
আলী কদর পলাশ
মহিউদ্দিন মোহাম্মদের বানরের আয়না বইয়ের ১৫-১৬ পৃষ্ঠায় উদ্ধৃত অংশটি নিঃসন্দেহে তীব্র। নির্মমও। লেখক এখানে বাংলাদেশের বিশ্ববিদ্যালয়পড়ুয়া তরুণ, বিসিএসকেন্দ্রিক উচ্চাভিলাষ, দারিদ্র্য, ভয়, লোভ এবং প্রশাসনিক দুর্নীতির মধ্যে একটি সরাসরি সম্পর্ক স্থাপন করেছেন। তাঁর বক্তব্যের ভঙ্গি আক্রমণাত্মক। কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই বিশ্লেষণ কতটা সত্য, আর কতটা অতিরঞ্জিত।
লেখক মূলত বলতে চেয়েছেন, দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা তরুণদের বড়ো অংশ রাষ্ট্রীয় চাকরিকে শুধু জীবিকার পথ হিসেবে দেখে না, দেখে সামাজিক প্রতিশোধ ও ক্ষমতা অর্জনের সুযোগ হিসেবে। এ পর্যবেক্ষণে বাস্তবতার একটি দিক আছে। বাংলাদেশে সামাজিক বৈষম্য তীব্র। সুযোগের বণ্টন অসম। ফলে চাকরি, পদ, ক্ষমতা ও প্রশাসনিক অবস্থানকে অনেকেই জীবনের একমাত্র উত্তরণের সিঁড়ি মনে করেন। এই অংশে লেখকের বিশ্লেষণ তাৎপর্যপূর্ণ।
কিন্তু সমস্যা শুরু হয় তখন, যখন তিনি প্রায় পুরো একটি শ্রেণীকে এক রঙে এঁকে ফেলেন। তিনি বলছেন, গত বিশ বছরে পাবলিক সার্ভিসে ঢোকা মানুষের সিংহভাগই ভীতু, নিম্নরুচির, মানসিকভাবে দুর্নীতিগ্রস্ত। এমন মন্তব্যে একটি সামাজিক বাস্তবতার চেয়ে বেশি ফুটে ওঠে তীব্র হতাশা ও ক্ষোভ। কারণ দরিদ্র পরিবার থেকে উঠে আসা সব মানুষ ভীরু নন। সব বিসিএস কর্মকর্তা দুর্নীতিগ্রস্ত নন। আবার উচ্চবিত্ত বা তথাকথিত সাংস্কৃতিকভাবে উন্নত পরিবারও নৈতিকতার নিশ্চয়তা দেয় না।
এই লেখার সবচেয়ে বড়ো দুর্বলতা হলো এর সাধারণীকরণ। লেখক দারিদ্র্যকে প্রায় নৈতিক অবক্ষয়ের অনিবার্য উৎস হিসেবে দেখিয়েছেন। কিন্তু দারিদ্র্য যেমন মানুষকে ভেঙে দিতে পারে, তেমনি তাকে সৎ, সংযমী ও সংগ্রামীও করতে পারে। একইভাবে প্রাচুর্য যেমন রুচি তৈরি করতে পারে, তেমনি নির্লজ্জ ভোগবাদও তৈরি করতে পারে। তাই শ্রেণী ও নৈতিকতার সম্পর্ক এত সরল নয়।
তবে লেখাটির গুরুত্ব অন্য জায়গায়। এটি আমাদের চোখে আঙুল দিয়ে দেখায়, ভয়ভিত্তিক সমাজে সৎ প্রশাসন তৈরি করা কঠিন। চাকরি হারানোর ভয়, পদোন্নতি না পাওয়ার ভয়, ক্ষমতার অসন্তোষের ভয়। এসব একটি কর্মকর্তাকে নৈতিকভাবে দুর্বল করে দিতে পারে। এই পর্যবেক্ষণ মূল্যবান। কারণ ব্যক্তি-দুর্নীতির পেছনে কাঠামোগত ভয়ের ভূমিকা সত্যিই বড়ো।
মহিউদ্দিন মোহাম্মদ “বেনজীর হওয়া”কে এখানে প্রায় সিস্টেমগত নিয়তি হিসেবে দেখিয়েছেন। এ বক্তব্য সাহসী, কিন্তু বিপজ্জনকও। কারণ এতে ব্যক্তির নৈতিক দায় কমে যায়। মনে হতে পারে, সিস্টেম খারাপ বলে সবাই একদিন দুর্নীতিগ্রস্ত হবেই। বাস্তবতা তা নয়। প্রতিকূল কাঠামোর মধ্যেও কেউ কেউ সততা ধরে রাখেন। তাঁরাই ব্যতিক্রম নন বরং আশার জায়গা।
বানরের আয়নার এই অংশের শক্তি তার নিষ্ঠুর সততা। দুর্বলতা তার একপাক্ষিক দৃষ্টিভঙ্গি। লেখাটি গুরুত্বপূর্ণ, কারণ এটি বিতর্ক তৈরি করে। কিন্তু একে চূড়ান্ত সত্য হিসেবে নিলে ভুল হবে। বরং এটিকে আমাদের রাষ্ট্র, সমাজ, দারিদ্র্য ও নৈতিকতার জটিল সম্পর্ক নিয়ে নতুন করে ভাবার সূত্র হিসেবে দেখা উচিত।
০৩ এপ্রিল, ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা





