
বিশেষ প্রতিবেদক
বাংলাদেশ ও ভারতের মধ্যকার গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তির মেয়াদ চলতি বছরের ডিসেম্বরেই শেষ হচ্ছে। চুক্তিটি নবায়ন হবে, নাকি নতুন করে আরেকটি চুক্তি করা হবে, সে বিষয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক ঘোষণা না এলেও দুই দেশের কারিগরি পর্যায়ে প্রস্তুতি শুরু হয়েছে বলে জানা গেছে।
এই প্রক্রিয়ার মধ্যেই ভারতের পক্ষ থেকে অনানুষ্ঠানিকভাবে নতুন একটি ফর্মুলার ইঙ্গিত দেওয়া হচ্ছে। তবে বাংলাদেশের পানি বিশেষজ্ঞরা এটিকে ‘অযৌক্তিক’ বলে মনে করছেন। তাদের আশঙ্কা, ভারতের সাম্প্রতিক অবস্থান চুক্তি নবায়নের পথকে আরও জটিল করে তুলতে পারে।
পানি সম্পদমন্ত্রী শহীদ উদ্দিন চৌধুরী এ্যানী জানিয়েছেন, সরকার এ বিষয়ে একটি বিশেষজ্ঞ কমিটি গঠন করেছে। তিনি বলেন, দুই দেশের বিশেষজ্ঞরা আলোচনার মাধ্যমে সমাধানে পৌঁছানোর চেষ্টা করবেন। পরে যৌথ নদী কমিশনের মন্ত্রী পর্যায়ের বৈঠকে চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত হতে পারে।
সরকারি সূত্রগুলো বলছে, দুই দেশের কারিগরি দল ইতোমধ্যে প্রাথমিক কাজ শুরু করেছে। এরপর যৌথ নদী কমিশনে বিভিন্ন বিষয় চূড়ান্ত হওয়ার পর আনুষ্ঠানিক ঘোষণা আসতে পারে।
১৯৯৬ সালে ভারত ও বাংলাদেশ ৩০ বছর মেয়াদি গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি স্বাক্ষর করেছিল। ফারাক্কা বাঁধ চালুর দুই দশকেরও বেশি সময় পর এই চুক্তি হয়েছিল।
পানি ভাগাভাগির হিসাব
বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী, গঙ্গায় পানির প্রবাহের পরিমাণের ওপর ভিত্তি করে দুই দেশ পানি পায়।
নদীতে ৭০ হাজার কিউসেক বা তার কম পানি থাকলে বাংলাদেশ ও ভারত সমান ভাগ পাবে।
পানির প্রবাহ ৭০ হাজার থেকে ৭৫ হাজার কিউসেক হলে বাংলাদেশ পাবে ৪০ হাজার কিউসেক। বাকি অংশ প্রবাহিত হবে ভারতে।
প্রবাহ ৭৫ হাজার কিউসেকের বেশি হলে ভারত পাবে ৪০ হাজার কিউসেক। অবশিষ্ট পানি বাংলাদেশে প্রবাহিত হবে।
গত কয়েক বছর ধরেই নতুন চুক্তি বা নবায়নের প্রশ্ন আলোচনায় রয়েছে। বিশেষ করে ২০২৫ সালের মার্চে যৌথ কমিটির বৈঠকে প্রশ্ন ওঠে, নতুন বাস্তবতায় কোন শর্তে চুক্তি নবায়ন হবে।
জানা গেছে, ভারত চাইছে ফারাক্কা পয়েন্টে পানির প্রবাহকে ভিত্তি ধরে নতুন কাঠামো তৈরি করতে। অন্যদিকে বাংলাদেশ চাইছে পুরো নদীর প্রবাহ বিবেচনায় নিয়ে পানি বণ্টন হোক।
সম্প্রতি সাংবাদিকদের একটি প্রতিনিধি দল ভারত সফরে গেলে ভারতের পররাষ্ট্র সচিব বিক্রম মিশ্রি বলেন, বাংলাদেশে তারেক রহমানের নেতৃত্বাধীন নতুন সরকারের সঙ্গে পানি ইস্যুসহ সব বিষয়ে আলোচনায় প্রস্তুত রয়েছে ভারত। তিনি আরও বলেন, গঙ্গা চুক্তি নবায়নের বিষয়ে যৌথ নদী কমিশন সময়মতো ভূমিকা রাখবে।
একই সফরে বাংলাদেশের সাবেক ভারতীয় হাইকমিশনার পঙ্কজ শরণ মন্তব্য করেন, ১৯৯৬ সালের চুক্তিতে ব্যবহৃত পুরোনো ফর্মুলা এখন আর কার্যকর নাও হতে পারে। কারণ তখন ১৯৪৯ থেকে ১৯৮৮ সালের পানিপ্রবাহের তথ্য ভিত্তি হিসেবে ধরা হয়েছিল। তার মতে, সাম্প্রতিক ৪০ বছরের পানিপ্রবাহ বিবেচনায় আনা উচিত।
