
আলী কদর পলাশ
জুন মাস এলেই দেশের বাতাসে দুটি জিনিসের তীব্রতা হুহু করে বাড়ে। একটি হলো কালবৈশাখী ঝড়, আর অন্যটি বাজেট নামক বার্ষিক অর্থনৈতিক সুনামি। প্রতি বছরের মতো এবারও অর্থমন্ত্রী যখন সংসদে একটা মহামূল্যবান ব্রিফকেস বগলে চেপে, মুখে ‘সব পেয়েছি’ মার্কা এক চিলতে রহস্যময় হাসি নিয়ে প্রবেশ করলেন, তখন টিভি পর্দার সামনে বসা কোটি আমজনতার বুকের ভেতরটা দুরুদুরু করে কেঁপে উঠেছিল। ব্রিফকেসের তালা খুলতেই বেরিয়ে এলো চলতি বছরের বাজেট। তা সেই বাজেটের মাহাত্ম্য আর ‘জনবান্ধব’ চাবুকগুলো এমন চমৎকার যে, আমাদের মতো সাধারণ মানুষের জীবনকে এক লহমায় বদলে দিয়ে পকেটটিকে একেবারে গঙ্গাযাত্রায় পাঠিয়ে দিয়েছে।

এবারের বাজেটে কর বা ট্যাক্সের পরিধি যেভাবে রকেটের গতিতে বাড়ানো হয়েছে, তাতে মনে হচ্ছে আর কিছুদিন পর রাস্তায় হাঁটার সময় নিঃশ্বাস নেওয়ার ওপরও ‘ফুসফুস কর’ বসানো হতে পারে। এমনিতেই এ দেশের মানুষ রাত জেগে ফোনে প্রেম করে কিংবা সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে সস্তা রিলস দেখে মহামূল্যবান সময় নষ্ট করে। সরকার হয়তো ভাবল, দেশের অলস যুবসমাজকে এভাবে ধ্বংস হতে দেওয়া যায় না, এদেরকে বাঁচাতে হবে। ব্যস, অমনি শুভকামনা জানিয়ে মোবাইল রিচার্জের ওপর সম্পূরক শুল্ক আরও এক দফা বাড়িয়ে দেওয়া হলো। এখন একশত টাকা রিচার্জ করলে অ্যাকাউন্টে ঠিক কত টাকা ট্যাক্স কেটে কত পয়সা অবশিষ্ট রইল, তা বের করতে সাধারণ মানুষকে আইনস্টাইনের আপেক্ষিকতার সূত্র নিয়ে গবেষণা করতে হচ্ছে। ধনীদের জন্য করের হার যা-ই হোক না কেন, মধ্যবিত্তের জন্য অর্থমন্ত্রীর নীতি একটাই—লেবু চিপে রস বের করো, আর মধ্যবিত্ত চিপে ট্যাক্স বের করো!
বাজেট বক্তৃতায় প্রতিবারই একটা রোমাঞ্চকর তালিকা থাকে, যেখানে কোন কোন জিনিসের দাম বাড়ল আর কোনটার কমল তা মহোৎসাহে জানানো হয়। এবারও সেই তালিকার রসিকতা দেখে দেশের মানুষ টাসকি খেয়ে গেছে। বাজারে সাধারণ মানুষের প্রধান খাদ্য চাল, ডাল, আলু আর তেলের দাম যখন এভারেস্টের চূড়ায় গিয়ে বসে আছে, তখন আমাদের পরম শান্তিদাতা অর্থমন্ত্রী সদয় হয়ে বিলাসবহুল মার্সিডিজ গাড়ি, চার্টার্ড বিমান আর বিদেশী প্রমোদতরীর ওপর শুল্ক কমিয়ে দিয়েছেন। সাধারণ মানুষ যখন বাজারে গিয়ে কাঁচামরিচের ঝাঝ সইতে না পেরে হাহাকার করছে, তখন সোনা আর হীরার দামে সামান্য ছাড় দেওয়া হয়েছে। সরকারের সুদূরপ্রসারী চিন্তাটা দেখুন, তারা চান আমরা যেন ডাল-ভাত খাওয়ার মতো সস্তা অভ্যাস ত্যাগ করে একটু দামি বিমানে চড়ে আকাশে উড়ি আর হীরার চকোলেট চিবাই। দেশের মানুষের ডায়েট কন্ট্রোল আর জীবনযাত্রার মান আন্তর্জাতিক স্তরে নিতে এর চেয়ে মধুর কৌতুক আর কী হতে পারে!
