
রংপুর ব্যুরো
সমাজকল্যাণ এবং মহিলা ও শিশু বিষয়ক মন্ত্রণালয়ের মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন এমপি বলেছেন, সুষ্ঠু, অংশগ্রহণমূলক ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন ছাড়া নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিদের জনগণের প্রতি প্রকৃত দায়বদ্ধতা গড়ে ওঠে না। দীর্ঘদিন ধরে দেশে গণতান্ত্রিক চর্চার ঘাটতি, প্রশ্নবিদ্ধ নির্বাচন এবং ভোটাধিকার হরণের সংস্কৃতির কারণে জনপ্রতিনিধিদের বড় একটি অংশ জনগণের বদলে প্রশাসনের নির্দিষ্ট মহল ও ক্ষমতাকাঠামোর প্রতি বেশি দায়বদ্ধ হয়ে পড়েছিল। এ পরিস্থিতি থেকে বেরিয়ে এসে জনগণের ভোটাধিকার, জবাবদিহি ও অংশগ্রহণের ভিত্তিতে গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানগুলোকে শক্তিশালী করতে হবে।
শনিবার (৪ জুলাই) রংপুরে একদিনের সফরে এসে বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ে আয়োজিত এক আলোচনা সভা শেষে সাংবাদিকদের সঙ্গে মতবিনিময়কালে তিনি এসব কথা বলেন। এ সময় তিনি নির্বাচনব্যবস্থা, জনপ্রতিনিধিদের জবাবদিহি, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির বাস্তবায়ন এবং সরকারের জনসেবামুখী নানা উদ্যোগ নিয়ে কথা বলেন।
মন্ত্রী বলেন, একটি রাষ্ট্রে গণতন্ত্রের প্রাণশক্তি হলো অবাধ ও গ্রহণযোগ্য নির্বাচন। কিন্তু দেশে এমন এক সময় পার হয়েছে, যখন ভোটারদের অংশগ্রহণ ছাড়াই নির্বাচন সম্পন্ন হয়েছে, রাতের অন্ধকারে ভোট হওয়ার অভিযোগ উঠেছে, কোথাও প্রকৃত প্রতিদ্বন্দ্বিতা ছিল না, কোথাও আবার ডামি প্রার্থী দিয়ে নির্বাচনের পরিবেশ তৈরি করা হয়েছে। ফলে নির্বাচনের মৌলিক উদ্দেশ্য জনগণের মতামতের প্রতিফলন ব্যাহত হয়েছে। আর যখন জনগণের ভোটের ওপর একজন জনপ্রতিনিধির নির্বাচিত হওয়া নির্ভর করে না, তখন জনগণের প্রতি তার দায়বদ্ধতাও দুর্বল হয়ে পড়ে।
তিনি বলেন, “নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জনগণের কাছে জবাবদিহির আওতায় আনতে হলে আগে জনগণের ভোটাধিকার নিশ্চিত করতে হবে। জনগণের অংশগ্রহণ ছাড়া গণতন্ত্র শক্তিশালী হয় না, আর জবাবদিহিহীন জনপ্রতিনিধিত্ব কোনোভাবেই টেকসই উন্নয়ন নিশ্চিত করতে পারে না।”
মন্ত্রী আরও বলেন, অতীতে এমন নির্বাচনী পরিবেশ তৈরি হয়েছিল, যেখানে নির্বাচনের ফল অনেক ক্ষেত্রেই পূর্বনির্ধারিত ছিল বলে মানুষের মধ্যে ধারণা জন্ম নেয়। এতে ভোটের প্রতি সাধারণ মানুষের আস্থা কমেছে, নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি বিশ্বাসে চিড় ধরেছে এবং গণতান্ত্রিক সংস্কৃতিও ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। তিনি মনে করেন, এ অবস্থা থেকে উত্তরণে রাষ্ট্রের সব গণতান্ত্রিক প্রতিষ্ঠানকে কার্যকর করতে হবে এবং জনগণের ভোটাধিকারকে সর্বোচ্চ গুরুত্ব দিতে হবে।
অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন বলেন, জনগণ যখন স্বাধীনভাবে ভোট দিতে পারে, নিজেদের প্রতিনিধি নিজেরা নির্বাচন করতে পারে এবং নির্বাচিত ব্যক্তি জানেন যে পরবর্তী নির্বাচনেও তাকে জনগণের কাছেই ফিরে যেতে হবে—তখনই প্রকৃত অর্থে জবাবদিহিমূলক রাজনৈতিক সংস্কৃতি তৈরি হয়। এ কারণেই গণতন্ত্রকে কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান হিসেবে নয়, বরং প্রশাসন, নির্বাচন, জনসেবা ও উন্নয়নের প্রতিটি স্তরে কার্যকর নীতিতে পরিণত করতে হবে।
