‎রংপুরে ডিসিসহ নেসকোর ৬ কর্মকর্তার বিরুদ্ধে মামলা

Date:

spot_img

আঃ রাজ্জাক (রিয়াদ), ‎রংপুর ব্যুরো

‎সরকারি নির্দেশনা উপেক্ষা করে সচল পোস্টপেইড বিদ্যুৎ মিটার খুলে জোরপূর্বক প্রিপেইড মিটার স্থাপন, অতিরিক্ত অর্থ আদায় এবং গ্রাহকদের বিভিন্নভাবে হয়রানির অভিযোগে রংপুরের জেলা প্রশাসক (ডিসি) এবং নর্দান ইলেকট্রিসিটি সাপ্লাই কোম্পানি (নেসকো)-এর পাঁচ ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তার বিরুদ্ধে আদালতে মামলা করেছেন ১৫ জন ভুক্তভোগী গ্রাহক।

বুধবার (২২ জুলাই) দুপুরে রংপুর সদর সিনিয়র সহকারী জজ আদালতের বিচারক আবু বক্কর সিদ্দীকের আদালতে মামলাটি দায়ের করা হয়। আদালত মামলাটি গ্রহণ করে আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর শুনানির দিন ধার্য করেছেন।

‎বাদীপক্ষের আইনজীবী অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বিষয়টি নিশ্চিত করে জানান, মামলায় প্রিপেইড মিটার স্থাপনের চলমান কার্যক্রম স্থগিত, জোরপূর্বক পোস্টপেইড মিটার অপসারণে নিষেধাজ্ঞা, সরকারি নির্দেশনা অনুসারে কার্যক্রম পরিচালনা এবং মামলার চূড়ান্ত নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ চাওয়া হয়েছে।

‎### মামলার আসামিরা

‎মামলায় আসামি করা হয়েছে নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী (অপারেশন) মো. আশরাফুল ইসলাম মণ্ডল, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিচালন ও সংরক্ষণ-১) মো. মোসাদ্দেক কবির, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (পরিচালন ও সংরক্ষণ-২) মো. শরিফুল ইসলাম, তত্ত্বাবধায়ক প্রকৌশলী (এনার্জি এফিসিয়েন্সি অ্যান্ড মিটারিং) মো. মোশারফুজ্জামান ভূঁইয়, নেসকো রংপুরের ব্যবস্থাপক (হিসাব) মোছা. কানিজ ফাতেমা এবং রংপুরের জেলা প্রশাসককে। তবে মামলায় জেলা প্রশাসকের ব্যক্তিগত নাম উল্লেখ করা হয়নি, কেবল পদবি উল্লেখ করা হয়েছে।

‎## অভিযোগের বিস্তারিত

‎মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে, সরকার পূর্বেই নির্দেশনা দিয়েছে যে শুধুমাত্র নতুন বিদ্যুৎ সংযোগ অথবা নষ্ট হয়ে যাওয়া মিটার প্রতিস্থাপনের ক্ষেত্রেই প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা যাবে। কিন্তু বাস্তবে নেসকো সেই নির্দেশনা উপেক্ষা করে সচল পোস্টপেইড মিটার খুলে গ্রাহকদের ইচ্ছার বিরুদ্ধে প্রিপেইড মিটার স্থাপন করছে। বাদীদের দাবি, এতে সাধারণ গ্রাহকদের ওপর অতিরিক্ত আর্থিক চাপ সৃষ্টি হয়েছে। প্রিপেইড মিটার ব্যবহারের ফলে প্রতি মাসে মিটার ভাড়া, ডিমান্ড চার্জ, রিচার্জের ওপর ৫ শতাংশ ভ্যাট, মোবাইল ব্যাংকিং কমিশনসহ বিভিন্ন খাতে অতিরিক্ত অর্থ পরিশোধ করতে হচ্ছে। এছাড়া মিটার লক হয়ে গেলে সেটি পুনরায় সচল করার জন্য গ্রাহকদের কাছ থেকে ৬০০ টাকা পর্যন্ত আদায়ের অভিযোগও মামলায় উল্লেখ করা হয়েছে।

‎## “প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নই, জোরপূর্বক বাস্তবায়নের বিরুদ্ধে”

