মমতা ডোনাল্ড ব্যানার্জি

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

ইন্ডিয়া টুডের রম্যলেখক ও স্তম্ভকার কমলেশ সিং পশ্চিমবঙ্গের সাম্প্রতিক রাজনৈতিক নাটক নিয়ে একটি নিবন্ধ লিখেছেন। শিরোনাম দিয়েছেন, ‘মমতা ডোনাল্ড ব্যানার্জি’। শিরোনামটি প্রথমে শুনলে মনে হয়, কেউ হয়তো ভুল করে দুই মহাদেশের দুই নেতার নাম এক প্লেটে পরিবেশন করেছেন। কিন্তু রাজনীতির রান্নাঘরে এমন খিচুড়ি মাঝেমধ্যেই পাকাতে দেখা যায়।

ডোনাল্ড ট্রাম্প আর মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়। একজন আমেরিকার, আরেকজন পশ্চিমবঙ্গের। একজনের মাথায় লাল টুপি, আরেকজনের গায়ে চিকন সবুজ পাড়ের সাদা শাড়ি। একজন “আমেরিকা ফার্স্ট” বলতেন, আরেকজন “মা মাটি মানুষ”। কিন্তু পরাজয়ের পর দুজনের রাজনৈতিক দর্শন এসে এক জায়গায় দাঁড়িয়েছে- আমি হারিনি, জনগণ ভুল করেছে।

ভোটে হারার পর সাধারণ মানুষ বাড়ি ফিরে চা খায়। রাজনীতিবিদরা সংবাদ সম্মেলন করেন। আর মহারাজনীতিবিদরা ঘোষণা করেন, ভোটটাই আসলে ভোট ছিল না। জনগণ যা দিয়েছে, তা রায় নয়, ষড়যন্ত্র। ফলাফল যা দেখাচ্ছে, তা সংখ্যা নয়, অপপ্রচার। নির্বাচন কমিশন প্রতিষ্ঠান নয়, গোপন কাহিনির পার্শ্বচরিত্র।

ট্রাম্প ২০২০ সালে দেখিয়েছিলেন, অঙ্কের সঙ্গে ঝগড়া করাও এক ধরনের রাজনীতি। ভোট কম পড়েছে, আদালত মানছে না, কর্মকর্তা মানছে না, রাজ্য মানছে না কিন্তু তিনি মানবেন কেন? গণতন্ত্রে সবাই তো সমান। তাহলে বাস্তবতারও একটু নম্র হওয়া উচিত ছিল।

মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও এবার সেই মহান শিক্ষার বাংলা সংস্করণ হাজির করলেন। বিজেপি ২০৭ আসনে জিতেছে, তৃণমূল ক্ষমতা হারিয়েছে, তিনি নিজেও হেরেছেন। কিন্তু তাঁর ভাষায় তিনি হারেননি। নির্বাচন নাকি লুণ্ঠিত হয়েছে। শুনে মনে হয়, ভোটকেন্দ্রে ভোটাররা যায়নি, গিয়েছিল ডাকাতদল। ব্যালট নয়, যেন আলমারি ভেঙে গণতন্ত্রের গয়না নিয়ে গেছে কেউ।

এর মধ্যেই নাটকের নতুন দৃশ্য হাজির হয়েছে। বিবিসির প্রতিবেদনে জানা গেল, পশ্চিমবঙ্গের রাজ্যপাল সপ্তদশ বিধানসভা ভেঙে দিয়েছেন। সাংবিধানিক হিসাবে মমতা বন্দ্যোপাধ্যায় আর মুখ্যমন্ত্রী নন। বিজেপি নতুন সরকার গঠনের প্রস্তুতি নিচ্ছে। কিন্তু মমতার রাজনৈতিক মন এখনও সম্ভবত সরকারি গেজেট পড়েনি।

তিনি এখনও পরাজয় মানেননি। পদত্যাগও করেননি। ব্যাপারটা অনেকটা এমন, বাড়িওয়ালা বলেছে চুক্তির মেয়াদ শেষ, নতুন ভাড়াটিয়া দরজায় দাঁড়িয়ে আছে, তালাও বদলে গেছে কিন্তু পুরনো ভাড়াটিয়া এখনও বারান্দা থেকে চিৎকার করছেন, “আমি কিন্তু বাড়ি ছাড়িনি!”

সবচেয়ে চমৎকার ব্যাপার হলো, যে নির্বাচন কমিশন জিতলে জনগণের রায় সুরক্ষিত রাখে, হারলেই সে হয়ে যায় গণতন্ত্রের ভাড়াটে পাহারাদার। যে ইভিএম গতবার উন্নয়নের বোতাম ছিল, এবার সে ষড়যন্ত্রের পেটি। যে ভোটার গতবার সচেতন নাগরিক ছিল, এবার সে হয় কিনে নেওয়া, নয় ভোলানো, নয় ভয় দেখানো। অর্থাৎ ভোটার ভালো, যতক্ষণ সে ঠিক জায়গায় বোতাম টিপে।

ট্রাম্প জর্জিয়ার কর্মকর্তাকে ভোট খুঁজে বের করতে বলেছিলেন। ভোটও যে হারানো ছাগলের মতো খোঁজা যায়, এই তত্ত্ব আধুনিক গণতন্ত্রে তাঁর অবদান। মমতা এখনও সে পর্যায়ে যাননি। তবে অভিযোগের ভাষা শুনে মনে হয়, পশ্চিমবঙ্গের ভোটও বুঝি কোথাও লুকিয়ে আছে। একটু মন দিয়ে খুঁজলেই হয়তো আলমারির পেছন থেকে কয়েক ডজন আসন বেরিয়ে আসবে।

ক্ষমতা বড় কোমল জিনিস। হাতে থাকলে মনে হয় জনগণের আশীর্বাদ। হাতছাড়া হলেই মনে হয় আন্তর্জাতিক ষড়যন্ত্র। চেয়ারও বড় রহস্যময় বস্তু। নেতা যতদিন বসে থাকেন, ততদিন সেটি গণতন্ত্রের আসন। নামার সময় হলেই সেটি হয়ে যায় সংগ্রামের মঞ্চ।

এই জন্যই পরাজয় মানা রাজনীতির সবচেয়ে কঠিন বিদ্যা। জেতার পর সবাই বিনয়ী হয়। তখন ফুল থাকে, মাইক থাকে, বিজয় মিছিল থাকে, আর থাকে সেই পরিচিত বাক্য, “এ বিজয় জনগণের।” কিন্তু হারার পর জনগণ কোথায় যায়? তখন বিজয় জনগণের হলেও পরাজয় কখনও নিজের হয় না। পরাজয় হয় কমিশনের, যন্ত্রের, আবহাওয়ার, মিডিয়ার, বিদেশি শক্তির, গোপন চক্রান্তের। শুধু নেতার নয়।

কমলেশ সিং তাই মমতার মধ্যে ট্রাম্পকে দেখেছেন। আসলে তিনি একজন মানুষে আরেকজন মানুষ দেখেননি, দেখেছেন ক্ষমতার আয়নায় একই মুখভঙ্গি। সেই মুখভঙ্গির নাম: “আমি অপরাজেয়, কাজেই আমার পরাজয় অবৈধ।”

ক্যাপিটল হিলের ঘটনা আমেরিকাকে দেখিয়েছিল, নেতার মুখের আগুন কখনও কখনও সমর্থকের হাতে মশাল হয়ে যায়। পশ্চিমবঙ্গেও ভোটের পর সহিংসতার খবর সেই পুরোনো ভয়টাই ফিরিয়ে আনে। নেতা যখন বলেন, আমি হারিনি, কর্মী তখন ভাবে, তাহলে যে জিতেছে, সে নিশ্চয়ই চোর।

ট্রাম্প শেষ পর্যন্ত হোয়াইট হাউস ছেড়েছিলেন। যদিও তাঁর মুখভঙ্গি দেখে মনে হয়েছিল, আমেরিকাই ভুল প্রেসিডেন্ট বেছে ফেলেছে। এখন মমতা বন্দ্যোপাধ্যায়ও সেই রাজনৈতিক মোড়ে দাঁড়িয়ে। পার্থক্য শুধু, ট্রাম্পের হাতে ছিল টুইটার, আর মমতার হাতে আছে রাজপথ।

গণতন্ত্রের সবচেয়ে নির্মম ব্যাপার হলো, সে আবেগ বোঝে না। সে শুধু সংখ্যা বোঝে। আর সংখ্যার কাছে আহত অহংকারের বক্তৃতা সাধারণত গণনা হয় না।

আর আহত অহংকার যখন রাজপথে নামে, তখন জনগণের রায়ও হেলমেট পরে ঘর থেকে বের হয়।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...