
আলী কদর পলাশ
জ্বালানি তেলের মূল্যবৃদ্ধি ঘিরে আন্তর্জাতিক মুদ্রা তহবিল বা আইএমএফ প্রসঙ্গে সরকারের অবস্থান এখন একটি গুরুত্বপূর্ণ অর্থনৈতিক ও রাজনৈতিক প্রশ্ন হয়ে দাঁড়িয়েছে। অর্থমন্ত্রী জানিয়েছেন, আগের সরকারের করা সব শর্ত বর্তমান সরকার মেনে নাও নিতে পারে। এই বক্তব্যের মধ্যে যেমন সার্বভৌম সিদ্ধান্তের ইঙ্গিত রয়েছে, তেমনি অর্থনীতির বাস্তব চাপের স্বীকারোক্তিও লুকিয়ে আছে।
বাংলাদেশের অর্থনীতি এখন এক জটিল সন্ধিক্ষণে। একদিকে বৈদেশিক মুদ্রার চাপ, অন্যদিকে রাজস্ব ঘাটতি এবং ভর্তুকির বোঝা। এই বাস্তবতায় আইএমএফের সহায়তা অনেকটা প্রয়োজনীয় হয়ে উঠেছে। কিন্তু এই সহায়তার সঙ্গে যে শর্তগুলো আসে, সেগুলো অনেক সময় দেশের সাধারণ মানুষের জন্য কষ্টদায়ক হয়ে দাঁড়ায়। জ্বালানি তেলের দাম বৃদ্ধি তারই একটি স্পষ্ট উদাহরণ। সরকার বলছে আন্তর্জাতিক বাজারের সঙ্গে সামঞ্জস্য রাখতে এই সিদ্ধান্ত, কিন্তু এর সরাসরি প্রভাব পড়ছে পরিবহন, কৃষি, শিল্প এবং নিত্যপণ্যের বাজারে।
প্রশ্ন হলো, আইএমএফের শর্ত মানা না মানার যে অবস্থান সরকার নিয়েছে, সেটি কতটা বাস্তবসম্মত। যদি সরকার সব শর্ত না মেনে চলে, তবে ভবিষ্যতে বৈদেশিক সহায়তা পাওয়া কঠিন হতে পারে। আবার সব শর্ত মেনে নিলে অভ্যন্তরীণ অর্থনীতি ও জনজীবনে চাপ আরও বাড়বে। এই দ্বৈত সংকটের মাঝেই নীতিনির্ধারণ করতে হচ্ছে সরকারকে।
অর্থনীতিবিদদের একটি বড় অংশ মনে করেন, সমস্যার মূল জায়গা শুধু শর্ত নয়, বরং অর্থনৈতিক ব্যবস্থাপনার দুর্বলতা। রাজস্ব আদায়ে ঘাটতি, অপচয়, দুর্নীতি এবং অদক্ষতা দীর্ঘদিন ধরে চাপ তৈরি করেছে। ফলে এখন আন্তর্জাতিক সংস্থার শর্ত সামনে এলেই তা বড় বোঝা হয়ে দেখা দিচ্ছে। যদি অভ্যন্তরীণ কাঠামোগত সংস্কার শক্তিশালী হতো, তবে এই নির্ভরতা এতটা তীব্র হতো না।
এই প্রেক্ষাপটে সরকারের জন্য সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ কাজ হলো ভারসাম্য তৈরি করা। একদিকে আন্তর্জাতিক অংশীদারদের সঙ্গে সম্পর্ক বজায় রাখা, অন্যদিকে দেশের মানুষের ওপর অতিরিক্ত চাপ না দেওয়া। বিশেষ করে নিম্ন ও মধ্যবিত্ত শ্রেণি ইতিমধ্যেই মূল্যস্ফীতির চাপে দিশেহারা। তাদের জন্য সামাজিক নিরাপত্তা কার্যক্রম জোরদার করা ছাড়া বিকল্প নেই।
সবশেষে বলা যায়, আইএমএফের শর্ত মানা বা না মানা শুধু একটি অর্থনৈতিক সিদ্ধান্ত নয়, এটি রাজনৈতিক দায়বদ্ধতারও পরীক্ষা। সরকার যদি সত্যিই দেশের স্বার্থকে অগ্রাধিকার দিতে চায়, তবে তাকে স্বচ্ছতা, জবাবদিহি এবং কার্যকর সংস্কারের পথে হাঁটতেই হবে। অন্যথায় এই সংকট সাময়িকভাবে সামাল দেওয়া গেলেও দীর্ঘমেয়াদে অর্থনীতি আরও বড় চাপে পড়বে।





