
আলী কদর পলাশ
ঢাকা–দিল্লি সম্পর্ককে অনেকেই এখন “জমে থাকা বরফ” বলছেন। উপমাটা ঠিক আছে। বরফ গলে জল হয়। জলই আবার জীবনের পথ খুলে দেয়। কিন্তু বরফ যদি হঠাৎ গলে যায়, বন্যাও হতে পারে। তাই ধীরে, নিয়ন্ত্রিত গলন দরকার। আর সেই গলনের তাপ হতে হবে ন্যায্যতা, সম্মান আর স্বার্থের ভারসাম্য।
গত দেড় বছরে দূরত্ব বেড়েছে। অবিশ্বাসও বেড়েছে। বাংলাদেশে ২০২৪ সালের বড় রাজনৈতিক অস্থিরতার পর সম্পর্কটা আরও ঠান্ডা হয়। এখন নির্বাচনের পর নতুন সরকার দায়িত্ব নিয়েছে, এবং নতুন নেতৃত্ব শপথও নিয়েছে। এই বদলের মুহূর্তে দু’দেশই নতুন করে হিসাব কষছে। ভারতও রিসেট চাইছে। এমন আলোচনাও আন্তর্জাতিক পর্যায়ে আছে।

কিন্তু প্রশ্ন হলো, এই স্বাভাবিকতা কেমন হবে। শুধু কাগজে-কলমে হাসিমুখ কূটনীতি হলে হবে না। মানুষের ক্ষোভের জায়গাগুলো না ছুঁলে বরফ আবার জমে যাবে। সীমান্তে প্রাণহানি, তিস্তা চুক্তির অচলাবস্থা, বাণিজ্যে দীর্ঘদিনের ভারসাম্যহীনতা, ভিসা জটিলতা এসবই সাধারণ মানুষের অভিজ্ঞতা। এসবই জনমতকে শক্ত করে। এসবই সম্পর্কের তাপমাত্রা কমায়।
নতুন পররাষ্ট্র প্রতিমন্ত্রী শামা ওবায়েদ যে কথা বলেছেন, সেটি তাই গুরুত্বপূর্ণ। তিনি বলেছেন, সব দেশের সঙ্গে সম্পর্ক থাকবে, তবে তা হবে সমতা ও মর্যাদার ভিত্তিতে। “মেরুদণ্ড সোজা করে” যোগাযোগ রাখবে বাংলাদেশ। এই অবস্থান প্রতিবেশী সম্পর্কেও প্রযোজ্য। সমতা মানে শত্রুতা নয়। সমতা মানে আত্মসম্মান। সমতা মানে দরকষাকষিতে ন্যায্যতা।
এখন দরকার কয়েকটি স্পষ্ট কাজ।
প্রথমত, সীমান্তে জীবন সুরক্ষা। কথার আগে কাজ। সীমান্তে শূন্য হত্যা এটা কূটনৈতিক লক্ষ্য হিসেবে ঘোষণা হতে পারে। যৌথ নজরদারি, দ্রুত তদন্ত, দায় নির্ধারণ, ক্ষতিপূরণ এগুলো বাস্তব পদক্ষেপ।
দ্বিতীয়ত, পানি নিয়ে বিশ্বাস ফেরানো। তিস্তা শুধু একটি নদী নয়। এটি উত্তরাঞ্চলের কৃষি, কর্মসংস্থান, সামাজিক স্থিতির প্রশ্ন। অগ্রাধিকার তালিকায় তিস্তা থাকবে। এই রাজনৈতিক বার্তাই বরফ গলানোর বড় শর্ত।
তৃতীয়ত, বাণিজ্যে ভারসাম্য ও বাজারে প্রবেশাধিকার। বাংলাদেশ ভারতের বড় বাজার। ভারতও বাংলাদেশের জন্য বড় অংশীদার। কিন্তু সম্পর্ক “বড়–ছোট” মানসিকতায় চললে ভারসাম্য আসে না। শুল্ক-অশুল্ক বাধা, বন্দরে জট, মান নিয়ন্ত্রণের জটিলতা এসব কমাতে সময়বদ্ধ পরিকল্পনা দরকার।
চতুর্থত, ভিসা ও মানুষ-মানুষ যোগাযোগ। চিকিৎসা, শিক্ষা, ব্যবসা এসব কারণে মানুষ ভোগান্তিতে পড়ে। সহজ, স্বচ্ছ, মানবিক ভিসা ব্যবস্থাই জনমনে স্বস্তি ফেরাতে পারে।
পঞ্চমত, ভূরাজনীতি নিয়ে সংযত বাস্তববাদ। দক্ষিণ এশিয়ায় চীন–ভারত প্রতিযোগিতা বাস্তব। বাংলাদেশকে এখানে “কারও বিপক্ষে” নয়, “নিজের পক্ষে” দাঁড়াতে হবে। একদিকে উন্নয়ন ও বিনিয়োগ। অন্যদিকে নিরাপত্তা ও আঞ্চলিক স্থিতি। ভারসাম্যই বুদ্ধিমত্তা।
সবশেষে, আমাদের মনে রাখতে হবে, প্রতিবেশীর সঙ্গে সম্পর্ক শ্লোগানে টেকে না। টেকে নিয়মিত সংলাপে। টেকে অমীমাংসিত ইস্যুতে সাহসী কথায়। টেকে মানুষের অভিজ্ঞতা বদলালে।
ঢাকা–দিল্লির বরফ যদি সত্যিই গলতে শুরু করে, সেটি ভালো খবর। তবে সেই গলন যেন একতরফা না হয়। যেন কেবল উপরে উষ্ণতা আর নিচে কাঁপুনি না থাকে। সমতার তাপে, পারস্পরিক মর্যাদার আলোয়, বাস্তব সমস্যার সমাধানে- বরফ গলুক। জল হোক। সেতু হোক।





