১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের নীতিগত সিদ্ধান্ত প্রধানমন্ত্রীর

Date:

spot_img

অর্থনৈতিক প্রতিবেদক

সরকারি চাকরিজীবীদের জন্য বহুল প্রতীক্ষিত নবম জাতীয় বেতন কাঠামো (পে-স্কেল) এবার বাস্তবায়নের পথে বড় অগ্রগতি হয়েছে। আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন এই বেতন কাঠামো কার্যকর করার নীতিগত সিদ্ধান্ত দিয়েছেন প্রধানমন্ত্রী তারেক রহমান। তবে বিপুল আর্থিক চাপ ও অর্থ জোগানের সীমাবদ্ধতার কারণে একযোগে পুরো সুবিধা কার্যকর না করে ধাপে ধাপে এটি বাস্তবায়নের পরিকল্পনা নিয়েছে সরকার।

সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, আগামী ৭ জুন বিকেল ৩টায় ত্রয়োদশ জাতীয় সংসদের দ্বিতীয় বা বাজেট অধিবেশন শুরু হবে। রাষ্ট্রপতি মো. সাহাবুদ্দিন ইতোমধ্যে অধিবেশন আহ্বান করেছেন। ওই অধিবেশনে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী ২০২৬-২৭ অর্থবছরের জাতীয় বাজেট উপস্থাপন করবেন। বাজেট বক্তব্যে নতুন পে-স্কেলের আনুষ্ঠানিক ঘোষণা এবং বাস্তবায়নের রূপরেখা তুলে ধরা হতে পারে।

অর্থ বিভাগ ও মন্ত্রিপরিষদ বিভাগ সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তাদের হিসাবে, নতুন পে-স্কেল পুরোপুরি বাস্তবায়নে সরকারের অতিরিক্ত প্রায় ১ লাখ ৬ হাজার কোটি টাকা প্রয়োজন হবে। এই বিশাল ব্যয়ের চাপ এবং সম্ভাব্য মূল্যস্ফীতির ঝুঁকি বিবেচনায় নিয়েই সরকার তিন ধাপে বাস্তবায়নের কৌশল নিয়েছে। সরকারের লক্ষ্য, ২০২৮-২৯ অর্থবছরের মধ্যে নতুন বেতন কাঠামোর শতভাগ সুবিধা নিশ্চিত করা।

পরিকল্পনা অনুযায়ী, প্রথম ধাপে আগামী ১ জুলাই থেকেই কর্মকর্তা-কর্মচারীদের বর্ধিত মূল বেতনের ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। এ জন্য আসন্ন বাজেটে ৩০ হাজার কোটি টাকার বেশি, প্রাথমিক হিসাবে প্রায় ৩৫ হাজার কোটি টাকা অতিরিক্ত বরাদ্দ রাখার প্রস্তুতি নেওয়া হয়েছে। অর্থমন্ত্রীর বাজেট বক্তৃতার খসড়াতেও ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের এই কর্মপরিকল্পনা অন্তর্ভুক্ত করা হয়েছে বলে জানা গেছে।

দ্বিতীয় ধাপে মূল বেতনের অবশিষ্ট ৫০ শতাংশ কার্যকর করা হবে। তৃতীয় ধাপে মূল বেতনের সঙ্গে বিভিন্ন আনুষঙ্গিক ভাতা ও অন্যান্য আর্থিক সুবিধা পুরোপুরি সমন্বয় করা হবে।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা মনে করছেন, ধাপে ধাপে বাস্তবায়নের ফলে বাজারে মূল্যস্ফীতির ওপর অতিরিক্ত চাপ পড়বে না এবং সরকারের নগদ অর্থায়ন ব্যবস্থাপনাও তুলনামূলক সহজ থাকবে।

অর্থ মন্ত্রণালয়ের উচ্চপর্যায়ের এক কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে বলেন, “প্রধানমন্ত্রী আগামী ১ জুলাই থেকেই নতুন পে-স্কেল বাস্তবায়নের স্পষ্ট নির্দেশনা দিয়েছেন। ফলে জুলাই থেকে সরকারি চাকরিজীবীরা নতুন কাঠামোতে বেতন পাবেন, এ নিয়ে এখন আর কোনো সংশয় নেই।”

গত বুধবার ও বৃহস্পতিবার সচিবালয়ের মন্ত্রিপরিষদ বিভাগে বাজেট সংক্রান্ত উচ্চপর্যায়ের ধারাবাহিক বৈঠকে এ বিষয়ে সিদ্ধান্ত নেওয়া হয়। টানা দুই দিনের ওই বৈঠকে অর্থমন্ত্রী আমীর খসরু মাহমুদ চৌধুরী নতুন পে-স্কেলের রূপরেখা, খাতভিত্তিক বরাদ্দ এবং জাতীয় রাজস্ব বোর্ডের (এনবিআর) কর আহরণের সার্বিক চিত্র প্রধানমন্ত্রীর সামনে তুলে ধরেন। সব দিক পর্যালোচনার পর প্রধানমন্ত্রী নতুন বেতন কাঠামো চালুর বিষয়ে চূড়ান্ত সবুজ সংকেত দেন।

