রাজশাহীতে বৃত্তি পরীক্ষার ফল পুনর্মূল্যায়নের দাবিতে ফের বিশাল মানববন্ধন, ৭ দফা দাবি পেশ

Date:

spot_img

রাজশাহী ব্যুরো

​প্রাথমিক বৃত্তি পরীক্ষার ফলাফলের চরম অসঙ্গতি দূরীকরণ ও দ্রুত সঠিক ফল প্রকাশের দাবিতে রাজশাহী জেলা প্রশাসক ও বিভাগীয় শিক্ষা কর্মকর্তার কাছে (১৬ জুলাই) স্মারকলিপি দেওয়ার এক সপ্তাহ পার হলেও দৃশ্যমান কোনো সমাধান না পাওয়ায় আবার আন্দোলনে নেমেছেন সংক্ষুব্ধ শিক্ষক, শিক্ষার্থী ও অভিভাবকরা। পূর্বনির্ধারিত আলটিমেটাম অনুযায়ী কোনো অগ্রগতি না হওয়ায় আজ বৃহস্পতিবার (২৩ জুলাই) সকাল ১১টায় বিভাগীয় প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের সামনে তারা দ্বিতীয় দফায় এই মানববন্ধন ও বিক্ষোভ কর্মসূচি পালন করেন।

​এর আগে প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরের মহাপরিচালক বরাবর স্মারকলিপিটি রাজশাহী জেলা প্রশাসক এবং জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ. কে. এম. আনোয়ার হোসেনের কাছে জমা দেওয়া হয়েছিল। তবে এক সপ্তাহ ধরে কোনো প্রতিকার না পাওয়ায় শিক্ষানগরী রাজশাহীর অভিভাবক ও শিক্ষার্থীদের মাঝে চরম ক্ষোভের সৃষ্টি হয়েছে।

​কেন্দ্রজুড়ে ‘ডিজিটাল গায়েব’: ২৩৯ পরীক্ষার্থীর কেউই পায়নি বৃত্তি!

​অভিযোগের মূল কেন্দ্রবিন্দু রাজশাহী উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয় কেন্দ্র। শহরের ১১টি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের মোট ২৩৯ জন শিক্ষার্থী এই কেন্দ্রে পরীক্ষা অংশ নেয়। তবে সম্প্রতি ঘোষিত ফলাফলে দেখা যায়, ওই কেন্দ্র থেকে একজন শিক্ষার্থীও বৃত্তি পায়নি।

​শিক্ষকদের মতে, এটি কোনো সাধারণ ঘটনা নয়; বরং পুরো কেন্দ্রের ফল ডিজিটাল প্রক্রিয়ায় বাদ পড়া বা ওএমআর মূল্যায়নে বড় ধরনের কারিগরি বিপর্যয়ের স্পষ্ট লক্ষণ।

​বিদ্যালয়ের প্রধান শিক্ষক আমিনুর রহমানের ক্ষোভ: “১১টি স্কুলের ২৩৯ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে একজনও বৃত্তি পাবে না—এটা বাস্তবসম্মত নয়। (১৬ জুলাই) এক সপ্তাহ আগে বিষয়টি জানানো হলেও এখন পর্যন্ত সুনির্দিষ্ট কোনো ব্যাখ্যা দেওয়া হয়নি।”

​সহকারী শিক্ষক ফারহানা খাতুন বলেন: “আমাদের এবার অন্যতম সেরা একটি ব্যাচ ছিল। একজন শিশুও বৃত্তি না পাওয়া প্রমাণ করে যে প্রক্রিয়াজাতকরণে বড় ধরনের প্রশাসনিক ভুল হয়েছে।”
​”পরীক্ষা ভালো দিয়েও কেন ঝুলন্ত ভাগ্য?” — প্রশ্ন শিক্ষার্থীদের
​মানববন্ধনে বক্তব্য রাখার সময় কান্নাভেজা কণ্ঠে উপশহর মডেল সরকারি প্রাথমিক বিদ্যালয়ের শিক্ষার্থী মেহেজাবিন বর্ণ বলে, “আমি অনেক ভালো পরীক্ষা দিয়েছি। এক সপ্তাহ পার হয়ে গেল, কিন্তু আমাদের খাতা পুনর্মূল্যায়ন করা হচ্ছে না। খাতা সঠিকভাবে দেখা হলে আমি অবশ্যই বৃত্তি পাব। আমরা দ্রুত এর সঠিক বিচার চাই।”

