
হবিগঞ্জ প্রতিনিধি
সনাতন ধর্মাবলম্বীদের অন্যতম প্রধান ধর্মীয় শারদীয় দুর্গাপূজা উপলক্ষ্যে হবিগঞ্জের বাহুবল উপজেলা জুড়ে চলছে প্রতিমা তৈরির কাজ। দেবী দুর্গার সঙ্গে ভগবান শিব, কার্তিক, গণেশ, লক্ষ্মী, সরস্বতী প্রতিমা, মহিষাসুরের মূর্তিসহ তাদের নিজ নিজ বাহন নির্মাণ কাজে ব্যস্ত সময় পার করছে মৃৎশিল্পীরা। এবছর উপজেলায় ৫৫টি মণ্ডপে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হবে।
দুর্গাপূজা বাঙালি হিন্দু সম্প্রদায়ের সবচেয়ে বড় ধর্মীয় ও সাংস্কৃতিক উৎসবগুলোর একটি। প্রতিবছর শরৎকালে দেবী দুর্গার পূজাকে কেন্দ্র করে মন্দির, পূজামণ্ডপ, পাড়া-মহল্লা এবং বিভিন্ন সামাজিক প্রতিষ্ঠানে উৎসবের আমেজ তৈরি হয়। ২০২৬ সালের দুর্গাপূজা শনিবারের মহালয়ার মধ্য দিয়ে শুরু হয়েছে। ১৬ অক্টোবর মহাষষ্ঠী ও ২১ অক্টোবর বিজয়া দশমীর প্রতিমা বিসর্জনের মাধ্যমে শেষ হবে।
দেবী দুর্গাকে শক্তি, সাহস, ন্যায় ও অশুভের বিরুদ্ধে শুভশক্তির প্রতীক হিসেবে মানা হয়। পৌরাণিক কাহিনি অনুযায়ী, মহিষাসুরের অত্যাচার থেকে দেবতা ও মানবজাতিকে রক্ষা করার জন্য দেবী দুর্গার আবির্ভাব ঘটে। দশভুজা দেবী দুর্গা বিভিন্ন দেবতার কাছ থেকে পাওয়া অস্ত্র ধারণ করে মহিষাসুরকে বধ করেন। তাই দুর্গাপূজা মূলত অন্যায়, অশুভ ও অহংকারের ওপর ন্যায়, শুভ ও সত্যের বিজয়ের প্রতীক।
দুর্গাপূজা শুধু ধর্মীয় আচার নয়; এটি বাঙালি সংস্কৃতি, শিল্প, সংগীত ও সামাজিক সম্প্রীতির একটি বড় উৎসব। পূজামণ্ডপ সাজানো, প্রতিমা নির্মাণ, আলোকসজ্জা, ঢাকের বাদ্য, ধুনুচি নাচ, সাংস্কৃতিক অনুষ্ঠান এবং প্রসাদ বিতরণ উৎসবের গুরুত্বপূর্ণ অংশ। এই উৎসবকে ঘিরে কুমারশিল্পী, ঢাকি, মৃৎশিল্পী, আলোকসজ্জাকারী, ফুল ব্যবসায়ী, পোশাক বিক্রেতা ও ক্ষুদ্র উদ্যোক্তাদের অর্থনৈতিক কার্যক্রম বৃদ্ধি পায়। বিভিন্ন ধর্ম ও সম্প্রদায়ের মানুষ একসঙ্গে পূজামণ্ডপ পরিদর্শন করেন, যা সামাজিক সম্প্রীতির একটি উদাহরণ।
বাহুবল উপজেলার ৭টি ইউনিয়নে পূজামণ্ডপের ৫৫টি রয়েছে ।
মৃৎশিল্পী বাপ্পা বিশ্বাস, বাবু পাল জানান, প্রতি বছরের মতো এবারও বেশ কিছু অর্ডার পেয়েছি। তবে কাঁচামালের দাম বেড়ে যাওয়ায় কিছুটা চাপ রয়েছে। তবুও এই শিল্পের সঙ্গে আমাদের পূর্বপুরুষদের যে ঐতিহ্য জড়িত, সেটা ধরে রাখার চেষ্টা করছি।
আরেক মৃৎশিল্পী মণোরঞ্জন পাল, বলেন, প্রতিমা তৈরির কাজ অনেক ধৈর্য ও নিপুণতার। বিশেষ করে মুখ তৈরি করা সবচেয়ে চ্যালেঞ্জিং। সময় মতো কাজ শেষ করতে অনেক সময় রাতেও কাজ করতে হয়। প্রতিমা নির্মাণের কাজ প্রায় শেষের পথে। পূজার শুরুর আগেই প্রতিমার গায়ে রং-তুলির কাজ শেষ করা হবে।
