
আলী কদর পলাশ
প্রিয় পাঠক,
বিশ্বকাপের ইতিহাসে এমন অনেক মুহূর্ত আছে, যেখানে গোলের চেয়েও বেশি আলোচনায় এসেছে একটি দৃশ্য। ১৯৭০ সালের মেক্সিকো বিশ্বকাপের কোয়ার্টার ফাইনালে ব্রাজিল ও পেরুর ম্যাচ শেষে ঘটে এমনই একটি ঘটনা। সেই মুহূর্তের কেন্দ্রবিন্দুতে ছিলেন ব্রাজিলের ১০ নম্বর জার্সিধারী পেলে এবং পেরুর অধিনায়ক ৫ নম্বর জার্সিধারী হেক্টর চুম্পিতাস।
ম্যাচে ব্রাজিল ৪-২ গোলে জয় পায়। পেলে গোল করেন, আক্রমণে নেতৃত্ব দেন, আর চুম্পিতাস শেষ পর্যন্ত লড়ে যান নিজের দলকে বাঁচানোর জন্য। নব্বই মিনিট ধরে দুজনই ছিলেন প্রতিপক্ষ। একজন আক্রমণের শিল্পী, অন্যজন রক্ষণভাগের দেয়াল।
কিন্তু শেষ বাঁশি বাজতেই বদলে যায় দৃশ্যপট।
পেলে নিজের বিখ্যাত ১০ নম্বর জার্সিটি খুলে চুম্পিতাসের হাতে তুলে দেন। চুম্পিতাসও খুলে দেন নিজের ৫ নম্বর জার্সি। দুজনের মুখে ছিল হাসি। ছিল করমর্দন। ছিল একজন কিংবদন্তির আরেক কিংবদন্তির প্রতি নিঃশর্ত সম্মান।
আজ ম্যাচ শেষে জার্সি বদলানো ফুটবলের একটি স্বাভাবিক রীতি। কিন্তু তখন এটি ছিল বিরল দৃশ্য। টেলিভিশনের ক্যামেরায় ধরা পড়া সেই মুহূর্ত বিশ্বের কোটি কোটি দর্শককে নতুন এক বার্তা দিয়েছিল—প্রতিদ্বন্দ্বিতা মাঠে শেষ হয়, সম্মান কখনো শেষ হয় না।
পেলের ১০ নম্বর জার্সি ছিল ফুটবল শিল্পের প্রতীক। সেই নম্বর পরে তিনি বিশ্বজুড়ে কোটি মানুষের হৃদয় জয় করেছিলেন। অন্যদিকে চুম্পিতাসের ৫ নম্বর জার্সি ছিল নেতৃত্ব, দৃঢ়তা ও নির্ভরতার প্রতীক। একজন গোলের নায়ক, অন্যজন রক্ষণভাগের সম্রাট। নম্বর আলাদা হলেও মর্যাদা ছিল সমান।
এরপর ধীরে ধীরে বিশ্বকাপে জার্সি বিনিময় এক সুন্দর ঐতিহ্যে পরিণত হয়। ফাইনাল হোক কিংবা গ্রুপপর্ব, জয়ী বা পরাজিত—শেষ বাঁশির পর প্রতিপক্ষের জার্সি সংগ্রহ যেন পারস্পরিক শ্রদ্ধার অলিখিত নিয়ম হয়ে ওঠে। আজ অনেক খেলোয়াড়ের কাছে প্রতিপক্ষের একটি জার্সির মূল্য ট্রফির স্মৃতির চেয়েও কম নয়। বিশ্বের নানা জাদুঘর ও ব্যক্তিগত সংগ্রহেও সংরক্ষিত রয়েছে এমন অসংখ্য বিশ্বকাপের জার্সি।
বিশ্বকাপ আমাদের শেখায়, ইতিহাস শুধু ট্রফি হাতে তোলার মধ্যেই সীমাবদ্ধ নয়। কখনো কখনো ইতিহাস লেখা হয় একটি ১০ নম্বর আর একটি ৫ নম্বর জার্সি বিনিময়ের মধ্য দিয়েও। সেই কারণেই ১৯৭০ সালের সেই দৃশ্য আজও ফুটবলের সবচেয়ে মানবিক মুহূর্তগুলোর একটি হয়ে আছে।
[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]





