্রশ্ন এখন জনমনে ঘুরছে। বাংলাদেশ ব্যাংক অডিট তদন্ত শুরু করেছে, যা অভিযোগের গুরুত্বই প্রমাণ করে।
বাংলাদেশ ব্যাংক দেশের আর্থিক ব্যবস্থার কেন্দ্রীয় প্রতিষ্ঠান। তার কাজ মুদ্রানীতি, ব্যাংক তদারকি ও আর্থিক স্থিতিশীলতা রক্ষা করা। রাজনৈতিক প্রচার বা গণভোটের কোনো পক্ষকে সহায়তা করা তার দায়িত্ব নয়। করপোরেট সামাজিক দায়বদ্ধতার অর্থ সাধারণত ব্যয় হওয়ার কথা শিক্ষা, স্বাস্থ্য, দুর্যোগ সহায়তা, দরিদ্র ও অনগ্রসর মানুষের কল্যাণে। সেই অর্থ যদি ভোট সংশ্লিষ্ট প্রচারে ব্যবহৃত হয়, তবে তা নীতিগতভাবে বিপজ্জনক দৃষ্টান্ত তৈরি করে।
গণভোট একটি সংবেদনশীল গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়া। এখানে রাষ্ট্রের প্রতিটি প্রতিষ্ঠানকে নিরপেক্ষ থাকতে হয়। কোনো পক্ষ যদি রাষ্ট্রীয় বা আধা রাষ্ট্রীয় উৎস থেকে সুবিধা পায়, তাহলে প্রতিযোগিতার সমতা ক্ষতিগ্রস্ত হয়। তখন ভোটার মনে সন্দেহ জন্মায়, সিদ্ধান্ত কি সত্যিই জনগণের স্বাধীন মতামতের প্রতিফলন, নাকি কোনো প্রভাবিত প্রচারের ফল।
দেশে যখন শিশুদের আইসিইউ সংকটে প্রাণ হারানোর খবর আসে, পুলিশ সদস্যদের আত্মহত্যা বাড়ার তথ্য প্রকাশিত হয়, অর্থনীতিতে যুদ্ধের ধাক্কায় সাধারণ মানুষের জীবনযাত্রার ব্যয় বাড়ে, তখন সরকারি ও আর্থিক প্রতিষ্ঠানের প্রতিটি টাকার ব্যবহার আরও বেশি জবাবদিহির দাবি রাখে। এমন সময়ে গণভোট প্রচারে কোটি টাকার অনুদান জনগণের কাছে স্বাভাবিকভাবেই প্রশ্নবিদ্ধ হবে।
এখন প্রয়োজন নিরপেক্ষ, পূর্ণাঙ্গ ও প্রকাশ্য তদন্ত। কারা সিদ্ধান্ত নিয়েছে, কোন নথির ভিত্তিতে অর্থ ছাড় হয়েছে, কারা অর্থ পেয়েছে এবং কীভাবে ব্যয় করেছে, সবকিছু জনগণের সামনে স্পষ্ট করতে হবে। শুধু অডিট করলেই চলবে না, তার ফলও প্রকাশ করতে হবে। অনিয়ম প্রমাণিত হলে দায়ীদের বিরুদ্ধে ব্যবস্থা নিতে হবে।
বাংলাদেশ ব্যাংকের মতো প্রতিষ্ঠানের ওপর আস্থা নষ্ট হলে তার প্রভাব পড়ে পুরো অর্থনীতিতে। তাই এই ঘটনা ছোট করে দেখার সুযোগ নেই। গণতন্ত্র শুধু ভোটে নয়, প্রতিষ্ঠানের সততা ও নিরপেক্ষতায় টিকে থাকে। জনগণের অর্থ জনগণের কল্যাণে ব্যয় হবে, কোনো পক্ষের প্রচারে নয়। এই নীতিই এখন দৃঢ়ভাবে প্রতিষ্ঠা করতে হবে।





