উচ্চকক্ষ নিয়ে মূল দ্বন্দ্ব

Date:

spot_img

আল জাজিরা অবলম্বনে মুখপাত্র ডেস্ক

বাংলাদেশের ২০২৬ সালের দ্বাদশ জাতীয় নির্বাচন শুধু সরকার বদলের ঘটনা নয়। এটি একসঙ্গে রাষ্ট্র কাঠামো বদলের প্রশ্নও সামনে এনেছে। কারণ নির্বাচনের দিনই হয়েছে জাতীয় গণভোট। সেই গণভোটে জুলাই জাতীয় সনদের (July National Charter) সাংবিধানিক সংস্কার প্রস্তাব অনুমোদন পেয়েছে। ভোটের হিসাবে ‘হ্যাঁ’ এসেছে স্পষ্ট সংখ্যাগরিষ্ঠতায়। আর এই ‘হ্যাঁ’-র রায়ের পরই রাজনীতির নতুন উত্তেজনা তৈরি হয়েছে। বিএনপি বনাম জামায়াত ফাটলটা এবার প্রকাশ্য।

কী ছিল গণভোটের মূল কথা

জুলাই সনদে আছে রাষ্ট্র পরিচালনার বড় সংস্কার পরিকল্পনা। প্রধানমন্ত্রীর মেয়াদসীমা। নারীর রাজনৈতিক প্রতিনিধিত্ব বৃদ্ধি। বিচার বিভাগের স্বাধীনতা ও মৌলিক অধিকার শক্ত করা। রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা বাড়ানোর প্রস্তাব। আর আছে সবচেয়ে আলোচিত প্রস্তাব—একক কক্ষের সংসদের পাশে ১০০ সদস্যের উচ্চকক্ষ গঠন।

গণভোটে ‘হ্যাঁ’ ভোটের জয় এসেছে। নির্বাচন কমিশনের ঘোষণায় দেখা যায়, প্রায় ৪.৮ কোটির বেশি ভোট পড়েছে ‘হ্যাঁ’-তে। ‘না’ ভোটও কম নয়। টার্নআউট ছিল ৬০ শতাংশের ওপরে। অর্থাৎ সংস্কার প্রশ্নে দেশ ভাগ হয়নি, কিন্তু একমতও নয়।

শপথের মঞ্চেই যে সমস্যা

নতুন সংসদ সদস্যদের শপথ অনুষ্ঠানে দেওয়া হয় দুই ধরনের অঙ্গীকার। প্রথমটি সংবিধান রক্ষার সাধারণ শপথ। দ্বিতীয়টি জুলাই সনদ মানা ও বাস্তবায়নের অঙ্গীকার। এখানেই বিএনপির নতুন এমপিরা দ্বিতীয় শপথ নিতে অস্বীকৃতি জানান। ফলে সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল (Constitution Reform Council) গঠনের প্রক্রিয়া আটকে যায়। কারণ বাস্তবায়ন আদেশ অনুযায়ী, কাউন্সিলে বসতে হলে একই অনুষ্ঠানে সেই সনদ-শপথও নিতে হবে।

জামায়াত ও তাদের মিত্ররা এটিকে দেখছে প্রতিশ্রুতি ভঙ্গের শামিল হিসেবে। আর বিএনপির বক্তব্য ভিন্ন। তাদের যুক্তি কাউন্সিলটি এখনো সাংবিধানিকভাবে স্বীকৃত নয়। সংসদে অনুমোদন না হলে এমন কাউন্সিলে শপথ নেওয়া বৈধ হবে কীভাবে। তারা বলছে, সংসদই আইন করে সংস্কার আনতে পারে। তবে রাজনৈতিকভাবে তারা সনদ বাস্তবায়নের অঙ্গীকারও আবার উচ্চারণ করছে। দ্বন্দ্বটা তাই “কী হবে” নয়। দ্বন্দ্বটা “কীভাবে হবে”।

