
মুখপাত্র ডেস্ক
অন্তর্বর্তী সরকারের অন্তত তিনজন উপদেষ্টা নির্বাচন বিলম্বিত করার নানা কৌশলে সক্রিয় ছিলেন। সহযোগী মানবজমিনের এক প্রতিবেদনে আরো বলা হয়, আরেকজন অস্থির উপদেষ্টা ছিলেন সুবিধাবাদী ভূমিকায়। তিনি দুই পক্ষকেই খুশি রেখে সময় কাটিয়েছেন।
পত্রিকাটি লিখেছে, শুরুতে দ্রুততম সময়ের মধ্যে নির্বাচন দেওয়ার বিষয়ে প্রফেসর ড. মুহাম্মদ ইউনূস ভাবছিলেন। পরে তিনি একগুচ্ছ সংস্কার প্রস্তাব জাতির সামনে উপস্থাপন করেন। এসব সংস্কারের পেছনে ক্ষমতার মেয়াদ বাড়ানোর ছক ছিল। এমন কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। ভাষ্য অনুযায়ী, তিন উপদেষ্টার চাপের কারণে দ্রুত নির্বাচন থেকে পিছু হটেন ড. ইউনূস।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উপদেষ্টারা যুক্তি দিতেন, এত দ্রুত নির্বাচন দেওয়া ঠিক হবে না। পরিস্থিতি সামাল দেওয়া কঠিন হবে। আইনশৃঙ্খলা নাজুক। নির্বাচন দ্রুত হলে পরিস্থিতি নিয়ন্ত্রণে রাখা যাবে না। এই যুক্তিগুলোর পেছনে তাদের বিশেষ লক্ষ্য ছিল একটাই। ক্ষমতা দীর্ঘায়িত করা। এবং কৌশলে তাদের পছন্দের শক্তির কাছে ক্ষমতা তুলে দেওয়ার পথ তৈরি করা।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, এ পরিকল্পনা শেষ পর্যন্ত ভেস্তে যায় জনচাপে এবং ভূ-রাজনৈতিক বাস্তবতায়। আঞ্চলিক রাজনৈতিক শক্তি ছিল খুব তৎপর। তারা চাইত যত দ্রুত সম্ভব নির্বাচন আয়োজন হোক। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, এর অন্যতম উদ্দেশ্য ছিল প্রফেসর ইউনূসের নেতৃত্বের অবসান। পাশাপাশি বৈদেশিক চাপও ছিল। আন্তর্জাতিক মহলকে বোঝানোর চেষ্টা চলেছিল। নির্বাচন দ্রুত হলে কী কী সমস্যা হতে পারে। পত্রিকাটির ভাষ্য অনুযায়ী, একটি আন্তর্জাতিক শক্তিকে তারা এই যুক্তি দিয়ে কনভিন্স করতে সক্ষম হয়েছিলেন।
প্রতিবেদনে বলা হয়, উপদেষ্টাদের কৌশলের অন্যতম হাতিয়ার ছিল মব সন্ত্রাস। তারা কৌশলের অংশ হিসেবে মব সন্ত্রাসকে উসকে দিতেন। এতে প্রশাসনের গতি বারবার থেমে যেত। পরিস্থিতি অনিশ্চিত থাকত। এবং নির্বাচন প্রশ্নে চাপ তৈরি হতো।
পত্রিকাটি বলছে, সন্ধ্যা হলেই তারা বৈঠকে বসতেন। আরও দু’একজন থাকতেন। যারা ক্ষমতায় না থেকেও প্রভাব রাখতেন। এক পর্যায়ে তারা এতটাই শক্তিশালী হয়ে ওঠেন যে প্রফেসর ইউনূস অসহায় হয়ে পড়েন। সিদ্ধান্ত বারবার বদলাতে থাকেন। শেষে আঞ্চলিক শক্তির চাপ এবং নিজের হিসাব-নিকাশ মেলাতেই তিনি নির্বাচনমুখী হতে বাধ্য হন। এমনটাই প্রতিবেদনের বক্তব্য।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, লন্ডন বৈঠক ছিল নির্বাচনমুখী হওয়ারই একটি অংশ। কিন্তু ওই উপদেষ্টারা বৈঠকের আগেই নানা ষড়যন্ত্রে যুক্ত হন। তারা বলতে থাকেন, এই বৈঠক প্রশাসনকে দুর্বল করবে। মানুষের কাছে ভুল বার্তা যাবে। এমনকি বৈঠকের ফলাফলও বানচালের চেষ্টা চলেছিল। তাদের পছন্দের রাজনৈতিক শক্তিকে কাজে লাগানো হয়েছিল। এতে প্রধান উপদেষ্টা আবার দ্বিধায় পড়েন। নির্বাচন তখন অনিশ্চিত হয়ে পড়ে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, দেশের