​অভিভাবকদের পক্ষে ড. আজিবর রহমান লিখিত বক্তব্য উপস্থাপন করে বলেন, “এক সপ্তাহ আগে স্মারকলিপি দিয়ে আমরা সুরাহার অপেক্ষায় ছিলাম। কোনো ইতিবাচক পদক্ষেপ না থাকায় আমরা আবারও রাজপথে নামতে বাধ্য হয়েছি। ফলাফলের অসঙ্গতি কোমলমতি শিক্ষার্থীদের মানসিক স্বাস্থ্য বিপর্যস্ত করছে এবং শিক্ষা ব্যবস্থার প্রতি আস্থাহীনতা বাড়াচ্ছে।”

​সংক্ষুব্ধদের উত্থাপিত ৭ দফা দাবি:
​১. স্মারকলিপি বাস্তবায়নে কালক্ষেপণ বন্ধ করে অবিলম্বে ফলাফলের অনিয়ম নিরপেক্ষভাবে তদন্ত করা।
২. দ্রুততম সময়ে খাতা পুনর্মূল্যায়নের মাধ্যমে ত্রুটিমুক্ত সংশোধিত ফলাফল প্রকাশ করা।
৩. ওএমআর বা প্রশাসনিক ভুলের কারণে ক্ষতিগ্রস্ত সব শিক্ষার্থীর প্রাপ্য অধিকার নিশ্চিত করা।
৪. ভবিষ্যতে ফল তৈরিতে আধুনিক, স্বচ্ছ ও ভুলমুক্ত অটোমেশন ব্যবস্থা নিশ্চিত করা।
৫. তদন্তের অগ্রগতি ও গৃহীত ব্যবস্থা সম্পর্কে শিক্ষক-অভিভাবকদের নিয়মিত অবহিত রাখা।
৬. ফলাফল প্রক্রিয়াজাতকরণে চরম গাফিলতির জন্য দায়ীদের চিহ্নিত করে কঠোর আইনি ব্যবস্থা নেওয়া।
৭. আগামী পাঁচ কর্মদিবসের মধ্যে ত্রুটিমুক্ত চূড়ান্ত ফলাফল প্রকাশ করা।

​
রাজশাহী প্রেস ক্লাবের সাধারণ সম্পাদক মোঃ গোলাম মোস্তফা মামুন। তিনি সরকারের দায়িত্বশীলদের প্রতি হুঁশিয়ারি উচ্চারণ করে বলেন, “এক সপ্তাহ পার হলেও কেন প্রাথমিক শিক্ষা দপ্তর চুপ করে আছে? কোমলমতি শিশুদের ভবিষ্যৎ নিয়ে ছিনিমিনি খেলা বন্ধ না হলে রাজশাহীবাসীকে সাথে নিয়ে আরও কঠোর কর্মসূচি দিতে বাধ্য হব।”

​”কর্মসূচিতে পূর্ণ সংহতি প্রকাশ করে বক্তব্য রাখেন স্বার্থ সংরক্ষণ কমিটির সাধারণ সম্পাদক মোঃ মাহফুজুল হাসনাইন হিকোল।
​মানববন্ধনে উপস্থিত থেকে তীব্র প্রতিবাদ ও ক্ষোভ প্রকাশ করে তিনি বলেন, ‘আমাদের এই কোমলমতি শিশুরা আগামীর ভবিষ্যৎ। তাদেরকে যদি এভাবে দমন করা হয়, তবে কীভাবে আমাদের ভবিষ্যৎ সুন্দর হবে?
​শিক্ষা অফিসের বক্তব্য
​জেলা প্রাথমিক শিক্ষা অফিসের তথ্য অনুযায়ী, রাজশাহীতে মোট ১৩ হাজার ১৫ জন পরীক্ষার্থীর মধ্যে ১০ হাজার ৮৩ জন অংশগ্রহণ করে এবং ১ হাজার ৯০৯ জন বৃত্তি পায়।

​দীর্ঘ এক সপ্তাহ পরও সমাধান না হওয়া প্রসঙ্গে জেলা প্রাথমিক শিক্ষা কর্মকর্তা এ. কে. এম. আনোয়ার হোসেন জানান, “অভিভাবকদের লিখিত আবেদন ও স্মারকলিপি আমরা প্রাথমিক শিক্ষা অধিদপ্তরে পাঠিয়েছি। যেহেতু এ বছর প্রথমবার ওএমআর (OMR) পদ্ধতিতে কম্পিউটার চালিত মূল্যায়ন হয়েছে, তাই সফটওয়্যার বা কারিগরি কোনো সমস্যা হয়ে থাকতে পারে। এতগুলো শিক্ষার্থীর খাতা হারানোর সুযোগ নেই। বিষয়টি গুরুত্বের সাথেই দেখা হচ্ছে এবং দ্রুত সমাধানের জন্য মহাপরিচালক কার্যালয়ের সাথে যোগাযোগ রাখা হচ্ছে।”

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...