
নিজস্ব প্রতিবেদক
ছাত্র আন্দোলন থেকে উঠে আসা নতুন দল ন্যাশনাল সিটিজেন পার্টি (এনসিপি) এবার জাতীয় নির্বাচনে নামছে জামায়াতে ইসলামীর নেতৃত্বাধীন জোটের অংশ হয়ে। দলের প্রধান নাহিদ ইসলাম বলছেন, এটি আদর্শগত নয়, “নির্বাচনী জোট”। কিন্তু এই সিদ্ধান্ত নিয়ে দল ও সমাজে মিশ্র প্রতিক্রিয়া দেখা দিয়েছে।

নাহিদ ইসলাম প্রথম আলোচনায় আসেন ২০২৪ সালের গণআন্দোলনে। ৩ আগস্ট ঢাকার শহীদ মিনারে তিনি “হাসিনা যেতে হবে” স্লোগানে নেতৃত্ব দেন। চাকরির কোটা ইস্যুতে শুরু হওয়া আন্দোলন দ্রুত দেশজুড়ে ছড়িয়ে পড়ে। সহিংস দমননীতি আন্দোলনকে আরও বড় করে তোলে। শেষ পর্যন্ত শেখ হাসিনার সরকার পতনের পথ তৈরি হয়। পরে নোবেলজয়ী মুহাম্মদ ইউনূসের অন্তর্বর্তী সরকারের উপদেষ্টা হিসেবেও তিনি কিছুদিন ছিলেন।
এবার ১২ ফেব্রুয়ারির নির্বাচনে নাহিদের বয়স ২৭। সংবিধান অনুযায়ী প্রার্থী হওয়ার ন্যূনতম বয়স ২৫। তিনি ঢাকার ১১ আসন থেকে প্রার্থী। এলাকাটি আগে আওয়ামী লীগের শক্ত ঘাঁটি হিসেবে পরিচিত ছিল। প্রতিদ্বন্দ্বী হিসেবে মাঠে রয়েছেন বিএনপির প্রভাবশালী নেতা এম এ কাইয়ুম।
এনসিপি দাবি করছে, তারা “নতুন রাজনৈতিক বন্দোবস্ত” চায়। পুরোনো দ্বিদলীয় মেরুকরণের বাইরে “কেন্দ্রপন্থী বিকল্প” হতে চায় দলটি। কিন্তু জোটের কেন্দ্রবিন্দুতে রয়েছে জামায়াত। ১৯৭১ সালে স্বাধীনতার বিরোধিতার স্মৃতি এবং নারী ও সংখ্যালঘু অধিকার নিয়ে জামায়াতের অবস্থান বহু মানুষের উদ্বেগ বাড়িয়েছে। এই জোট গঠনের সময় এনসিপির উদারপন্থী অংশের অনেক নেতা, এমনকি নারী নেত্রীদের একটি অংশ দল ছেড়ে চলে গেছেন বলে প্রতিবেদনে উল্লেখ করা হয়েছে। তাদের অভিযোগ, দলটি প্রতিষ্ঠাকালীন অঙ্গীকার থেকে সরে যাচ্ছে।
নাহিদ ইসলামের যুক্তি ভিন্ন। তিনি বলছেন, দুর্নীতি দমন, সুশাসন, সংস্কার, সার্বভৌমত্ব রক্ষা এবং আধিপত্য বিরোধিতার মতো কয়েকটি বিষয়ে জামায়াতের সঙ্গে মিল আছে। তার ভাষায়, “এটা ইলেক্টোরাল অ্যালায়েন্স, আদর্শগত নয়।”
আসন বণ্টনের হিসাবে এনসিপি জোটে পাচ্ছে ৩০টি আসন। জামায়াত পাচ্ছে ২২২টি। বাকি আসন ভাগ হয়েছে আরও নয়টি অংশীদারের মধ্যে। নির্বাচন শুধু সংসদ গঠনের নয়। একই সঙ্গে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় শুরু হওয়া একটি সংস্কার প্যাকেজ নিয়ে জাতীয় গণভোটও হবে।
জরিপগুলোতে হাড্ডাহাড্ডি লড়াইয়ের ইঙ্গিত আছে। একাধিক জরিপে বিএনপি এবং জামায়াত নেতৃত্বাধীন জোটকে কাছাকাছি অবস্থানে দেখা গেছে। এনসিপির জাতীয় সমর্থন তুলনামূলক কম হলেও বিশ্লেষকেরা বলছেন, কৌশলগতভাবে এই ছোট দলটি গুরুত্বপূর্ণ হয়ে উঠতে পারে। কারণ, তারা দোদুল্যমান ও উদার ভোটারদের কাছে জোটকে গ্রহণযোগ্য করে তুলতে পারে। আবার নির্বাচন-পরবর্তী সংস্কার আলোচনা ও দরকষাকষিতেও প্রভাব ফেলতে পারে।
ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের শিক্ষক ও রাজনৈতিক বিশ্লেষকদের মতে, নাহিদের দুটি বড় শক্তি আছে। তিনি জুলাই আন্দোলনের মুখ। আর জামায়াতের মাঠপর্যায়ের সংগঠন ও কর্মীবাহিনী তার প্রচারণায় বড় ভূমিকা রাখছে। তবে সমালোচকেরা বলছেন, এতে এনসিপি আসলে জামায়াতের ওপর নির্ভরশীল হয়ে পড়ছে। তাদের আশঙ্কা, জিতলে এনসিপি “সহজে বিচ্ছিন্ন” হতে পারবে না। হারলেও দলটির পরিচয় সংকট আরও গভীর হতে পারে।
নারী নেতৃত্ব নিয়ে জামায়াতের সাম্প্রতিক বক্তব্য নতুন বিতর্ক তৈরি করেছে। এনসিপি বলছে, এটি জামায়াতের দলীয় অবস্থান, জোটের নয়। নাহিদ ইসলাম দাবি করেন, এনসিপিতে নারীদের শীর্ষে ওঠার সুযোগ তুলনামূলক বেশি। তবে সমালোচকেরা মনে করিয়ে দেন, এনসিপি ৩০ প্রার্থীর মধ্যে মাত্র দুইজন নারীকে মনোনয়ন দিয়েছে। জামায়াত নারী প্রার্থী দেয়নি। বিএনপিও সীমিত সংখ্যক নারী প্রার্থী দিয়েছে। ফলে নারীর প্রতিনিধিত্ব প্রশ্নটি জোটের জন্য অস্বস্তির জায়গা হয়ে থাকছে।
এনসিপি এই সপ্তাহে আলাদা ৩৬ দফা ইশতেহার প্রকাশ করেছে। দলের সমর্থকদের একটি অংশ বলছে, সংসদে এনসিপির উপস্থিতি থাকলে সেটিই জামায়াতকে “চাপে রাখার” শক্তি হতে পারে। আবার অন্যপক্ষ বলছে, সংখ্যা কম হলে সেই সক্ষমতা কার্যত থাকবে না।
নাহিদ ইসলামের বক্তব্যে দুটি বিষয় বারবার উঠে আসছে। একটি ভারতনীতি। তিনি বলছেন, সীমান্ত হত্যা, পানি বিরোধ, রাজনৈতিক হস্তক্ষেপ। এসব ইস্যুতে জাতীয় মর্যাদা ও স্বার্থ ভিত্তিক সম্পর্ক চান তিনি। অন্যটি আওয়ামী লীগ প্রসঙ্গ। দলটি নির্বাচনে নিষিদ্ধ। নাহিদ ইসলাম বলেছেন, আওয়ামী লীগের রাজনীতি করার অধিকার নেই, তবে তাদের সমর্থকদের নাগরিক অধিকার ও পুনর্মিলনের কথা তিনি উল্লেখ করেছেন।
এই নির্বাচনের ফল নাহিদ ইসলামের রাজনৈতিক ভবিষ্যৎও নির্ধারণ করতে পারে। বিশ্লেষকদের মতে, আন্দোলনের জনপ্রিয়তা ভোটে রূপ নিতে না পারলে দলের ভেতরে চাপ বাড়তে পারে। আবার ভালো ফল হলে তিনি তরুণ নেতৃত্বের নতুন অধ্যায় খুলে দিতে পারেন। নাহিদ নিজে বলেছেন, ১০ বছরের মধ্যে এনসিপি সরকার গঠনের সক্ষমতা না পেলে তিনি রাজনীতি ছাড়বেন।
এবারের ভোট তাই শুধু ক্ষমতার হিসাব নয়। এটি একটি আন্দোলন-জন্ম দলগুলোর টিকে থাকা, সংস্কার রাজনীতি, এবং বাংলাদেশে “পুরোনো বনাম নতুন” সমীকরণের বড় পরীক্ষা।





