
রংপুর প্রতিনিধি
দারিদ্র্যের সঙ্গে প্রতিনিয়ত লড়াই করা এক রিকশাচালক বাবা। সংসারে চাল কিনতেই যেখানে তেলের টাকা থাকে না, সেখানে মেয়ের লেখাপড়ার খরচ জোগানো ছিল প্রায় অসম্ভব। তবুও মেয়ের স্বপ্ন পূরণের আশায় এক মাস একবেলা খেয়ে টাকা জমিয়ে এসএসসি (দাখিল) পরীক্ষার ফরম পূরণ করেছিলেন তিনি। কিন্তু সেই ত্যাগ, সেই স্বপ্ন—সবকিছু যেন মুহূর্তেই ভেঙে চুরমার হয়ে গেল। প্রবেশপত্র না পাওয়ায় পরীক্ষাকেন্দ্র থেকেই ফিরিয়ে দেওয়া হলো তার মেয়ে জান্নাতুল ফেরদৌসকে। মঙ্গলবার (২১ এপ্রিল) অনুষ্ঠিত এসএসসি ও সমমান পরীক্ষার প্রথম দিন রংপুরের মিঠাপুকুর উপজেলার একটি আলিম মাদ্রাসা কেন্দ্রে এ হৃদয়বিদারক ঘটনা ঘটে। জান্নাতুল ফেরদৌস উপজেলার বালুয়া মাসুমপুর ইউনিয়নের সন্তোষপুর হাচিয়া গ্রামের বাসিন্দা। বুজর্গ সন্তোষপুর কারামতিয়া ফাজিল মাদ্রাসা থেকে বিজ্ঞান বিভাগে এবারের দাখিল পরীক্ষায় অংশ নেওয়ার কথা ছিল তার। অভিযোগ অনুযায়ী, পরীক্ষার আগেই অন্যান্য প্রতিষ্ঠানের শিক্ষার্থীরা প্রবেশপত্র পেলেও জান্নাতুলের মাদ্রাসায় তা দেওয়া হয়নি। বরং পরীক্ষার দিন কেন্দ্রে গিয়ে প্রবেশপত্র বিতরণের সময়ও তার নাম তালিকায় না থাকায় সে প্রবেশপত্র পায়নি। ফলে পরীক্ষা না দিয়েই তাকে বাড়ি ফিরতে হয়।
কান্নাজড়িত কণ্ঠে জান্নাতুল ফেরদৌস জানায়,
“সবাই প্রবেশপত্র পেল, কিন্তু আমি পেলাম না। আগে দিলে আজ পরীক্ষা দিতে পারতাম। আমাকে প্রিন্সিপাল স্যারের কাছে নিয়ে গেলে তিনি বলেন, ‘এ বছর পরীক্ষা হলো না, আগামী বছর দিও।’ কিন্তু আমি তো এই বছরই পরীক্ষা দিতে চাই। সে আরও অভিযোগ করে, বিষয়টি ‘মীমাংসা’ করতে তার মাকে দুই হাজার টাকা দেওয়ার প্রস্তাব দেওয়া হয়, যা তারা প্রত্যাখ্যান করেছেন। সে আরও বলেন প্রতি প্রবেশপত্র নেয়ার জন্য ৫০০ টাকা করে নেয় সুপার। জান্নাতুলের মা এসমোতারা চোখের পানি ধরে রাখতে পারেননি। তিনি বলেন, ফরম পূরণের সময় আমাদের কাছ থেকে তিন হাজার টাকা চাওয়া হয়েছিল। অনেক কষ্ট করে ২ হাজার ৩০০ টাকায় ফরম পূরণ করি। এক মাস একবেলা খেয়ে এই টাকা জোগাড় করেছি। আজ আমার মেয়ে পরীক্ষা দিতে পারল না। তারা টাকা দিতে চায়—এই টাকা দিয়ে কি আমার মেয়ের এক বছর ফেরত পাব? তিনি আরও বলেন, আমার মেয়ে ডাক্তার হতে চায়। আজ তার স্বপ্নটা ভেঙে গেল।
রিকশাচালক জিয়াউর রহমান বলেন, ১০ বছর ধরে কষ্ট করে মেয়েকে পড়িয়েছি। নিজের খাওয়া-দাওয়া কমিয়ে তাকে পড়াশোনা করিয়েছি। পরীক্ষার দিন কেন প্রবেশপত্র দেওয়া হলো? আগে দিলে কি সমস্যা হতো? এই গাফিলতির দায় নিতে হবে সংশ্লিষ্টদের। স্থানীয় ইউপি সদস্য শাজাহান আলী বলেন, মেয়েটি নিয়মিত পড়াশোনা করেছে। অথচ পরীক্ষার দিন গিয়ে শুনি তার নামই তালিকায় নেই! এটা মারাত্মক অবহেলা। কর্তৃপক্ষ আগে কেন যাচাই করল না? পরে টাকা দিয়ে বিষয়টি মীমাংসার চেষ্টা করা হয়েছে এটা আরও লজ্জাজনক।
অভিযুক্ত মাদ্রাসার সুপারিনটেনডেন্ট এ কে মোনায়েম সরকার বলেন, ভুলটা হয়েছে যে শিক্ষক টাকা নিয়েছে। বিষয়টি দেখা হবে। তবে শিক্ষার্থীর ফরম পূরণ হয়েছে কি না এ বিষয়ে তিনি নিশ্চিত করে কিছু বলতে পারেননি। টাকা দিয়ে সমঝোতার অভিযোগ প্রসঙ্গে কোনো বক্তব্য না দিয়েই তিনি ফোন কেটে দেন। মিঠাপুকুর উপজেলা নির্বাহী কর্মকর্তা (ইউএনও) মো. পারভেজ বলেন, বিষয়টি আগে জানা ছিল না। এখন তদন্ত করে দোষীদের বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া হবে। আগে জানা গেলে তাৎক্ষণিক ব্যবস্থা নেওয়া যেত।
একটি প্রশাসনিক ভুল, অব্যবস্থাপনা বা দায়িত্বহীনতার কারণে জান্নাতুল ফেরদৌসের মতো একজন মেধাবী শিক্ষার্থীর একটি গুরুত্বপূর্ণ বছর নষ্ট হওয়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে। শিক্ষা সংশ্লিষ্টদের মতে, এ ধরনের ঘটনা শুধু একটি শিক্ষার্থীর ক্ষতি নয়, বরং পুরো শিক্ষা ব্যবস্থার উপর আস্থার সংকট তৈরি করে। স্থানীয় সচেতন মহল ও এলাকাবাসীর দাবি ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। দায়ীদের বিরুদ্ধে শাস্তিমূলক ব্যবস্থা নিতে হবে। জান্নাতুলকে বিশেষ ব্যবস্থায় পরীক্ষার সুযোগ দিতে হবে। চোখভরা অশ্রু আর বুকভরা হতাশা নিয়ে এখন দিন কাটছে জান্নাতুলের। তার প্রশ্ন আমি কি আবার এই বছর পরীক্ষা দিতে পারব? এই প্রশ্নের উত্তর এখন প্রশাসন ও সংশ্লিষ্ট কর্তৃপক্ষের হাতে। একটি সিদ্ধান্তই হয়তো ফিরিয়ে দিতে পারে এক কিশোরীর হারিয়ে যাওয়া স্বপ্ন।