### ফ্যামিলি কার্ড বাড়ি বাড়ি পৌঁছে দেওয়ার আশ্বাস
সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচি প্রসঙ্গে মন্ত্রী বলেন, সরকার চায় প্রান্তিক, দরিদ্র, সুবিধাবঞ্চিত ও ঝুঁকিপূর্ণ জনগোষ্ঠীর কাছে সহায়তা কার্যক্রমকে আরও সহজ, স্বচ্ছ ও জনবান্ধবভাবে পৌঁছে দিতে। এ লক্ষ্যে বিভিন্ন কর্মসূচির বাস্তবায়ন পদ্ধতিতে পরিবর্তন আনা হচ্ছে, যাতে উপকারভোগীরা অযথা হয়রানির শিকার না হন।
তিনি বলেন, বিশেষ করে ফ্যামিলি কার্ড বিতরণ নিয়ে মানুষের কোনো ভোগান্তি থাকবে না। এ কার্ডের জন্য কাউকে অফিসে অফিসে ঘুরতে হবে না, দালাল বা মধ্যস্বত্বভোগীর দ্বারস্থও হতে হবে না। সরকারের পক্ষ থেকেই সংশ্লিষ্ট ব্যক্তিদের বাড়ি বাড়ি গিয়ে কার্ড পৌঁছে দেওয়ার ব্যবস্থা করা হবে।
মন্ত্রী বলেন, “আমরা চাই না, একটি সহায়তা কার্ড পাওয়ার জন্য একজন অসহায় মানুষকে দিনের পর দিন ঘুরতে হোক। সরকার মানুষের দোরগোড়ায় সেবা পৌঁছে দিতে চায়। প্রকৃত উপকারভোগীরা যেন সহজে সেবা পান, সেটিই আমাদের লক্ষ্য।”
তিনি আরও বলেন, সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মূল উদ্দেশ্য কেবল ভাতা বা কার্ড বিতরণ নয়; বরং সমাজের পিছিয়ে পড়া জনগোষ্ঠীকে রাষ্ট্রীয় সহায়তার আওতায় এনে তাদের জীবনমান উন্নয়নে কার্যকর সহায়তা দেওয়া। এ কারণে উপকারভোগী নির্বাচন, তথ্য যাচাই, কার্ড বিতরণ এবং মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়নে স্বচ্ছতা ও জবাবদিহি নিশ্চিত করা জরুরি। সরকার সে লক্ষ্যেই কাজ করছে বলে জানান তিনি।
### গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়ন পরস্পর সম্পর্কযুক্ত
মন্ত্রী তার বক্তব্যে বলেন, গণতন্ত্র, সুশাসন ও উন্নয়ন একে অপরের সঙ্গে ওতপ্রোতভাবে জড়িত। জনগণের মতামতকে পাশ কাটিয়ে উন্নয়নের যে কোনো প্রচেষ্টা দীর্ঘমেয়াদে টেকসই হয় না। কারণ উন্নয়নের প্রকৃত সুফল নিশ্চিত করতে হলে মানুষের অংশগ্রহণ, আস্থা ও জবাবদিহিমূলক প্রশাসনিক কাঠামো প্রয়োজন। আর সেই কাঠামোর কেন্দ্রে থাকতে হবে জনগণের ভোটাধিকার ও নির্বাচিত প্রতিনিধিদের জবাবদিহি।
তিনি বলেন, জনপ্রতিনিধিরা যদি জনগণের চেয়ে প্রশাসনের নির্দিষ্ট অংশ বা ক্ষমতাসীন গোষ্ঠীর কাছে বেশি দায়বদ্ধ হয়ে পড়েন, তাহলে সাধারণ মানুষের সমস্যা, দাবি ও প্রত্যাশা নীতিনির্ধারণে যথাযথ গুরুত্ব পায় না। তাই গণতন্ত্রকে শক্তিশালী করতে হলে নির্বাচনী ব্যবস্থার প্রতি মানুষের আস্থা ফিরিয়ে আনতে হবে এবং ভোটকে অর্থবহ করে তুলতে হবে।
সভায় প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা
বিভাগীয় সমাজসেবা কার্যালয়ে আয়োজিত আলোচনা সভায় রংপুর সিটি করপোরেশনের প্রশাসক, জেলা পরিষদের প্রশাসক সাইফুল ইসলামসহ বিভাগীয় ও জেলা প্রশাসনের ঊর্ধ্বতন কর্মকর্তারা উপস্থিত ছিলেন। তারা সামাজিক নিরাপত্তা কর্মসূচির মাঠপর্যায়ের বাস্তবায়ন, জনসেবার বিস্তার এবং স্থানীয় পর্যায়ে সরকারি কার্যক্রম আরও গতিশীল করার বিভিন্ন বিষয় নিয়ে মতবিনিময় করেন। পরে মন্ত্রী অধ্যাপক ডা. এ জেড এম জাহিদ হোসেন লালমনিরহাটে “আলোকিত লালমনিরহাট” কর্মসূচির উদ্বোধনী অনুষ্ঠানে যোগ দিতে রওনা দেন।





