
বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও নেপাল সাম্প্রতিক সময়ে প্রায় একই ধরনের রাজনৈতিক পালাবদলের মধ্য দিয়ে গেছে। দুই দেশেই গণঅভ্যুত্থানে ক্ষমতা হারিয়েছেন প্রতিষ্ঠিত শাসকরা। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের আগস্টে শেখ হাসিনা এবং নেপালে ২০২৫ সালের সেপ্টেম্বরে কে পি শর্মা ওলি বিদায় নেন। দুই ক্ষেত্রেই আন্দোলনের কেন্দ্রে ছিল তরুণ প্রজন্ম। অর্থনৈতিক ব্যর্থতা, দুর্নীতি, স্বজনপ্রীতি এবং গণতান্ত্রিক প্রক্রিয়ার ক্ষয় তাদের রাস্তায় নামায়। পরে দুই দেশেই অন্তর্বর্তী ব্যবস্থার পর অনুষ্ঠিত হয় জাতীয় নির্বাচন। কিন্তু নতুন নেতৃত্বের প্রথম দিকের পদক্ষেপেই স্পষ্ট হচ্ছে, ঢাকা ও কাঠমান্ডু এখন দুই ভিন্ন পথে হাঁটছে।
প্রাথমিক ইঙ্গিত বলছে, বাংলাদেশের প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান শুরু থেকেই তুলনামূলক সংযত, স্থির এবং রাজনৈতিকভাবে হিসাবি অবস্থান নিয়েছেন। অন্যদিকে নেপালের প্রধানমন্ত্রী বালেন শাহ দায়িত্ব নেওয়ার পরই এমন কিছু পদক্ষেপ নিয়েছেন, যা তার সরকারের উদ্দেশ্য ও পদ্ধতি নিয়ে প্রশ্ন তুলেছে।
নেপালে বালেন শাহ নিঃসন্দেহে অত্যন্ত জনপ্রিয় নেতা। কিন্তু জনপ্রিয়তার সঙ্গে বড় প্রত্যাশাও এসে জুড়েছে। তার সামনে প্রধান চ্যালেঞ্জ ছিল রাষ্ট্রের বিশ্বাসযোগ্যতা ফিরিয়ে আনা এবং বিভক্ত সমাজে ঐক্য প্রতিষ্ঠা করা। অথচ ক্ষমতায় আসার ২৪ ঘণ্টার মধ্যেই তার সরকার সাবেক প্রধানমন্ত্রী কে পি শর্মা ওলি এবং সাবেক স্বরাষ্ট্রমন্ত্রী রমেশ লেখককে গ্রেপ্তার করে। জেন জি আন্দোলন দমনে তাদের ভূমিকা নিয়ে অভিযোগ থাকলেও আদালতের পরোয়ানা ছাড়া এই গ্রেপ্তার উদ্বেগের জন্ম দিয়েছে।
এতে সন্দেহ নেই, আন্দোলন দমনে রাষ্ট্রের ভূমিকা ছিল কঠোর ও রক্তাক্ত। অন্তত ৭০ জন নিহত হন। কিন্তু নতুন ব্যবস্থার প্রথম পরীক্ষাই হলো, প্রতিশোধ নয়, ন্যায়বিচারের পথ বেছে নেওয়া। সেই জায়গায় বালেন শাহের সরকারের শুরুটা স্বস্তি দেয়নি। বরং এতে এই শঙ্কা তৈরি হয়েছে যে, নতুন ক্ষমতাসীনরা রাজনৈতিক শক্তিকে ব্যবহার করে পুরনো প্রতিপক্ষকে কোণঠাসা করতে চাইতে পারে।
বালেন শাহকে মনে রাখতে হবে, তিনি শুধু তার ভোটারদের নেতা নন। যারা তার বিরোধিতা করেছেন, তাদেরও নেতা। এই সত্য থেকে বিচ্যুতি হলে তার সরকারের বৈধতা দুর্বল হবে। শুধু তা-ই নয়, ন্যায়বিচারের যে প্রক্রিয়ার নামে নতুন রাজনীতি শুরু হয়েছে, মানুষের আস্থাও সেখান থেকে সরে যাবে।
বাংলাদেশে তারেক রহমানের শুরুটা তুলনামূলকভাবে ভিন্ন। তিনি প্রতিশোধপরায়ণতার বদলে স্থিতিশীলতা, আইনশৃঙ্খলা এবং প্রাতিষ্ঠানিক পুনর্গঠনকে বেশি গুরুত্ব দিচ্ছেন—এমন বার্তাই সামনে এসেছে। তার সরকার সমাজের বিভিন্ন অংশে গ্রহণযোগ্যতা গড়ে তোলার চেষ্টা করছে। আগের অন্তর্বর্তী সময়ে আওয়ামী লীগ সমর্থক ও সংখ্যালঘুদের ওপর হামলার যে অভিযোগ উঠেছিল, তার পরিপ্রেক্ষিতে এই অবস্থান রাজনৈতিকভাবে তাৎপর্যপূর্ণ।
তারেক রহমানের প্রথম কয়েক সপ্তাহে সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত শব্দ ছিল ঐক্য। ২৬ মার্চ স্বাধীনতা দিবসের ভাষণেও তিনি সেই আহ্বান পুনর্ব্যক্ত করেন। একইসঙ্গে তিনি গণহত্যা দিবস পালনের ধারাবাহিকতা বজায় রেখে ১৯৭১ সালে পাকিস্তানি বাহিনীর নৃশংস হত্যাযজ্ঞের কথাও স্মরণ করেন। এতে বোঝা যায়, তিনি রাষ্ট্রের ধারাবাহিকতা ও জাতীয় স্মৃতির প্রশ্নে সংঘাতের বদলে সংযমী অবস্থান নিতে চাইছেন।
বাংলাদেশ ও নেপালের নতুন নেতৃত্বের সামনে এখন বড় সুযোগ। তারা চাইলে গণতন্ত্রকে নতুন শক্তি দিতে পারেন। রাষ্ট্রের প্রতি মানুষের বিশ্বাস ফিরিয়ে আনতে পারেন। কিন্তু তার জন্য প্রয়োজন আইনের শাসনের প্রতি অটল শ্রদ্ধা, প্রাতিষ্ঠানিক বিশ্বাসযোগ্যতা এবং প্রতিশোধের রাজনীতি থেকে দূরে থাকা। শুরুটা দেখে আপাতত মনে হচ্ছে, ঢাকা সামনে এগোচ্ছে, আর কাঠমান্ডু পা ফেলছে উল্টো দিকে।
দ্য ইন্ডিয়ান এক্সপ্রেস অবলম্বনে





