জ্বালানি সংকট ও ঋণনির্ভর অর্থনীতি

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

দেশের সামনে এখন দুটি বড় সংকট স্পষ্ট হয়ে উঠছে। একটি জ্বালানি খাতে, অন্যটি অর্থনীতিতে। জ্বালানি সরবরাহে অস্থিরতা যেমন মানুষের দৈনন্দিন জীবনকে দুর্বিষহ করে তুলছে, তেমনি সরকারি ঋণের অস্বাভাবিক বৃদ্ধি অর্থনীতির ভেতরের দুর্বলতাকে আরও প্রকাশ করছে। এই দুই সংকটকে আলাদা করে দেখার সুযোগ নেই। কারণ একটির প্রভাব অন্যটির ওপর গিয়ে পড়ছে।

জ্বালানি পরিস্থিতি নিয়ে সরকারের বক্তব্য এবং মাঠের বাস্তবতার মধ্যে বড় ফারাক দেখা যাচ্ছে। একদিকে বলা হচ্ছে, বিভিন্ন এলাকা থেকে বিপুল পরিমাণ মজুত করা তেল উদ্ধার করা হয়েছে। অন্যদিকে রাজধানীসহ দেশের নানা স্থানে ফিলিং স্টেশনে দীর্ঘ লাইন কমছে না। মানুষকে ঘণ্টার পর ঘণ্টা অপেক্ষা করতে হচ্ছে। এতে বোঝা যায়, সমস্যা শুধু অবৈধ মজুতের নয়। এর সঙ্গে জড়িয়ে আছে সরবরাহ ব্যবস্থার দুর্বলতা, বণ্টনে সমন্বয়হীনতা এবং বাজার তদারকির ঘাটতি।

পারস্য উপসাগরে চলমান যুদ্ধ পরিস্থিতির কারণে পেট্রোলিয়াম পণ্যের আন্তর্জাতিক সরবরাহ বিঘ্নিত হওয়া অবশ্যই উদ্বেগের বিষয়। বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর জ্বালানি অর্থনীতি। ফলে বাইরের যেকোনো অস্থিরতার প্রভাব দেশের বাজারে এসে পড়বে, এটাই স্বাভাবিক। কিন্তু সেই বাস্তবতা আগেই ধরে বিকল্প পরিকল্পনা নেওয়া উচিত ছিল। সংকটের সময় এসে প্রশাসনিক তৎপরতা বাড়ানো হয়তো প্রয়োজনীয়, কিন্তু তা যথেষ্ট নয়। এমন পরিস্থিতি সামাল দিতে হলে আগে থেকেই মজুত, বণ্টন এবং বাজার ব্যবস্থাপনায় কার্যকর প্রস্তুতি থাকতে হয়।

নড়াইলে একটি পেট্রলপাম্পে বাকবিতণ্ডার জেরে স্টেশন ম্যানেজার নিহত হওয়ার ঘটনা আমাদের আরও একটি কঠিন সত্যের মুখোমুখি দাঁড় করায়। জ্বালানি সংকট কেবল অর্থনৈতিক সমস্যা হয়ে থাকে না; একসময় তা সামাজিক উত্তেজনা, বিশৃঙ্খলা এবং সহিংসতার কারণও হয়ে উঠতে পারে। যখন প্রয়োজনীয় পণ্যের সরবরাহ অনিশ্চিত হয়ে পড়ে, তখন মানুষের অস্থিরতা বাড়ে। সেই চাপ মাঠপর্যায়ে ভয়াবহ রূপ নিতে পারে। তাই জ্বালানি খাতের সুশাসন এখন শুধু অর্থনৈতিক নয়, সামাজিক স্থিতিশীলতার প্রশ্নও।

এদিকে অর্থনীতির সামগ্রিক চিত্রও স্বস্তিদায়ক নয়। জিডিপি প্রবৃদ্ধির হার কমে এসেছে। রপ্তানি প্রবৃদ্ধি টানা নেতিবাচক। আমদানি বৃদ্ধিও ধীর। ব্যাংক খাতে আমানত প্রবৃদ্ধি সীমিত। কর্মসংস্থানের ক্ষেত্রেও সম্প্রসারণের বদলে সংকোচনের আভাস মিলছে। অর্থনীতির এসব মৌলিক সূচক যখন দুর্বলতার কথা বলছে, তখন স্বাভাবিক প্রত্যাশা ছিল উৎপাদনমুখী বিনিয়োগ বাড়াতে বিশেষ উদ্যোগ নেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে দেখা যাচ্ছে, বেসরকারি খাতে ঋণ প্রবৃদ্ধি খুবই কম।