ভেতরকার একটি শক্তি চাপ দিতে থাকে নির্বাচন ছাড়া কোনো বিকল্প নেই। তা না হলে অন্য বিপদ হতে পারে। তারপরও নির্বাচনবিরোধী তৎপরতা থেমে যায়নি। ধীরে ধীরে প্রশাসনকে কবজা করার চেষ্টা হয়। এমন পরিস্থিতি তৈরি হয় যে মনে হয়েছিল প্রফেসর ইউনূসকে হটিয়ে তারা ক্ষমতার মসনদে চলে যাবে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, পর্দার আড়ালের তৎপরতার দিকে প্রধান রাজনৈতিক শক্তি খুব কাছ থেকে নজর রাখছিল। তারা বরাবরই নির্বাচন চেয়েছে। হঠকারী সিদ্ধান্তে প্রতিক্রিয়া দেখায়নি। তবে মব সন্ত্রাস প্রশাসনের গতি থামিয়ে দিচ্ছিল বারবার।
অন্যদিকে, প্রথম আলো ও ডেইলি স্টারের ঘটনার দিনও পরিস্থিতি ছিল তাৎপর্যপূর্ণ। প্রতিবেদন বলছে, কারা নির্দেশ দিয়েছিল পুলিশ যাতে সময়মতো না যায়। সে প্রশ্নও উঠেছিল। বাস্তবে পুলিশ অনেক বিলম্বে ঘটনাস্থলে পৌঁছায়। পুলিশের বড় কর্তার ভূমিকা ছিল রহস্যজনক এমন ইঙ্গিতও প্রতিবেদনে আছে।
পত্রিকান্তরে প্রকাশ, প্রফেসর ইউনূসকে অনেক সময় অন্ধকারে রাখা হয়েছিল। পরে তিনি একজন সিনিয়র সাংবাদিককে বলেছেন, তখন তিনি ঘুমিয়ে ছিলেন। কিছুই জানতেন না। এর আগে ওসমান হাদীর মৃত্যুকে ঘিরেও ব্যাপক প্রতিক্রিয়া হয় দেশে। সেই সুযোগও নিতে চেয়েছিলেন কেউ কেউ এমন কথাও প্রতিবেদনে এসেছে। তবে সেনাবাহিনী ছিল সতর্ক। রাজনৈতিক শক্তিগুলোও ছিল তৎপর। সোশ্যাল মিডিয়া পর্যালোচনায় আরও কিছু আলামত পাওয়া যায়- এই খবরকে ভিত্তি করে।
প্রতিবেদনে আরও বলা হয়, উল্লিখিত উপদেষ্টারা শুধু দেশে নয়, বিদেশেও নানা কূটকৌশলে যুক্ত ছিলেন। একজন উপদেষ্টা দক্ষিণ এশিয়ার একটি দেশে গিয়ে একদিন নিখোঁজও হয়ে গিয়েছিলেন। বাংলাদেশের মিশন তাকে খুঁজেছে। তখন তার হদিস পাওয়া যায়নি, এমন ঘটনাও প্রতিবেদনে উল্লেখ আছে।
জনমত জরিপের পেছনেও তারা সক্রিয় ছিলেন। অনেক জরিপ ছিল ফরমায়েশি এবং বাস্তবতা বিবর্জিত। টেবিলে বসেই জরিপ তৈরি করার কথাও বলা হয়েছে। দূতাবাসগুলোতে তাদের যাতায়াত ছিল। বিদেশি কূটনীতিকদের তারা বারবার বলেছেন, নির্বাচনে অপ্রত্যাশিত শক্তির উত্থান ঘটতে পারে। জরিপ নাকি তাই বলছে।
প্রতিবেদনে বলা হয়, নির্বাচনের দিনেও তাদের নজর ছিল পছন্দের আসনগুলোর দিকে। কিছু আসনের ফলাফল পর্যালোচনা করলে অবিশ্বাস্য তথ্য পাওয়া যেতে পারে। তবে সন্ধ্যার পর তারা বুঝতে পারেন পরিস্থিতি তাদের নিয়ন্ত্রণের বাইরে চলে যাচ্ছে। নির্বাচন নিয়ে আর কোনো খেলা তাদেরই বিপদ ডেকে আনতে পারে। তাই তারা “প্ল্যান ২” বাস্তবায়ন থেকে বিরত থাকেন, মানবজমিন এমনটাই লিখেছে।
শেষ পর্যন্ত প্রশ্ন থেকেই যায়। মানবজমিনের ভাষ্য অনুযায়ী তিন উপদেষ্টা ক্ষমতা ধরে রাখতে চেয়েছিলেন। নির্বাচন বিলম্বিত করতে চেয়েছিলেন। প্রশাসনকে নিয়ন্ত্রণে রাখতে চেয়েছিলেন। মব সন্ত্রাসকে চাপের হাতিয়ার করতে চেয়েছিলেন। আঞ্চলিক চাপ ও বৈদেশিক চাপের ভেতরে তাদের হিসাব বদলেছে। জনচাপে অনেক পরিকল্পনা ভেস্তে গেছে। কিন্তু “প্ল্যান ২” কী ছিল—সে প্রশ্ন এখনো আলোচনায়।





