
আলী কদর পলাশ
যুক্তরাষ্ট্র ও ইরানের মধ্যে শর্তসাপেক্ষ যুদ্ধবিরতির ঘোষণা আন্তর্জাতিক অঙ্গনে এক ধরনের স্বস্তির অনুভূতি তৈরি করেছে। সাম্প্রতিক উত্তেজনা, পাল্টাপাল্টি হুমকি এবং সম্ভাব্য সংঘাতের আশঙ্কা বিশ্বকে যে অনিশ্চয়তার দিকে ঠেলে দিচ্ছিল, এই সিদ্ধান্ত তা সাময়িকভাবে হলেও থামিয়েছে। এটি নিঃসন্দেহে একটি ইতিবাচক অগ্রগতি। তবে এর গুরুত্ব কেবল সামরিক বিরতিতে সীমাবদ্ধ নয়। এর ভেতরে লুকিয়ে আছে মানবিক বোধে ফিরে আসার একটি গুরুত্বপূর্ণ সুযোগ।
যুদ্ধ কখনোই কোনো সমস্যার স্থায়ী সমাধান দিতে পারে না, এ কথা নতুন নয়। তবুও বারবার বিশ্ব সেই একই ভুলের পুনরাবৃত্তি দেখে। শক্তির প্রদর্শন, আধিপত্য বিস্তার বা প্রতিরোধের নামে সংঘাত শুরু হয়। কিন্তু শেষ পর্যন্ত তার সবচেয়ে বড় মূল্য দেয় সাধারণ মানুষ। তাদের ঘরবাড়ি ধ্বংস হয়, জীবন-জীবিকা বিপর্যস্ত হয়, ভবিষ্যৎ অনিশ্চয়তায় ডুবে যায়। শিশুদের শিক্ষা বন্ধ হয়ে যায়, চিকিৎসা ব্যবস্থা ভেঙে পড়ে, আর সমাজে দীর্ঘস্থায়ী মানসিক ক্ষত তৈরি হয়।
এই বাস্তবতায় যুদ্ধবিরতি শুধু একটি রাজনৈতিক বা কূটনৈতিক পদক্ষেপ নয়। এটি মানবিক বিবেচনার প্রতিফলন হওয়া উচিত। যখন দুই পক্ষ অন্তত সাময়িকভাবে হলেও অস্ত্র নামিয়ে রাখে, তখন সেখানে সংলাপের সুযোগ তৈরি হয়। সেই সুযোগকে কাজে লাগানোই এখন সবচেয়ে বড় দায়িত্ব। পাকিস্তানের মধ্যস্থতায় এই সমঝোতা হওয়া প্রমাণ করে, কূটনৈতিক প্রচেষ্টা এখনো কার্যকর হতে পারে। আন্তরিক উদ্যোগ থাকলে সংঘাত কমানো সম্ভব।
এই যুদ্ধবিরতির আরেকটি তাৎপর্য অর্থনৈতিক ক্ষেত্রে দেখা গেছে। ঘোষণার পরপরই বিশ্ববাজারে তেলের দাম কমতে শুরু করেছে। এটি দেখায়, আঞ্চলিক সংঘাত কত দ্রুত বৈশ্বিক অর্থনীতিকে প্রভাবিত করে। জ্বালানির দাম বাড়লে তার প্রভাব পড়ে পরিবহন, উৎপাদন এবং নিত্যপ্রয়োজনীয় পণ্যের ওপর। ফলে শেষ পর্যন্ত ক্ষতিগ্রস্ত হয় সাধারণ মানুষই। তাই শান্তি শুধু নৈতিকতার প্রশ্ন নয়, এটি অর্থনৈতিক স্থিতিশীলতার সঙ্গেও সরাসরি যুক্ত।
তবে বাস্তবতা হলো, এই যুদ্ধবিরতি এখনো নাজুক। এটি একটি সূচনা মাত্র, সমাধান নয়। পারস্পরিক অবিশ্বাস, দীর্ঘদিনের রাজনৈতিক দ্বন্দ্ব এবং আঞ্চলিক শক্তির ভারসাম্য সব মিলিয়ে পরিস্থিতি জটিল। তাই এই বিরতিকে স্থায়ী শান্তির পথে রূপ দিতে হলে ধারাবাহিক আলোচনা প্রয়োজন। উভয় পক্ষকে দায়িত্বশীল আচরণ করতে হবে। আন্তর্জাতিক আইন ও পারস্পরিক সম্মান বজায় রাখতে হবে।
বিশ্ববাসী এখন যে স্বস্তির নিঃশ্বাস ফেলছে, সেটি যেন ক্ষণস্থায়ী না হয়। এই সময়টিকে কাজে লাগিয়ে একটি দীর্ঘমেয়াদি সমঝোতার ভিত্তি গড়ে তোলা জরুরি। কারণ যুদ্ধের ময়দানে শেষ পর্যন্ত কোনো পক্ষই প্রকৃত অর্থে জয়ী হয় না। জয়ী হয় কেবল ধ্বংস, আর পরাজিত হয় মানবতা।
আজকের এই যুদ্ধবিরতি আমাদের একটি গুরুত্বপূর্ণ বার্তা দেয়। মানবিক বোধ এখনো পুরোপুরি হারিয়ে যায়নি। সেই বোধকে শক্তিশালী করতে হবে। রাষ্ট্রীয় স্বার্থের পাশাপাশি মানুষের জীবন ও নিরাপত্তাকে অগ্রাধিকার দিতে হবে। তাই এখন সময় একটাই সিদ্ধান্ত নেওয়ার। সংঘাত নয়, সংলাপের পথেই এগোতে হবে। যুদ্ধ নয়, শান্তিই হোক ভবিষ্যতের ভিত্তি।





