হুমকির কাছে সংস্কৃতি মাথা নত করবে না

Date:

spot_img

আলী কদর পলাশ

একটি ভুলের জন্য ক্ষমা চাওয়া সুন্দর। কিন্তু হুমকির ছায়ায় যখন ক্ষমা আসে, তখন সেই ক্ষমার চেয়েও বড় হয়ে ওঠে একটি প্রশ্ন: মানুষটি ভুল বুঝে ফিরে এলেন, নাকি চাপের কাছে পিছু হটলেন?

হাসনাত আবদুল্লাহকে ঘিরে এখন সেই প্রশ্নই সামনে।

জাতীয় সংসদে দাঁড়িয়ে তিনি ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় কনসার্ট বন্ধ হওয়া, গান বাজনা এবং সাংস্কৃতিক পরিসর সংকুচিত হওয়ার প্রসঙ্গ তুলেছিলেন। বক্তব্যের কিছু তথ্য যে নির্ভুল ছিল না, পরে তিনি নিজেই তা স্বীকার করেছেন। বিশেষ করে নৌকাবাইচের স্থান উল্লেখে তাঁর ভুল ছিল। ভুল সংশোধন অবশ্যই প্রয়োজন।

কিন্তু ঘটনাটি শুধু তথ্য সংশোধনে থামেনি।

হাসনাতের বক্তব্যের পর মুফতি রহমতুল্লাহ কাসেমী তাঁকে অত্যন্ত কঠোর ভাষায় আক্রমণ করেন। ‘শাহবাগী’ হওয়ার চেষ্টা এবং জুলাইয়ের সঙ্গে ‘গাদ্দারি’র অভিযোগও তোলা হয়। এরপর ‘শিশুবক্তা’ হিসেবে পরিচিত রফিকুল ইসলাম মাদানী সরাসরি হুঁশিয়ারি দেন: বক্তব্য প্রত্যাহার করে দুঃখ প্রকাশ না করলে ব্রাহ্মণবাড়িয়ায় হাসনাত কোনো কর্মসূচি করতে পারবেন না। একই সময়ে কওমি ছাত্র ঐক্য পরিষদও ঘোষণা দেয়, ক্ষমা না চাইলে এনসিপির কর্মসূচি প্রতিহত করা হবে।

এটি আর নিছক মতের প্রতিবাদ থাকে না।

একজন সংসদ সদস্যের বক্তব্যের জবাব বক্তব্যে হবে, তথ্যের জবাব তথ্য দিয়ে হবে। কিন্তু কোনো জেলায় তাঁর রাজনৈতিক কর্মসূচি করতে দেওয়া হবে না, এ ঘোষণা গণতান্ত্রিক প্রতিবাদের ভাষা নয়। এটি চাপের ভাষা।

আর ঘটনাটিকে আরও তাৎপর্যপূর্ণ করে হাসনাতের নিজের একটি কথোপকথন। আলেম আবদুর রহিম আল মাদানীর ভাষ্য অনুযায়ী, শনিবার সকালে হাসনাত তাঁকে ফোন করেছিলেন। কথোপকথনে হাসনাত নিজেই আশঙ্কা প্রকাশ করেন, এখন দুঃখ প্রকাশ করলে অন্য পক্ষ বলতে পারে তিনি ‘ডানপন্থীদের চাপে’ অবস্থান পরিবর্তন করেছেন।

অর্থাৎ প্রশ্নটি আমাদের কল্পনা নয়। চাপের এই ব্যাখ্যার আশঙ্কা তাঁর নিজের মনেও ছিল।

এরপরই আসে দুঃখ প্রকাশ।

আমরা বলতে পারি না, হাসনাত মৌলবাদের ভয়েই পিছু হটেছেন। মানুষের মনের ভেতর ঢুকে সিদ্ধান্ত দেওয়ার অধিকার সাংবাদিকতার নেই। তাঁর বক্তব্যে সত্যিই তথ্যগত ভুল ছিল, ব্যাখ্যার প্রয়োজনও ছিল। কিন্তু তাঁর বক্তব্যের পর হুঁশিয়ারি, মধ্যরাতের বিক্ষোভ, দলীয় কর্মসূচি প্রতিহতের ঘোষণা এবং তার পরপরই অবস্থান ব্যাখ্যা ও দুঃখ প্রকাশ, এই ধারাবাহিকতাও উপেক্ষা করা যায় না।

এখানেই আমাদের আপত্তি।

ক্ষমা চাওয়া একজন মানুষের অধিকার; হুমকি দিয়ে ক্ষমা আদায় কোনো গোষ্ঠীর অধিকার নয়।

আজ বিষয়টি গান। কাল হয়তো নাটক। পরশু বই। তারপর পোশাক, ছবি, চলচ্চিত্র কিংবা মানুষের জীবনযাপন। রাষ্ট্র একবার যদি শিখে যায়, যে পক্ষ বেশি উত্তপ্ত হতে পারে তার কাছেই সরে দাঁড়াতে হবে, তবে আইনের জায়গা ধীরে ধীরে দখল করে নেয় ভয়।

বাংলাদেশ সেই পথে যেতে পারে না।

কেউ গান শুনবেন, কেউ ওয়াজ শুনবেন। কেউ কনসার্টে যাবেন, কেউ মাহফিলে। মাদ্রাসার শিক্ষার্থীর পড়াশোনায় উচ্চ শব্দে ব্যাঘাত ঘটলে প্রতিবাদ হবে, আইন ব্যবস্থা নেবে। কিন্তু তার সমাধান কনসার্টে হামলা নয়। একইভাবে ধর্মীয় সমাবেশ কারও পছন্দ নয় বলে সেটিও বন্ধ করে দেওয়া যাবে না।

আইন সবার জন্য একই হতে হবে।

এর সঙ্গে জীবিকার প্রশ্নও আছে। কনসার্ট বন্ধ হলে শুধু শিল্পীর মঞ্চ হারায় না। গিটারের দোকানে ক্রেতা কমে, স্টুডিও নীরব হয়, সাউন্ড ও আলোর কর্মীরা কাজ হারান, মঞ্চ নির্মাতা ও পরিবহনকর্মীর আয় কমে। সাম্প্রতিক প্রতিবেদনে বাদ্যযন্ত্র ব্যবসায়ীরা বিক্রি ৬০ শতাংশ পর্যন্ত কমে যাওয়ার কথাও বলেছেন।

সংস্কৃতি তাই শুধু গান নয়; সংস্কৃতিরও একটি অর্থনীতি আছে।

আর বাংলাদেশের আত্মাও আছে।

এই মাটিতে আজানের পাশে একতারা বেজেছে। নজরুল হামদ লিখেছেন, শ্যামাসংগীতও লিখেছেন। মসজিদ, মন্দির, মাহফিল, যাত্রা, কবিতা, গান, সব মিলিয়েই বাংলাদেশ।

হাসনাত ভুল করলে তাঁর সমালোচনা হোক। তথ্য ভুল হলে সংশোধন হোক। কিন্তু একজন নির্বাচিত জনপ্রতিনিধিকে বলা হবে, ক্ষমা না চাইলে এই জেলায় ঢুকে কর্মসূচি করতে পারবেন না, এই সংস্কৃতি আরও বিপজ্জনক।

কারণ আজ একজন রাজনীতিক মাথা নিচু করলে কাল একজন শিল্পী করবেন, পরশু একজন লেখক।

তারপর একদিন হয়তো সমাজটাই কথা বলার আগে চারদিকে তাকাবে।

সেই বাংলাদেশ আমরা চাই না। হুমকির কাছে সংস্কৃতি মাথা নত করবে না।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...