এবারের বাজেটের বিশাল একটা অংশ জুড়ে আছে ‘ঘাটতি’। অর্থাৎ সহজ বাংলায়, সরকারের পকেটে আয় নেই কিন্তু খরচ করার শখ ষোলো আনা। এই বিপুল খাদের কিনারা পূরণ হবে দেশী-বিদেশী ব্যাংক থেকে দেদারসে ঋণ নিয়ে। ব্যাপারটা দেখতে অবিকল আমাদের পাড়ার পল্টু মিয়ার মতো। পল্টুর নিজের কামাই মাসে মাত্র দশ হাজার টাকা, কিন্তু সে পঁচিশ হাজার টাকার আইফোন কিনতে আর গার্লফ্রেন্ডকে রেস্টুরেন্টে খাওয়াতে পুরো পাড়ার মানুষের কাছ থেকে ধার করে বেড়ায়। তফাত শুধু এটুকুই যে, পল্টুকে পাওনাদাররা রাস্তায় ধরলে সে প্যান্টের কাপড় গুটিয়ে গলির ভেতর দৌড়ে পালায়, আর আমাদের ক্ষেত্রে বাজেটের ঘাটতি পূরণে অবলীলায় নতুন করে কাগজের টাকা ছাপিয়ে বাজার কাঁপানো হয়।
বাজেটের এই টানাটানি আর ধার-দেনার হিসাব বুঝতে আমাদের এক কৃপণ ভদ্রলোকের চমৎকার গল্প মনে পড়ে যায়। এক অর্থমন্ত্রী গেছেন এক বিখ্যাত কৃপণের বাড়ি পরিদর্শনে। কৃপণ ভদ্রলোক আবার নিজের সংসারে প্রতি বছর কড়া বাজেট প্রণয়ন করেন। তো অর্থমন্ত্রী তাকে জিজ্ঞেস করলেন, হে ভাই, দেশের বাজারে এত মন্দা, ব্যাংকে টাকা নেই, চারিদিকে ঋণের বোঝা, এই অবস্থায় ঘাটতি বাজেট পাস করার কোনো জাদুকরী আইডিয়া কি আপনার মাথায় আছে? কৃপণ ভদ্রলোক মুচকি হেসে বললেন, আইডিয়া খুব সোজা মন্ত্রী মশাই। আমি যখন দেখি আমার আয় কম কিন্তু খরচ বেশি, তখন আমি আমার প্রতিবেশীর কাছ থেকে এক লাখ টাকা ধার করি। অর্থমন্ত্রী অবাক হয়ে বললেন, তা তো বুঝলাম, কিন্তু পরের বছর যখন সেই প্রতিবেশী টাকা ফেরত চায়, তখন কী করেন? কৃপণ লোকটা পরম শান্তিতে জবাব দিলেন, তখন আমি অন্য প্রতিবেশীর কাছ থেকে দুই লাখ টাকা ধার করে প্রথম জনের এক লাখ শোধ করি, আর বাকি এক লাখ দিয়ে মনের সুখে ঘি-ভাত খাই। আমাদের জাতীয় বাজেটের হিসাবটাও অনেকটা এই প্রতিবেশী বদলের মহোৎসবের মতো। এক ব্যাংকের ঋণ শোধ করতে অন্য ব্যাংক থেকে দ্বিগুণ ধার করা হয়, আর আমরা ভাবি দেশ বুঝি সোনায় সোহাগা হয়ে গেল!
বাজেট আসে আর বাজেট যায়, কিন্তু বাজারের থলে হাতে মধ্যবিত্তের মুখের সেই করুণ কাঁচুমাচু অভিব্যক্তি কখনো বদলায় না। তাই আসুন, ছেঁড়া পকেটে হাত ঢুকিয়ে, শূন্য ওয়ালেটের দিকে তাকিয়ে আর বাজারের চড়া দামের আগুনে হাত সেঁকতে সেঁকতে আমরা সবাই মিলে অর্থমন্ত্রীর দীর্ঘায়ু কামনা করি। তিনি যেন আগামী বছর আমাদের জন্য এর চেয়েও আরও বড়, আরও রঙিন এবং পকেট পুরোপুরি ভস্মীভূত করার মতো আরেকটি চমৎকার বাজেট উপহার দিতে পারেন।





