মায়ের মরদেহে নয়, পচন ধরেছে আমাদের হৃদয়ে

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

মিরপুরের সেই ঘরটিতে সাত-আট দিন ধরে একজন মা পড়ে ছিলেন। দরজা বন্ধ ছিল, ঘর ভরা ছিল নোংরা আর আবর্জনায়। ধীরে ধীরে শরীর পচে দুর্গন্ধ ছড়িয়েছে। তারপর একদিন মানুষ জানতে পেরেছে, তিনি আর বেঁচে নেই।

খবরটি পড়ে হয়তো আমরা দীর্ঘশ্বাস ফেলব, সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে দু-একটি মন্তব্য লিখব, তারপর আবার নিজের কাজে ব্যস্ত হয়ে যাব। কিন্তু একবার কি ভেবে দেখেছি, মৃত্যুর আগে সেই মায়ের শেষ কয়েকটি দিন কেমন কেটেছিল?

তিনি কি বারবার দরজার দিকে তাকিয়েছিলেন?

তিনি কি অপেক্ষা করেছিলেন, কেউ এসে বলবে, “মা, কেমন আছো?”

তিনি কি শেষ মুহূর্ত পর্যন্ত বিশ্বাস করেছিলেন, তার সন্তানরা তাকে ভুলে যেতে পারে না?

একজন মা যখন সন্তানকে জন্ম দেন, তখন তিনি জানেন না সেই সন্তান একদিন সচিব হবে, শিক্ষক হবে, বিদেশে যাবে কিংবা বড় মানুষ হবে। তিনি শুধু জানেন, এ আমার সন্তান। তার জ্বর হলে মা রাত জেগে থাকেন। তার ক্ষুধা লাগলে নিজের অংশটুকু তুলে দেন। তার ভবিষ্যতের জন্য নিজের স্বপ্নগুলোও বিসর্জন দেন।

কিন্তু জীবন কত নির্মম!

যে মা একদিন সন্তানের কান্না শুনে ঘুম ভাঙাতেন, সেই মায়ের মৃত্যুর খবরও অনেক সময় সন্তানের কানে পৌঁছায় না। যে মা সন্তানের একটি হাঁচিতেও অস্থির হয়ে যেতেন, সেই মা দিনের পর দিন মৃত অবস্থায় পড়ে থাকেন, আর কেউ দরজায় কড়া নাড়ে না।

এই সংবাদে সবচেয়ে ভয়ংকর বিষয়টি মৃত্যু নয়।

মৃত্যু তো জীবনের অনিবার্য সত্য।

সবচেয়ে ভয়ংকর হলো, একজন মানুষ মৃত্যুর আগেই পরিবার থেকে, সম্পর্ক থেকে, ভালোবাসা থেকে বিচ্ছিন্ন হয়ে গিয়েছিলেন। তার নিঃসঙ্গতা তার মৃত্যুরও আগে শুরু হয়েছিল।

আমরা সন্তানদের ভালো স্কুলে ভর্তি করাই, ভালো বিশ্ববিদ্যালয়ে পড়াই, বড় চাকরির স্বপ্ন দেখাই। কিন্তু কজন শেখাই, বৃদ্ধ মায়ের হাত ধরে বসে থাকতে? কজন শেখাই, বাবার পাশে বসে কিছুক্ষণ গল্প করতে? কজন শেখাই, পৃথিবীর সবচেয়ে বড় সাফল্য হলো সেই মানুষগুলোর খোঁজ নেওয়া, যারা আমাদের জন্য নিজেদের জীবন উজাড় করে দিয়েছেন?

আজ আমরা সবাই ব্যস্ত।

কেউ অফিসে, কেউ ব্যবসায়, কেউ বিদেশে, কেউ নিজের সংসারে।

কিন্তু এই ব্যস্ততার ভিড়ে আমরা কি কখনও থেমে ভাবি, ঘরের এক কোণে বসে থাকা বৃদ্ধ মানুষটি হয়তো শুধু আমাদের পাঁচ মিনিট সময়ের অপেক্ষায় আছেন?

হয়তো আপনার মা এখনো বেঁচে আছেন।

হয়তো তিনি প্রতিদিন আপনার ফোনের অপেক্ষা করেন।

হয়তো আপনি ভাবছেন, আগামী শুক্রবার গিয়ে দেখা করবেন।

হয়তো তিনি কিছু বলেন না, কিন্তু প্রতিদিন দরজার শব্দ শুনলে মনে করেন, “আমার ছেলে এসেছে।”

আজ রাতেই একবার মাকে ফোন করুন।

জিজ্ঞেস করুন, “মা, তুমি কেমন আছো?”

যদি কাছে থাকেন, তার পাশে গিয়ে কিছুক্ষণ বসুন।

মায়ের মাথায় হাত রাখুন।

কারণ পৃথিবীর সবচেয়ে বড় আফসোসগুলোর একটি হলো, মানুষ যখন বুঝতে পারে মাকে আরও বেশি ভালোবাসা উচিত ছিল, তখন অনেক সময় মা আর পাশে থাকেন না।

মিরপুরের সেই বৃদ্ধা মা শুধু একটি পরিবারের গল্প নন। তিনি আমাদের সবার মা। তিনি আমাদের ব্যস্ততা, উদাসীনতা আর ভুলে যাওয়ার সংস্কৃতির এক নীরব প্রতিচ্ছবি।

তার মরদেহে পচন ধরেছিল কয়েকদিন আগে।

কিন্তু যদি এই ঘটনা থেকেও আমাদের হৃদয় না কাঁপে, তবে সত্যি বলতে কী, পচন ধরেছে আমাদের ভেতরেই।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...