বার্ন ইনস্টিটিউটে ‘দীপুর দাপট’, পরিচালককে ঘিরে গুরুতর অভিযোগ

Date:

spot_img

অনুমোদিত পদ নিয়ে প্রশ্ন, টেন্ডার ও কেনাকাটায় অস্বাভাবিক দর, পণ্য না পেয়েও বিল পরিশোধের অভিযোগ; এ এম জেডের সম্পৃক্ততা অস্বীকার করলেও প্রচারপত্রে রোগী দেখার সময়

নাসির উদ্দিন লিটন ও সিরাজুম মনিরা

জাতীয় বার্ন ও প্লাস্টিক সার্জারি ইনস্টিটিউটে নিয়োগ, কেনাকাটা, টেন্ডার, রোগী রেফার এবং প্রশাসনিক কার্যক্রম ঘিরে গুরুতর অনিয়মের অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের কেন্দ্রে রয়েছেন ইনস্টিটিউটের পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন এবং মো. তোফায়েল আহমেদ দীপু নামে এক ব্যক্তি। অভিযোগকারীদের দাবি, গাড়িচালক হিসেবে পরিচিত দীপু বর্তমানে পরিচালকের ‘ব্যক্তিগত সহকারী’ বা ‘পিএস টু’ পরিচয়ে ইনস্টিটিউটের বিভিন্ন প্রশাসনিক ও ক্রয় কার্যক্রমে প্রভাব বিস্তার করছেন। তবে এমন কোনো অনুমোদিত পদ ইনস্টিটিউটের জনবল কাঠামোয় রয়েছে কি না, তা নিয়ে প্রশ্ন উঠেছে।

অভিযোগগুলো অস্বীকার করেছেন পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন। তিনি বলেছেন, তাঁর ও দীপুর বিরুদ্ধে আনা অভিযোগ মিথ্যা, ভিত্তিহীন ও উদ্দেশ্যপ্রণোদিত।

দীপুর পদ কোথায়

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, দীপু প্রথমে গাড়িচালক হিসেবে ইনস্টিটিউটে কাজ শুরু করেন। পরে তিনি পরিচালকের ব্যক্তিগত সহকারী হিসেবে পরিচয় দিতে শুরু করেন। তাঁর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের পরিচয়েও এমন তথ্য রয়েছে বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

ইনস্টিটিউটের কয়েকজন চিকিৎসকের দাবি, দীপু সরকারি কর্মচারী নন, আবার অনুমোদিত আউটসোর্সিং জনবলের তালিকাতেও তাঁর নাম নেই। এরপরও তাঁকে ইনস্টিটিউটের ভেতরে ডেস্ক, কম্পিউটার ও দাপ্তরিক সুবিধা দেওয়ার অভিযোগ রয়েছে।

২০২৫ সালের ২৭ আগস্ট তৎকালীন স্বাস্থ্য উপদেষ্টার কাছে দেওয়া একটি অভিযোগে বলা হয়, আউটসোর্সিংয়ের নামে চালক পদে আসা দুই ব্যক্তি কার্যত পরিচালকের ঘনিষ্ঠ সহযোগী হিসেবে কাজ করছেন। তাদের একজন দীপু। অভিযোগে নিয়োগ, কেনাকাটা ও কর্মচারীদের ওপর প্রভাব বিস্তারের কথাও উল্লেখ করা হয়।

১৯ হাজার টাকার কর্মচারীর নামে বিলাসবহুল গাড়ি

অভিযোগকারীদের সরবরাহ করা তথ্য অনুযায়ী, দীপুর বেতন প্রায় ১৯ হাজার টাকা। অথচ তাঁর নামে একটি মিতসুবিশি এক্সপান্ডার গাড়ি থাকার তথ্য পাওয়া গেছে। গাড়িটির নম্বর ঢাকা মেট্রো ঘ ১৬-৭৪১৪ বলে দাবি করা হয়েছে।

গাড়িটির মালিকানা ও কেনার অর্থের উৎস তদন্তের দাবি জানিয়েছেন অভিযোগকারীরা।

আলট্রাসনোগ্রাম মেশিনের দামে বড় ব্যবধানের অভিযোগ

ইনস্টিটিউটের সাম্প্রতিক কেনাকাটাও প্রশ্নের মুখে পড়েছে। অভিযোগ অনুযায়ী, দুটি আলট্রাসনোগ্রাম মেশিন কেনার ক্ষেত্রে প্রতিটির মূল্য দেখানো হয়েছে ১ কোটি ৪২ লাখ টাকা।

অভিযোগকারী চিকিৎসকদের দাবি, একই ধরনের মেশিন ভ্যাট, ট্যাক্স ও আনুষঙ্গিক খরচসহ প্রায় ৬৫ লাখ টাকার মধ্যে কেনা সম্ভব। অনলাইনে সংশ্লিষ্ট মডেলের আরও কম মূল্য দেখা যায় বলেও তাদের দাবি।