তবে যৌথ নদী কমিশনের সাবেক সদস্য ও নদী বিশেষজ্ঞ আইনুন নিশাত এ ধারণার বিরোধিতা করেছেন। তিনি বলেন, গঙ্গা নদী শুধু ফারাক্কা দিয়ে নির্ধারিত হয় না। উজানে ভারত একতরফাভাবে পানি প্রত্যাহার করায় সেখানে প্রবাহ কমে যায়। তাই শুধু ওই পয়েন্টের গড় হিসাব ধরে পানি ভাগাভাগি ন্যায্য হবে না।
তার ভাষায়, দুই দেশ আগেই সম্মত হয়েছিল যে পুরো নদীর পানির পরিমাণ বিবেচনায় বণ্টন হবে। তিনি আশা প্রকাশ করেন, সুসম্পর্ক ও যৌক্তিক আলোচনার ভিত্তিতে সমাধান বের হবে।
ফারাক্কার দীর্ঘ প্রভাব
বাংলাদেশ সীমান্ত থেকে প্রায় ১৮ কিলোমিটার দূরে ভারতের মনোহরপুর এলাকায় ফারাক্কা বাঁধ নির্মাণ করা হয়। ১৯৭৫ সালে উদ্বোধনের পর থেকেই এটি দুই দেশের সম্পর্কে বড় রাজনৈতিক ও কূটনৈতিক ইস্যু হয়ে ওঠে।
ভারতের লক্ষ্য ছিল গঙ্গার অতিরিক্ত পানি ভাগীরথী নদীতে সরিয়ে কলকাতা বন্দরকে সচল রাখা। এজন্য প্রায় ৪০ কিলোমিটার দীর্ঘ একটি কৃত্রিম খালও খনন করা হয়।
বাংলাদেশের অভিযোগ, ফারাক্কার কারণে পদ্মা নদীর পানি প্রবাহ কমে গেছে। এতে দেশের বিস্তীর্ণ এলাকার পরিবেশ, কৃষি ও জনজীবনে নেতিবাচক প্রভাব পড়েছে।
এই ইস্যুতে ১৯৭৬ সালে মাওলানা আবদুল হামিদ খান ভাসানী ঐতিহাসিক লংমার্চ করেছিলেন, যা বাংলাদেশের রাজনৈতিক ইতিহাসে গুরুত্বপূর্ণ ঘটনা হিসেবে বিবেচিত হয়।
বর্তমান চুক্তি অনুযায়ী শুষ্ক মৌসুমে প্রতি ১০ দিনে বাংলাদেশ ৩৫ হাজার কিউসেক এবং ভারত ৪০ হাজার কিউসেক পানি পাওয়ার কথা।
নতুন সরকার নতুন প্রত্যাশা
বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের সময় দুই দেশের কূটনৈতিক সম্পর্কে টানাপোড়েন তৈরি হওয়ায় চুক্তি নবায়নে অগ্রগতি কম ছিল।
তবে চলতি বছরের ফেব্রুয়ারিতে বিএনপি সরকার ক্ষমতায় আসার পর বিষয়টি আবার সামনে আসে।
ভারতের পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী কীর্তি বর্ধন ফেব্রুয়ারিতে লোকসভায় জানান, গঙ্গা চুক্তি নবায়ন নিয়ে এখনো আনুষ্ঠানিক আলোচনা শুরু হয়নি। তবে পশ্চিমবঙ্গ সরকারের প্রতিনিধিরা আন্তঃমন্ত্রণালয় বৈঠকে অংশ নিয়েছে।
অন্যদিকে বাংলাদেশের পররাষ্ট্রমন্ত্রী খলিলুর রহমান দিল্লি সফরের আগে জানিয়েছিলেন, গঙ্গার পানি বণ্টন চুক্তি সফরের আলোচ্যসূচিতে থাকবে।
দিল্লিতে এনডিটিভিকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে তিনি বলেন, “ন্যায্যতা ও জলবায়ু সহনশীলতার ভিত্তিতে গঙ্গার পানিবণ্টন চুক্তি হওয়া উচিত। এটি দুই দেশের সম্পর্ক পুনর্গঠনের প্রথম পরীক্ষা।”
তিনি আরও বলেন, বর্তমান চুক্তির মেয়াদ কয়েক মাসের মধ্যেই শেষ হবে এবং বাংলাদেশ এমন একটি সংশোধিত চুক্তি চায়, যা মানুষের জরুরি প্রয়োজন পূরণ করতে পারবে।
তবে সফরের পরও এ বিষয়ে দুই দেশের পক্ষ থেকে এখনো কোনো আনুষ্ঠানিক সিদ্ধান্ত জানানো হয়নি।