আসল টানাপোড়েন উচ্চকক্ষ নিয়ে

বিতর্কের কেন্দ্র উচ্চকক্ষ। জুলাই সনদে ইঙ্গিত আছে উচ্চকক্ষ গঠনে আনুপাতিক প্রতিনিধিত্ব (Proportional Representation) ব্যবস্থার কথা। অন্যদিকে বাংলাদেশের প্রচলিত পদ্ধতি ফার্স্ট-পাস্ট-দ্য-পোস্ট (FPTP)। এই ব্যবস্থায় ভোটের হার আর আসন সংখ্যার মধ্যে বড় ফারাক তৈরি হয়। বিএনপি বড় জোট হিসেবে বর্তমান আসন সংখ্যাকে ভিত্তি করে উচ্চকক্ষেও সুবিধাজনক অবস্থান চাইতে পারে। জামায়াত ও নতুন নাগরিক প্ল্যাটফর্মগুলো চায় ভোটের অনুপাতে আসন ভাগ। এখানেই সংঘাতের বীজ।

সংখ্যাগরিষ্ঠতা আছে, কিন্তু চাপও আছে

নির্বাচনে বিএনপি নেতৃত্বাধীন জোটের বড় জয় এসেছে। ৩৫০ সদস্যের সংসদ কাঠামোতে বিএনপি জোট পেয়েছে ২১২টি আসন। জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোট পেয়েছে ৭৭টি আসন। এই সংখ্যাগরিষ্ঠতা বিএনপিকে সংসদে সিদ্ধান্ত নেওয়ার শক্তি দেয়। কিন্তু গণভোটের ‘হ্যাঁ’ রায় তাদের ওপর একটি নৈতিক-রাজনৈতিক বাধ্যবাধকতাও তৈরি করে। সনদ বাস্তবায়ন না করলে তারা নিজেরাই জনরায়ের সঙ্গে সংঘাতে যাবে।

সামনে কী হতে পারে

সনদের বাস্তবায়ন প্রক্রিয়ায় ১৮০ দিনের সময়সীমার কথা বলা হয়েছে। কাজেই সময় নষ্ট হলে চাপ বাড়বে।
প্রথম ধাপ হবে সংবিধান সংস্কার কাউন্সিল গঠন হবে কি না, হলে কীভাবে হবে।
দ্বিতীয় ধাপ উচ্চকক্ষের নির্বাচনী পদ্ধতি নিয়ে সমঝোতা।
তৃতীয় ধাপ সংসদীয় পদ্ধতি, বিচার বিভাগ, মৌলিক অধিকার, রাষ্ট্রপতির ক্ষমতা। এসবের সংস্কার কোনটা আগে, কোনটা পরে।

এখানেই বড় আশঙ্কা। নির্বাচন-পরবর্তী রাজনীতির প্রথম বড় বিস্ফোরণ যদি কাউন্সিল ও উচ্চকক্ষ প্রশ্নে ঘটে, তাহলে সরকার-সংসদ শুরু থেকেই টানাপোড়েনে ঢুকে পড়বে। মাঠের উত্তাপও বাড়তে পারে। রাজনৈতিক সংকেতগুলো তাই এখনই শান্ত করার দরকার।

শেষ কথা

এই মুহূর্তে দেশের সামনে দুটি রায়। একটি ব্যালট বাক্সের রায়। আরেকটি সংসদের বাস্তবতার রায়। দুটির মাঝখানে সেতু বানানোই রাজনীতির কাজ।
সনদকে “চাপিয়ে দেওয়া” ঠিক নয়। আবার জনসমর্থিত সংস্কারকে “ঝুলিয়ে রাখা”ও ঠিক নয়।
আইনি কাঠামো দরকার। রাজনৈতিক সদিচ্ছা দরকার। আলোচনার টেবিল দরকার।
কারণ গণভোট দেশকে সংস্কারের পথে হাঁটতে বলেছে। কিন্তু সেই হাঁটাটা যেন দলীয় কৌশলের খোঁড়া গর্তে পড়ে না যায়।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...