২০২৫ ২৬ অর্থবছরের আরও কিছু পণ্য বাজারদরের তুলনায় তিন থেকে চার গুণ এবং কোনো কোনো ক্ষেত্রে ছয় থেকে সাত গুণ বেশি দামে কেনা হয়েছে বলেও অভিযোগ উঠেছে। এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে দরপত্র, কার্যাদেশ, আমদানি মূল্য ও বাজারদর পাশাপাশি পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

বার্ন হাসপাতালে গাইনি ওষুধ কেন

দরপত্রের চাহিদা নিয়েও প্রশ্ন তুলেছেন চিকিৎসকেরা। একটি নথিতে আরগোটামিন ১১ হাজার পিস এবং বাটারফ্লাই নিডেল ১ লাখ ৬০ হাজার পিস চাওয়া হয়েছে বলে অভিযোগ।

ইনস্টিটিউটের একজন চিকিৎসকের দাবি, আরগোটামিন মূলত প্রসূতি ও স্ত্রীরোগসংক্রান্ত চিকিৎসায় ব্যবহৃত হয় এবং বার্ন চিকিৎসায় এর নিয়মিত প্রয়োজন নেই। একইভাবে বাটারফ্লাই নিডেলের প্রয়োজন যেখানে কয়েক হাজার, সেখানে এক লাখ ৬০ হাজার পিস কেন চাওয়া হলো, সেই প্রশ্নও তুলেছেন তারা।

অভিযোগকারীদের ভাষ্য, সাপ্তাহিক বৈঠকে এ নিয়ে আপত্তি তোলা হলেও তা আমলে নেওয়া হয়নি।

পণ্য না পেয়েও ২৩ কোটি টাকা বিলের অভিযোগ

সবচেয়ে গুরুতর অভিযোগগুলোর একটি হলো, সম্পূর্ণ মালামাল সরবরাহের আগেই ঠিকাদারকে বিল পরিশোধ।

সংশ্লিষ্ট সূত্রের দাবি, প্রায় ৪০ কোটি টাকার মালামাল সরবরাহের কার্যাদেশ পাওয়া একটি প্রতিষ্ঠান নির্ধারিত সময়ের মধ্যে প্রায় ১৭ কোটি টাকার মালামাল দেয়। কিন্তু অর্থবছরের বরাদ্দ ফেরত যাওয়ার আশঙ্কার কথা বলে বাকি পণ্য হাতে না পেয়েই প্রায় ২৩ কোটি টাকা পরিশোধ করা হয়।

পরে আরও প্রায় ১০ কোটি টাকার পণ্য সরবরাহ করা হলেও প্রায় ১৩ কোটি টাকার পণ্য এখনো পাওয়া যায়নি বলে অভিযোগকারীদের দাবি।

এই লেনদেনের প্রকৃত অবস্থা যাচাইয়ে কার্যাদেশ, চালান, স্টোর রিসিভ নথি, বিল ভাউচার ও ব্যাংক লেনদেন পরীক্ষা প্রয়োজন বলে সংশ্লিষ্টরা জানিয়েছেন।

এ এম জেডের সঙ্গে সম্পর্ক অস্বীকার, প্রচারপত্র বলছে রোগী দেখেন

পরিচালক অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীন এ এম জেড হাসপাতালের সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা নেই বলে দাবি করেছেন।

তবে এ এম জেড হাসপাতালের একটি প্রকাশিত প্রচারপত্রে তাঁর ছবি, নাম ও পেশাগত পরিচয়সহ রোগী দেখার সময় উল্লেখ রয়েছে। সেখানে বলা হয়েছে, তিনি প্রতি সোমবার বিকেল ৫টা থেকে রাত ৮টা পর্যন্ত এ এম জেড হাসপাতালে রোগী দেখেন।

ফলে চিকিৎসক হিসেবে ওই হাসপাতালে তাঁর রোগী দেখার তথ্য হাসপাতালটির নিজস্ব প্রচারপত্রেই রয়েছে। তবে এ প্রচারপত্র দিয়ে হাসপাতালটির মালিকানা বা শেয়ারে তাঁর অংশীদারত্ব প্রমাণ হয় না।

অভিযোগকারীদের দাবি, ডা. নাসির উদ্দীনের এ এম জেড হাসপাতালে আর্থিক স্বার্থ রয়েছে এবং জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউট থেকে রোগী ওই হাসপাতালে পাঠানো হয়। এই দুটি অভিযোগের সত্যতা স্বাধীনভাবে নিশ্চিত করা সম্ভব হয়নি।

