
এস এইচ খোকন, ফেনী
ফেনী শহরের ওয়ানস্টপ মেটারনিটি ক্লিনিকে এক প্রসূতির মৃত্যুর ঘটনাকে কেন্দ্র করে জেলাজুড়ে তীব্র ক্ষোভ ছড়িয়ে পড়েছে। স্বজনদের অভিযোগ, ভুল চিকিৎসা ও অবহেলার কারণেই প্রাণ হারাতে হয়েছে ফেনী সদর উপজেলার ফাজিলপুর শিবপুর গ্রামের প্রবাসী সুমনের স্ত্রী লিজা আক্তারকে। এ ঘটনাকে কেন্দ্র করে আজ শহরে মানববন্ধন অনুষ্ঠিত হয়েছে। মানববন্ধন থেকে অভিযুক্তদের গ্রেপ্তার এবং ক্লিনিকটি বন্ধের দাবী জানানো হয়েছে।
স্থানীয়দের অভিযোগ, ওয়ানস্টপ মেটারনিটি ক্লিনিককে ঘিরে দীর্ঘদিন ধরেই নানা অনিয়ম চলে আসছিল। ডাঃ নাসরিন আক্তার মুক্তার গাইনি বিষয়ে উচ্চতর ডিগ্রি না থাকলেও তিনি প্রসূতি রোগীদের চিকিৎসা দিয়ে আসছিলেন বলে অভিযোগ রয়েছে। তার স্বামী নাজমুল হকও নিজেকে চিকিৎসক হিসেবে পরিচয় দিয়ে বিভিন্ন কার্যক্রমে যুক্ত ছিলেন। সাধারণ রোগীদের নানা কৌশলে ওই ক্লিনিকে নেওয়া, অপ্রয়োজনীয় সিজার করানো এবং পরে ভয়ভীতি দেখিয়ে মোটা অংকের বিল আদায়ের অভিযোগও ওঠে তাদের বিরুদ্ধে।
শহরের শহীদ শহীদুল্লা কায়সার সড়কের সুন্দরবন কুরিয়ারের পাশের একটি ভবনে গড়ে তোলা হয় ওয়ানস্টপ মেটারনিটি ক্লিনিক। স্থানীয়দের ভাষ্য, নামের মিল ও প্রচারের কারণে গ্রামের সহজ সরল মানুষ এটিকে নির্ভরযোগ্য প্রতিষ্ঠান মনে করে সেখানে চিকিৎসা নিতে যেতেন। অভিযোগ রয়েছে, সরকারি হাসপাতালের রোগীদেরও কৌশলে ব্যক্তিগত এই ক্লিনিকে নিয়ে আসা হতো। সেখানে রোগীদের নানা ভয় দেখিয়ে সিজারিয়ান অপারেশনে বাধ্য করা হতো বলেও অনেকে দাবী করেছেন।
স্বজনদের অভিযোগ অনুযায়ী, শনিবার রাতে লিজা আক্তারের সিজারিয়ান অপারেশন করা হয় ওয়ানস্টপ মেটারনিটি ক্লিনিকে। অপারেশনের সময় গুরুতর জটিলতা তৈরি হলে তার শরীরে অতিরিক্ত রক্তক্ষরণ শুরু হয়। পরিবারের সদস্যরা অভিযোগ করেন, পরিস্থিতি সংকটাপন্ন হয়ে উঠলেও দ্রুত উন্নত চিকিৎসার ব্যবস্থা না করে সময়ক্ষেপণ করা হয়। পরে তাকে ফেনী প্রাইভেট হাসপাতালে নেওয়া হলে সেখানে আবারো অপারেশন করা হয়। কিন্তু অবস্থার আরও অবনতি হলে চট্টগ্রাম মেডিকেলে পাঠানো হয়। পথে রক্তশূন্য হয়ে মারা যান লিজা আক্তার।
নিহত লিজা আক্তারের স্বজনরা জানান, অপারেশনের পর থেকেই তার শারীরিক অবস্থার দ্রুত অবনতি হচ্ছিল। তারপরও রাতে তাকে চট্টগ্রামে না পাঠিয়ে সকালে আবারো অন্য হাসপাতালে নেওয়া হয়। তাদের অভিযোগ, সংকটময় অবস্থাতেও রোগীর জীবন বাঁচানোর চেয়ে বিল আদায়ের দিকেই বেশি গুরুত্ব দেওয়া হয়েছে। লিজার চার বছর বয়সী একটি ছেলে সন্তান রয়েছে। এটি ছিল তার দ্বিতীয় সন্তান।
ফেনীর স্থানীয় বাসিন্দাদের অভিযোগ, এর আগেও এই ক্লিনিক এবং সংশ্লিষ্টদের বিরুদ্ধে ভুল চিকিৎসা ও রোগীর মৃত্যুর অভিযোগ উঠেছে। তবে প্রতিবারই কিছুদিন আড়ালে থেকে পরে আবারো আগের মতো কার্যক্রম চালানো হয়েছে। এ কারণে এবার ক্ষোভ আরও তীব্র আকার নিয়েছে। সচেতন মহল বলছে, অভিযোগগুলো নিরপেক্ষ তদন্তের মাধ্যমে যাচাই করে প্রয়োজনীয় আইনগত ব্যবস্থা নেওয়া জরুরি।
আজ ফেনী শহরে অনুষ্ঠিত মানববন্ধনে অংশ নেওয়া স্থানীয় বাসিন্দা, সচেতন নাগরিক ও ভুক্তভোগী পরিবারের সদস্যরা বলেন, এ ঘটনার সুষ্ঠু তদন্ত করতে হবে। একইসঙ্গে স্বামী-স্ত্রী ডাঃ নাজমুল ও ডাঃ মুক্তার বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ, ওয়ানস্টপ মেটারনিটি ক্লিনিকের কার্যক্রম বন্ধ এবং স্বাস্থ্যখাতে এমন অনিয়মের বিরুদ্ধে কঠোর নজরদারির দাবী জানান তারা। বক্তারা বলেন, দ্রুত ব্যবস্থা না নিলে আরও নিরীহ পরিবার একই ধরনের ঘটনার শিকার হতে পারে।
লিজা আক্তারের মৃত্যুর পর ফেনীতে এখন একটাই প্রশ্ন ঘুরপাক খাচ্ছে, আর কত প্রাণ গেলে থামবে অবহেলা আর অনিয়মের এই চক্র। স্থানীয়দের ভাষায়, নিরীহ মানুষকে চিকিৎসার নামে প্রতারণা করে কারও পার পাওয়ার সুযোগ নেই। তাই এ ঘটনার দৃষ্টান্তমূলক বিচার এবং দায়ীদের দ্রুত আইনের আওতায় আনার দাবী এখন গণদাবীতে পরিণত হয়েছে।





