
বিশেষ প্রতিনিধি
ক্ষমতা মানেই ব্যস্ততা। সারাক্ষণ বৈঠক। ফাইল। ফোন। নিরাপত্তা। সময়ের টানাপড়েন। আর ক্ষমতা থেকে সরে দাঁড়ানো মানেই নতুন ছন্দ। কিছুটা থামা। কিছুটা শ্বাস নেওয়া। বাংলাদেশে অন্তর্বর্তী সরকারের প্রধান উপদেষ্টা হিসেবে দায়িত্ব পালন শেষে ড. মুহাম্মদ ইউনুস এখন সেই নতুন ছন্দেই দিন কাটাচ্ছেন।
দায়িত্ব ছাড়ার পর তাঁর জীবনযাত্রায় প্রথম যে পরিবর্তনটি চোখে পড়ে, তা হলো গতি কমেছে। কিন্তু কাজ থামেনি। কাজের ধরন বদলেছে। এখন আর রাষ্ট্রের প্রতিদিনের চাপ নেই। আছে ব্যক্তিগত সময়। আছে পুরোনো কাজের টানে ফিরে যাওয়ার সুযোগ। আছে পরিবারের কাছে থাকার অবকাশ।
দেশীয় এবং আন্তর্জাতিক গণমাধ্যমে প্রকাশিত নানা তথ্য থেকে বোঝা যায়, তিনি এখন তুলনামূলকভাবে শান্ত রুটিনে চলছেন। সকালটা শুরু হয় নিয়মিতভাবে। শরীরচর্চা বা হাঁটাহাঁটির মতো অভ্যাসকে গুরুত্ব দেন। এরপর দিনের কাজ গুছিয়ে নেন। দুপুরের পর সময়টা পরিবার ও ঘনিষ্ঠজনদের সঙ্গে কাটানোর সুযোগ হয়। সন্ধ্যায় আবার খানিকটা হাঁটাহাঁটি। রাতটা পরিবারের পাশে। মোট কথা, দিন এখন বেশি ব্যক্তিগত। কম প্রদর্শনমুখী।
ক্ষমতায় থাকলে দেখা-সাক্ষাৎ অনেক সীমিত থাকে। প্রোটোকল থাকে। নিরাপত্তার সীমা থাকে। সব মানুষের কাছে যাওয়ার সুযোগ থাকে না। ক্ষমতা ছাড়ার পর সে দেয়াল অনেকটা নরম হয়। এখন তিনি আগের তুলনায় বেশি মানুষের সঙ্গে কথা বলছেন। কেউ দেখা করতে আসছেন। কেউ শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। কেউ নিজের অভিজ্ঞতা বলছেন। এমন সময় একজন রাষ্ট্রপ্রধানের ব্যস্ততার বাইরে থাকা মানুষটাকেও দেখা যায়। একজন শিক্ষক। একজন সমাজচিন্তক। একজন উদ্যোগী মানুষ।
এই সময় আরও একটি বিষয় চোখে পড়ে। গুজব। ভুয়া ছবি। বানানো খবর। রাজনৈতিক পালাবদলের পর এমনটা প্রায়ই ঘটে। তাই ড. ইউনুস কোথায় আছেন, কী করছেন এসব নিয়ে সামাজিক মাধ্যমে যা-ই বলা হোক, যাচাই ছাড়া বিশ্বাস করা ঠিক নয়। দায়িত্বের সময়ের মতোই, দায়িত্ব-পরবর্তী সময়েও সত্যকে আলাদা করে দেখা জরুরি।
ড. ইউনুসের ভবিষ্যৎ কাজ নিয়ে আলোচনা আছে। তিনি রাজনীতির স্থায়ী খেলোয়াড় নন। তাঁর মূল পরিচয় সামাজিক ব্যবসা, দারিদ্র্য কমানোর চিন্তা, কর্মসংস্থান এবং মানুষের সম্ভাবনাকে কাজে লাগানোর দর্শন। দায়িত্ব শেষে তাঁর সেই পুরোনো কর্মক্ষেত্র আবার সামনে আসছে। ইউনুস সেন্টার, সামাজিক ব্যবসার নেটওয়ার্ক, আন্তর্জাতিক পরিসরের কাজ। এগুলোতে তিনি আবার সক্রিয় হতে পারেন। তাঁর ঘনিষ্ঠজনদের কথাবার্তায় এমন ইঙ্গিতও আসে যে তিনি নতুন করে কাজ সাজাতে চান।
তবে তাঁর দায়িত্বকাল নিয়ে বিতর্কও থাকবে। কেউ বলবেন, কঠিন সময় সামলাতে তিনি ভূমিকা রেখেছেন। কেউ বলবেন, কিছু জায়গায় আরও দ্রুত সিদ্ধান্ত দরকার ছিল। কেউ বলবেন, কিছু সিদ্ধান্ত ছিল কঠোর। কেউ বলবেন, আরও কঠোর হওয়া দরকার ছিল। এই মতভেদ স্বাভাবিক। কারণ অন্তর্বর্তী সময় মানেই চাপের সময়। ঝুঁকির সময়। সিদ্ধান্তের সময়। এমন সময়ে সব পক্ষকে সন্তুষ্ট করা যায় না।
এখন তিনি আর রাষ্ট্রক্ষমতার কেন্দ্রে নেই। তিনি আবার নিজের পরিচয়ে ফিরছেন। একজন অধ্যাপক। একজন নোবেলজয়ী। একজন সামাজিক উদ্যোগের মানুষ। তাঁর দিনগুলো তাই এখন বেশি শান্ত। বেশি পরিকল্পনামুখী। পরিবারের ছায়া আছে। মানুষের ভিড় আছে। আছে ভবিষ্যৎ কাজের নতুন তালিকা।
ক্ষমতার পরে কারও জীবন থেমে যায় না। শুধু বদলে যায়। ড. ইউনুসের জীবনও বদলেছে। এখন তার গতি কম। কিন্তু দৃষ্টি দূরে। কাজের ভাবনা গভীর। আর সময়টা- নিজের মতো করে বাঁচার সময়।
এপি, দ্য গার্ডিয়ান, দ্য ইকোনমিক টাইমস, হিন্দুস্তান টাইমস ও দ্য ডেইলি স্টার অবলম্বনে।





