গভর্নরের সতর্কবার্তা, বাড়ছে মূল্যস্ফীতির শঙ্কা

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

মধ্যপ্রাচ্যের চলমান যুদ্ধ আবারও বৈশ্বিক অর্থনীতিকে নাড়িয়ে দিচ্ছে। তার সরাসরি প্রভাব পড়ার আশঙ্কা তৈরি হয়েছে বাংলাদেশের অর্থনীতিতেও। দেশের কেন্দ্রীয় ব্যাংকের সর্বোচ্চ পর্যায় থেকেই মূল্যস্ফীতি বাড়ার আশঙ্কা প্রকাশ করা হয়েছে। এই সতর্কবার্তা উপেক্ষা করার সুযোগ নেই।

বাংলাদেশ একটি আমদানিনির্ভর অর্থনীতি। বিশেষ করে জ্বালানি, খাদ্য ও শিল্পের কাঁচামালের বড় অংশ আসে বিদেশ থেকে। মধ্যপ্রাচ্যে অস্থিরতা বাড়লে জ্বালানি সরবরাহ ব্যাহত হয়। তেলের দাম বাড়ে। পরিবহন ব্যয় বাড়ে। এর প্রভাব দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে পুরো অর্থনীতিতে।

মূল্যস্ফীতি এমনিতেই স্বস্তিকর অবস্থায় নেই। দীর্ঘদিন ধরেই সাধারণ মানুষ উচ্চমূল্যের চাপে আছে। নিত্যপণ্যের দাম স্থিতিশীল করা যাচ্ছে না। এই পরিস্থিতিতে নতুন করে যুদ্ধজনিত চাপ যুক্ত হলে তা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলবে।

কেন্দ্রীয় ব্যাংকের গভর্নর স্পষ্ট করে বলেছেন, রিজার্ভ এখনো ভালো অবস্থানে আছে। কিন্তু মূল্যস্ফীতি সন্তোষজনক নয়। এর অর্থ হলো, অর্থনীতির ভেতরে চাপ ইতোমধ্যেই তৈরি হয়েছে। সেই চাপের ওপর যদি নতুন বৈশ্বিক ধাক্কা আসে তবে তা সামাল দেওয়া কঠিন হবে।

আরেকটি গুরুত্বপূর্ণ দিক হলো কর্মসংস্থান। দেশে ইতোমধ্যে কর্মসংস্থানের সংকট রয়েছে। শিল্প ও উৎপাদন খাতে গতি কমে গেলে এই সংকট আরও বাড়বে। কারণ উৎপাদন ব্যাহত হলে নতুন কর্মসংস্থান তৈরি হয় না। বরং বিদ্যমান কর্মসংস্থানও ঝুঁকির মুখে পড়ে।

জ্বালানি আমদানি স্বাভাবিক রাখা এখন বড় চ্যালেঞ্জ। যুদ্ধের কারণে সরবরাহে বিঘ্ন ঘটলে উৎপাদন ও সরবরাহ চেইন ক্ষতিগ্রস্ত হবে। তখন শিল্প কারখানা থেকে শুরু করে পরিবহন পর্যন্ত সব খাতেই প্রভাব পড়বে। এর সরাসরি প্রতিফলন দেখা যাবে বাজারদরে।

বাংলাদেশের অর্থনীতির জন্য এই মুহূর্তে সবচেয়ে বড় প্রয়োজন প্রস্তুতি। শুধু পরিস্থিতি পর্যবেক্ষণ নয়। আগাম পরিকল্পনা নিতে হবে। বিকল্প জ্বালানি উৎস খুঁজতে হবে। সরবরাহ চেইন সচল রাখতে দ্রুত পদক্ষেপ নিতে হবে।

একই সঙ্গে বাজারে নজরদারি বাড়ানো জরুরি। সংকটের সুযোগ নিয়ে অসাধু চক্র যেন দাম বাড়াতে না পারে তা নিশ্চিত করতে হবে। অতীতে দেখা গেছে, বৈশ্বিক সংকটের তুলনায় দেশে দাম অনেক বেশি বেড়ে যায়। এই প্রবণতা রোধ করা না গেলে সাধারণ মানুষের ভোগান্তি আরও বাড়বে।

রাজস্ব ও মুদ্রানীতির মধ্যে সমন্বয়ও প্রয়োজন। মূল্যস্ফীতি নিয়ন্ত্রণে কেন্দ্রীয় ব্যাংকের পদক্ষেপের পাশাপাশি সরকারের বাজার ব্যবস্থাপনা শক্তিশালী করতে হবে। শুধু সুদের হার বাড়িয়ে সব সমস্যার সমাধান সম্ভব নয়।

সবচেয়ে বড় বিষয় হলো আস্থা। মানুষ যদি মনে করে সামনে আরও দাম বাড়বে, তবে তারা আগেভাগে কেনাকাটা শুরু করে। এতে বাজারে চাপ বাড়ে। মূল্যস্ফীতি আরও ত্বরান্বিত হয়। তাই সঠিক তথ্য দেওয়া এবং বাজারে স্থিতিশীলতার বার্তা নিশ্চিত করা জরুরি।

বাংলাদেশ একাধিক বৈশ্বিক সংকট মোকাবিলা করেছে। অভিজ্ঞতাও আছে। কিন্তু প্রতিবারই দেখা গেছে, প্রস্তুতির ঘাটতি থাকলে সংকট গভীর হয়। এবার সেই ভুলের পুনরাবৃত্তি যেন না হয়।

এখনই সময় বাস্তবতা বুঝে পদক্ষেপ নেওয়ার। যুদ্ধ থামানো বাংলাদেশের হাতে নেই। কিন্তু এর প্রভাব কমানোর দায়িত্ব অবশ্যই আছে। সঠিক পরিকল্পনা, কঠোর নজরদারি এবং সমন্বিত উদ্যোগই পারে এই নতুন মূল্যস্ফীতির চাপ সামাল দিতে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...