বাংলাদেশ পূজা উদযাপন পরিষদ, হিন্দু বৌদ্ধ খ্রিস্টান ঐক্য পরিষদ, হিন্দু পরিষদ, হিন্দু মহাজোট সহ হিন্দু কল্যাণ ট্রাস্টের বাহুবল উপজেলা শাখার নেতারা বলেন, এ বছর উপজেলায় মোট ৫৫টি মণ্ডপে শারদীয় দুর্গাপূজার প্রস্তুতি চলছে। আইনশৃঙ্খলা বাহিনী আমাদের নিরাপত্তার বিষয়ে আশ্বস্ত করেছেন। এছাড়াও প্রতিটি মন্দিরে সিসি ক্যামেরা স্থাপন সহ সার্বক্ষণিক সেচ্ছাসেবকরা নিয়োজিত থাকবেন।
এ বিষয়ে বাহুবল মডেল থানার অফিসার ইনচার্জ মোঃ রুহুল আমিন তালুকদার বলেন, বাহুবল উপজেলায় এবারে ৫৫টি পূজা মন্ডপে দুর্গা পূজা অনুষ্ঠিত হবে। প্রতিটি মন্ডপে নিরাপত্তা নিশ্চিত করতে পুলিশ, আনসার, ভলেন্টিয়ার বাহিনী মোতায়েন থাকবে। পাশাপাশি প্রতিটি পূজা মন্ডপে সিসি ক্যামেরা, মাইকিং ও নিয়মিত টহলের ব্যবস্থা রাখা হবে।
এ ব্যাপারে বাহুবল উপজেলা নির্বাহী অফিসার (ইউএনও) উজ্জ্বল রায় বলেন, এবারে শারদীয় দুর্গা পূজায় নিশ্চিদ্র নিরাপত্তা নিশ্চিত করাসহ সব ধরনের অপতৎপরতা ঠেকাতে প্রশাসনের পক্ষ থেকে সব ধরনের সহযোগিতা প্রদান করা হবে এবং পূজা চলাকালীন বিদ্যুৎ ও যানবাহন চলাচল স্বাভাবিক রাখার ওপর গুরুত্ব দেওয়া হবে। এছাড়াও অপ্রতিকর পরিস্থিতি এড়াতে তিনি সকলকে সতর্ক থাকার আহ্বান জানান।
স্থানীয় হিন্দু সম্প্রদায়ের মধ্যে উৎসবের আমেজ ইতোমধ্যে শুরু হয়ে গেছে। মণ্ডপ সাজানো, আলোকসজ্জা ও সাংস্কৃতিক আয়োজন নিয়েও চলছে জোর প্রস্তুতি। উপজেলা জুড়ে উৎসবের আবহে ব্যস্ততা যেমন বেড়েছে, তেমনি দীর্ঘদিন ধরে টিকে থাকা মৃৎশিল্পীদের ঐতিহ্যও নতুন করে প্রাণ পাচ্ছে এই দুর্গাপূজার মধ্য দিয়ে।
পঞ্জিকা মতে, মহাষষ্ঠী: ১৬ই অক্টোবর ২০২৬ শুক্রবার, মহাসপ্তমী: ১৭ই ও ১৮ই অক্টোবর ২০২৬ শনিবার ও রবিবার, মহাষ্টমী: ১৯ই অক্টোবর ২০২৬ সোমবার, মহানবমী: ২০শে অক্টোবর ২০২৬ মঙ্গলবার, বিজয়া দশমী: ২১শে অক্টোবর ২০২৬ বুধবার।
মহালয়া দেবীপক্ষের সূচনাদিন হিসেবে পরিচিত। এই দিনে অনেক মানুষ পূর্বপুরুষদের উদ্দেশে তর্পণ করেন এবং ভোরে দেবী দুর্গার আগমনী গান ও স্তোত্র শোনেন। মহালয়ার পর থেকেই দুর্গাপূজার প্রস্তুতি আনুষ্ঠানিকভাবে আরও জোরদার হয়।
মহাষষ্ঠীর দিন দেবীর বোধন, আমন্ত্রণ ও অধিবাসের মাধ্যমে পূজার মূল আনুষ্ঠানিকতা শুরু হয়। মহাসপ্তমীর অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ আচার হলো নবপত্রিকা স্নান ও প্রতিষ্ঠা। কলাগাছসহ নয়টি উদ্ভিদকে একত্র করে নবপত্রিকা তৈরি করা হয়, যা লোকাচারে ‘কলাবউ’ নামে পরিচিত। এরপর দেবী দুর্গার পূজা, অঞ্জলি, প্রসাদ বিতরণ ও সন্ধ্যারতি অনুষ্ঠিত হয়। মহাষ্টমী দুর্গাপূজার সবচেয়ে গুরুত্বপূর্ণ দিনগুলোর একটি। এদিন ভক্তরা অঞ্জলি দেন, উপবাস পালন করেন এবং দেবীর কাছে শান্তি, সুস্বাস্থ্য ও মঙ্গল কামনা করেন। অনেক পূজামণ্ডপে কুমারী পূজার আয়োজন করা হয়।
মহানবমীতে দেবী দুর্গার বিশেষ পূজা, হোম ও আরতি অনুষ্ঠিত হয়। বিজয়া দশমীর দিন দেবী দুর্গাকে বিদায় জানানো হয়। পূজার পর প্রতিমা বিসর্জনের আগে সিঁদুর খেলা, ধুনুচি নাচ, বিজয়ার প্রণাম ও মিষ্টিমুখের আয়োজন করা হয়।