‎বাদীপক্ষের অন্যতম সমন্বয়কারী আব্দুল জব্বার বলেন, “আমাদের আপত্তি প্রিপেইড প্রযুক্তির বিরুদ্ধে নয়। আমরা আপত্তি করছি জোরপূর্বক বাস্তবায়ন, অতিরিক্ত চার্জ আদায় এবং সরকারি নির্দেশনা অমান্য করার বিরুদ্ধে। তিনি আরও বলেন, সরকার স্পষ্টভাবে নির্দেশনা দেওয়ার পরও সচল পোস্টপেইড মিটার খুলে প্রিপেইড মিটার বসানো হচ্ছে, যা সাধারণ গ্রাহকদের আর্থিক ক্ষতির পাশাপাশি মানসিক ভোগান্তিরও কারণ হয়ে দাঁড়িয়েছে। তার ভাষ্য, আদালতের মাধ্যমে তারা এই কার্যক্রম বন্ধ এবং গ্রাহকদের অধিকার সংরক্ষণের প্রত্যাশা করছেন।

‎## আদালতের কাছে যেসব আদেশ চাওয়া হয়েছে

‎বাদীপক্ষ আদালতের কাছে কয়েকটি গুরুত্বপূর্ণ আদেশ চেয়েছে। এর মধ্যে রয়েছে, জোরপূর্বক প্রিপেইড মিটার স্থাপন কার্যক্রম বন্ধ করা। সচল পোস্টপেইড মিটার অপসারণে নিষেধাজ্ঞা দেওয়া।সরকারি নির্দেশনা অনুযায়ী বিদ্যুৎ বিতরণ কার্যক্রম পরিচালনার নির্দেশ দেওয়া। মামলার নিষ্পত্তি না হওয়া পর্যন্ত অন্তর্বর্তীকালীন আদেশ জারি করা।

‎আইনজীবী অ্যাডভোকেট পলাশ কান্তি নাগ বলেন, “এই মামলার মূল উদ্দেশ্য হলো গ্রাহকদের আইনগত অধিকার নিশ্চিত করা এবং সরকারি নির্দেশনা যথাযথভাবে বাস্তবায়ন নিশ্চিত করা।”

‎## নেসকোর প্রতিক্রিয়া

‎অভিযোগের বিষয়ে নেসকোর প্রধান প্রকৌশলী মো. আশরাফুল ইসলাম মণ্ডল বলেন, “মামলার বিষয়ে এখনো কিছু জানি না। আদালতে মামলা হয়ে থাকলে আইন অনুযায়ী আমরা বিষয়টি মোকাবেলা করব। তিনি এ বিষয়ে এর বেশি কোনো মন্তব্য করতে রাজি হননি।

‎## রংপুরের প্রেক্ষাপট

‎গত কয়েক মাস ধরেই রংপুরে প্রিপেইড বিদ্যুৎ মিটার স্থাপনকে কেন্দ্র করে ব্যাপক অসন্তোষ দেখা দিয়েছে। বিভিন্ন সময় গ্রাহকরা মানববন্ধন, বিক্ষোভ, স্মারকলিপি প্রদান এবং গণস্বাক্ষর কর্মসূচি পালন করেছেন। তাদের অভিযোগ, জোরপূর্বক মিটার পরিবর্তনের পাশাপাশি নতুন ব্যবস্থায় বিদ্যুৎ ব্যবহারের খরচ বেড়েছে এবং অতিরিক্ত চার্জের বোঝা বহন করতে হচ্ছে।অন্যদিকে নেসকোর পক্ষ থেকে বারবার দাবি করা হয়েছে, বিদ্যুৎ ব্যবস্থাপনায় স্বচ্ছতা, বিল বকেয়া কমানো এবং আধুনিক সেবা নিশ্চিত করতেই ধাপে ধাপে প্রিপেইড মিটার স্থাপন করা হচ্ছে।

‎## আইনি লড়াইয়ে নতুন মাত্রা

‎নাগরিকদের আন্দোলন এবার আদালতে গড়ানোয় বিষয়টি নতুন মাত্রা পেয়েছে বলে মনে করছেন সংশ্লিষ্টরা। আদালতের পরবর্তী শুনানিতে কী নির্দেশনা আসে, তা শুধু রংপুর নয়, দেশের অন্যান্য এলাকায় চলমান প্রিপেইড মিটার স্থাপন কার্যক্রমের ক্ষেত্রেও গুরুত্বপূর্ণ দৃষ্টান্ত হয়ে উঠতে পারে বলে আইনজীবী ও সচেতন মহলের অভিমত। আগামী ২৭ সেপ্টেম্বর নির্ধারিত শুনানিতে আদালতের পর্যবেক্ষণ এবং পরবর্তী আদেশের দিকে এখন তাকিয়ে রয়েছেন মামলার বাদীসহ রংপুরের হাজারো বিদ্যুৎ গ্রাহক।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...