বৈঠকে এনবিআর চেয়ারম্যান মো. আবদুর রহমান খান, বাংলাদেশ ব্যাংকের গভর্নর মো. মোস্তাকুর রহমান এবং অর্থ সচিব মো. খায়েরুজ্জামান মজুমদারসহ সংশ্লিষ্টরা উপস্থিত ছিলেন।

এর আগে সাবেক অর্থ সচিব জাকির আহমেদ খানের নেতৃত্বাধীন ২৩ সদস্যের বেতন কমিশন গত ২১ জানুয়ারি তৎকালীন প্রধান উপদেষ্টা ড. মুহাম্মদ ইউনূসের কাছে চূড়ান্ত প্রতিবেদন জমা দেয়। বর্তমানে দেশের প্রায় ১৪ লাখ কর্মরত সরকারি কর্মকর্তা-কর্মচারী এবং প্রায় ৯ লাখ পেনশনভোগীর বেতন-ভাতা বাবদ সরকারের বার্ষিক ব্যয় প্রায় ১ লাখ ৩১ হাজার কোটি টাকা। নতুন পে-কমিশনের আওতায় এই প্রায় ২৩ লাখ কর্মকর্তা-কর্মচারী ও পেনশনভোগী আর্থিক সুবিধার আওতায় আসবেন।

বেসামরিক প্রশাসন, জুডিশিয়াল সার্ভিস ও সশস্ত্র বাহিনীর বেতন কাঠামো বিশ্লেষণ করে চূড়ান্ত সুপারিশ তৈরির জন্য সম্প্রতি মন্ত্রিপরিষদ সচিবের নেতৃত্বে একটি উচ্চপর্যায়ের কমিটি গঠন করা হয়েছে। কমিশন ও কমিটির খসড়া অনুযায়ী, সরকারি চাকরির বর্তমান ২০টি গ্রেড বহাল থাকছে। তবে সর্বনিম্ন মূল বেতন ৮ হাজার ২৫০ টাকা থেকে বাড়িয়ে ২০ হাজার টাকা এবং সর্বোচ্চ মূল বেতন ৭৮ হাজার টাকা থেকে বাড়িয়ে ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা করার সুপারিশ রয়েছে। এই কাঠামো অনুমোদিত হলে গ্রেডভেদে বেতন ১০০ থেকে ১৪০ শতাংশ পর্যন্ত বৃদ্ধি পাবে। একই সঙ্গে সর্বনিম্ন ও সর্বোচ্চ বেতনের অনুপাত ১:৯.৪ থেকে কমিয়ে ১:৮-এ নামিয়ে আনার প্রস্তাব করা হয়েছে।

প্রস্তাবিত নবম জাতীয় বেতন স্কেলের খসড়া অনুযায়ী, গ্রেড-১ কর্মকর্তাদের নির্ধারিত মূল বেতন ১ লাখ ৬০ হাজার টাকা রাখা হয়েছে। গ্রেড-২ এ বেতন ১ লাখ ৩২ হাজার থেকে ১ লাখ ৫৩ হাজার টাকা এবং গ্রেড-৩ এ ১ লাখ ১৩ হাজার থেকে ১ লাখ ৪৮ হাজার ৮০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব রয়েছে। এছাড়া গ্রেড-১০ এ মূল বেতন ৩২ হাজার থেকে ৭৭ হাজার ৩০০ টাকা এবং গ্রেড-২০ এ ২০ হাজার থেকে ৪৮ হাজার ৪০০ টাকা পর্যন্ত নির্ধারণের প্রস্তাব করা হয়েছে।

স্বাধীনতার পর ১৯৭৩ সালে দেশে প্রথম জাতীয় বেতন স্কেল চালু হয়। এরপর ২০১৫ সালে অষ্টম জাতীয় পে-স্কেল ঘোষণা পর্যন্ত মোট আটবার নতুন পে-স্কেল দেওয়া হয়েছে। প্রচলিত নিয়ম অনুযায়ী প্রতি পাঁচ বছর পরপর নতুন বেতন কাঠামো হওয়ার কথা থাকলেও করোনা মহামারি, বৈশ্বিক অর্থনৈতিক সংকট ও রাজস্ব চাপে সেই প্রক্রিয়া পিছিয়ে যায়।

সরকারি চাকরিজীবীদের সংগঠনগুলোর নেতারা বলছেন, গত এক দশকে জীবনযাত্রার ব্যয় কয়েকগুণ বেড়েছে। বাসাভাড়া, চিকিৎসা ব্যয় ও নিত্যপণ্যের মূল্যবৃদ্ধিতে নিম্ন ও মধ্যম আয়ের কর্মচারীরা চাপে রয়েছেন। তাই দ্রুত জাতীয় বেতন কমিশন-২০২৫-এর চূড়ান্ত গেজেট প্রকাশের দাবি জানিয়েছেন তারা।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...