সরকারি ডিউটির সময় বেসরকারি হাসপাতালে রোগী দেখার অভিযোগ

আরও অভিযোগ রয়েছে, জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটে দায়িত্ব পালনের সময়ও পরিচালক এ এম জেড হাসপাতালে গিয়ে রোগী দেখেছেন।

এই অভিযোগ যাচাই করতে সংশ্লিষ্ট তারিখের সরকারি ডিউটি রোস্টার, হাজিরা, এ এম জেড হাসপাতালের সিরিয়াল ও রোগী দেখার রেকর্ড মিলিয়ে দেখা প্রয়োজন।

একইভাবে জাতীয় বার্ন ইনস্টিটিউটের কোনো রোগীকে এ এম জেড হাসপাতালে রেফার করা হয়েছে কি না, তা জানতে রোগীর নথি ও রেফারেল রেকর্ড পরীক্ষা করা প্রয়োজন।

কোম্পানির অর্থে বিদেশ সফরের অভিযোগ

২০২৪ সালের শেষ দিকে যুক্তরাজ্যের বার্মিংহামে একটি বার্নবিষয়ক সম্মেলনে ডা. নাসির উদ্দীনের অংশগ্রহণের খরচ একটি ওষুধ কোম্পানি বহন করেছিল বলেও অভিযোগ রয়েছে।

অভিযোগকারীরা বলছেন, পরবর্তীতে ওই কোম্পানির আমদানি করা ‘ফ্লামিনাল’ নামের একটি পণ্য হাসপাতালে ব্যবহারে উৎসাহ দেওয়া হয় এবং তা কেনাকাটার তালিকায়ও যুক্ত হয়। ‘লিভিসিকা’ নামের আরেকটি পণ্য নিয়েও একই ধরনের অভিযোগ রয়েছে।

কোম্পানি অর্থায়িত বিদেশ সফর এবং পরবর্তী সরকারি ক্রয়ের মধ্যে কোনো স্বার্থের সংঘাত ছিল কি না, তা সংশ্লিষ্ট অনুমতিপত্র, স্পনসরশিপ নথি এবং ক্রয়সংক্রান্ত কাগজপত্র যাচাই ছাড়া নিশ্চিত হওয়া সম্ভব নয়।

চিকিৎসকদের অভিযোগ স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে

ইনস্টিটিউটের চিকিৎসক ও সংশ্লিষ্টদের একটি অংশ ইতোমধ্যে স্বাস্থ্য মন্ত্রণালয়ে লিখিত অভিযোগ দিয়েছেন। তাদের প্রধান দাবির মধ্যে রয়েছে দীপুর নিয়োগ ও সরকারি সম্পদ ব্যবহারের বৈধতা তদন্ত, তাঁর কথিত পদ কে অনুমোদন করেছে তা নির্ধারণ, তাঁর সম্পৃক্ততার সময়কার সব ক্রয় কার্যক্রমের নিরীক্ষা এবং তদন্তে সাক্ষ্য দিতে আগ্রহীদের চাকরিগত সুরক্ষা নিশ্চিত করা।

তাদের দাবি, আগেও একাধিকবার অভিযোগ দেওয়া হয়েছিল। কিন্তু কার্যকর তদন্ত হয়নি। বরং অভিযোগকারীদের কয়েকজনকে অন্যত্র সরিয়ে দেওয়া হয়েছে বলেও তারা অভিযোগ করেছেন।

সব অভিযোগ অস্বীকার পরিচালকের

অধ্যাপক ডা. মোহাম্মদ নাসির উদ্দীনের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলে তিনি তাঁর বিরুদ্ধে এবং দীপুকে ঘিরে উত্থাপিত অভিযোগগুলো সম্পূর্ণ মিথ্যা ও ভিত্তিহীন বলে দাবি করেন।

তিনি এ এম জেড হাসপাতালের সঙ্গে তাঁর কোনো ধরনের সম্পৃক্ততা থাকার অভিযোগও অস্বীকার করেছেন।

তবে এ এম জেড হাসপাতালের প্রচারপত্রে তাঁর রোগী দেখার সময় উল্লেখ থাকার বিষয়ে এবং নিয়োগ, দরপত্র, পণ্য সরবরাহ ও অর্থ পরিশোধসংক্রান্ত প্রতিটি অভিযোগের পৃথক ব্যাখ্যা পাওয়া যায়নি।

জাতীয় একটি বিশেষায়িত চিকিৎসা প্রতিষ্ঠানের নিয়োগ, সরকারি অর্থের ব্যবহার এবং রোগী ব্যবস্থাপনা নিয়ে ওঠা এসব অভিযোগের সত্যতা নির্ধারণে এখন প্রয়োজন সংশ্লিষ্ট নথিপত্রের পূর্ণাঙ্গ পরীক্ষা ও স্বাধীন তদন্ত।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...