এর বিপরীতে সরকারের ব্যাংক ঋণ এক বছরে প্রায় ৩০ শতাংশ বেড়েছে। এই প্রবণতা মোটেও স্বাভাবিক নয়। সরকার যখন ক্রমশ বেশি হারে ব্যাংকঋণের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ে, তখন তার প্রভাব পুরো অর্থনীতির ওপর পড়ে। ব্যাংক থেকে সরকারি ঋণ বাড়লে বেসরকারি খাতের জন্য ঋণের সুযোগ কমে যায়। অর্থাৎ যে খাত কর্মসংস্থান সৃষ্টি করে, উৎপাদন বাড়ায় এবং অর্থনীতিকে সচল রাখে, সেই খাতই পিছিয়ে পড়ে। এতে অর্থনীতির ভারসাম্য নষ্ট হয়।

সরকারি ঋণ সব সময় খারাপ নয়। উন্নয়ন ব্যয়, অবকাঠামো বা জরুরি পরিস্থিতি মোকাবিলায় ঋণ প্রয়োজন হতে পারে। কিন্তু সেই ঋণের ব্যবহার কতটা উৎপাদনশীল, সেটিই আসল প্রশ্ন। যদি ঋণ নিয়ে কেবল চলতি ব্যয় মেটানো হয়, তাহলে তা ভবিষ্যতের জন্য বড় বোঝা হয়ে দাঁড়ায়। এখন যে তথ্য সামনে আসছে, তা থেকে উদ্বেগ কমছে না। কারণ অর্থনীতির গতি যখন কমছে, তখন ঋণের গতি বেড়ে যাওয়া সুস্থ অর্থনীতির লক্ষণ নয়।

সরকারের সামনে তাই এখন বড় চ্যালেঞ্জ হলো একই সঙ্গে জ্বালানি খাতে শৃঙ্খলা ফিরিয়ে আনা এবং অর্থনীতিতে আর্থিক সংযম প্রতিষ্ঠা করা। জ্বালানি খাতে জরুরি ভিত্তিতে বণ্টনব্যবস্থা আরও কার্যকর করতে হবে। কোথায় কী পরিমাণ সরবরাহ যাচ্ছে, কোথায় কৃত্রিম সংকট তৈরি হচ্ছে, কারা মজুতদারির সঙ্গে জড়িত—এসব বিষয়ে কঠোর ও দৃশ্যমান পদক্ষেপ প্রয়োজন। পাশাপাশি আন্তর্জাতিক বাজারের ঝুঁকি বিবেচনায় বিকল্প উৎস, দীর্ঘমেয়াদি আমদানি পরিকল্পনা এবং কৌশলগত মজুত গড়ে তোলার বিষয়েও গুরুত্ব দিতে হবে।

অর্থনীতির ক্ষেত্রেও প্রয়োজন বাস্তবসম্মত সিদ্ধান্ত। অপ্রয়োজনীয় সরকারি ব্যয় কমাতে হবে। ব্যাংকঋণের ওপর অতিনির্ভরতা কমিয়ে রাজস্ব আহরণ বাড়ানোর দিকে জোর দিতে হবে। একই সঙ্গে বেসরকারি খাতে বিনিয়োগের পরিবেশ ফিরিয়ে আনতে হবে। উৎপাদন, কর্মসংস্থান এবং রপ্তানি সক্ষমতা না বাড়িয়ে শুধু ঋণ বাড়ালে সাময়িক চাপ সামলানো গেলেও দীর্ঘমেয়াদে সংকট গভীর হবে।

এখন সবচেয়ে জরুরি হলো বাস্তবতা স্বীকার করা। জ্বালানি খাতে যে অস্থিরতা তৈরি হয়েছে, তা সাময়িক ব্যাখ্যায় ঢেকে রাখা যাবে না। অর্থনীতিতে যে ঋণনির্ভরতা বাড়ছে, তাকেও স্বাভাবিক বলে চালিয়ে দেওয়া যাবে না। মানুষের দুর্ভোগ কমাতে হলে এবং অর্থনীতিকে বড় ঝুঁকি থেকে বাঁচাতে হলে সরকারকে দ্রুত, সুশৃঙ্খল এবং দায়িত্বশীল পদক্ষেপ নিতে হবে। অন্যথায় এই দুই সংকট মিলেই সামনে আরও বড় অস্থিরতার জন্ম দেবে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...