খুলনার ৭০ শতাংশ বেসরকারি ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টার ছাড়পত্র ছাড়াই চলছে

Date:

spot_img

খুলনা প্রতিনিধি

খুলনা নগরীর বিপুলসংখ্যক বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন ও পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়াই
চালিয়ে যাচ্ছে। সংশ্লিষ্ট দপ্তরের তথ্য অনুযায়ী, নগরীতে অনুমোদিত ২৯৬টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মধ্যে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৪৯টির। অর্থাৎ প্রায় ৮৩ শতাংশ প্রতিষ্ঠানেরই পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই। একই সঙ্গে শতাধিক প্রতিষ্ঠানে নেই মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনার যথাযথ ব্যবস্থা।

এ অবস্থায় এসব প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল বর্জ্য যত্রতত্র ফেলা ও সাধারণ বর্জ্যের সঙ্গে মিশে যাওয়ায় পরিবেশ ও জনস্বাস্থ্য নিয়ে উদ্বেগ দেখা দিয়েছে। অন্যদিকে, নিয়মিত লাইসেন্স নবায়ন না হওয়ায় সরকারও রাজস্ব থেকে বঞ্চিত হচ্ছে।

খুলনা বিভাগীয় স্বাস্থ্য পরিচালকের দপ্তর ও পরিবেশ অধিদপ্তর সূত্রে জানা যায়, নগরীতে বর্তমানে ২৯৬টি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের অনুমোদিত তালিকা রয়েছে। এর মধ্যে ২০২৫ সালে মাত্র ৮৯টি প্রতিষ্ঠানের লাইসেন্স নবায়ন হয়েছে। অন্যগুলোর লাইসেন্স এর আগের বিভিন্ন বছরে নবায়ন করা হয়েছে। তবে পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র রয়েছে মাত্র ৪৯টির।

সংশ্লিষ্ট কর্মকর্তারা জানান, ১৯৮২ সালের বাংলাদেশ মেডিকেল প্র্যাকটিস অ্যান্ড প্রাইভেট ক্লিনিকস অ্যান্ড ল্যাবরেটরিজ (রেগুলেশন) অর্ডিন্যান্স অনুযায়ী বৈধ লাইসেন্স ছাড়া কোনো বেসরকারি হাসপাতাল, ক্লিনিক বা ল্যাবরেটরি পরিচালনার সুযোগ নেই। নির্ধারিত সময়ের মধ্যে লাইসেন্স নবায়ন করাও বাধ্যতামূলক। নিয়ম লঙ্ঘন করলে সংশ্লিষ্ট প্রতিষ্ঠানের বিরুদ্ধে প্রশাসনিক ও আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার বিধান রয়েছে।

তবে অভিযোগ রয়েছে, লাইসেন্স পাওয়ার সময় বিভিন্ন শর্ত পূরণ করলেও পরবর্তী সময়ে অনেক প্রতিষ্ঠান এসব শর্ত মানছে না। ফলে নিয়মিত লাইসেন্স নবায়নও করতে পারছে না তারা। অনেক প্রতিষ্ঠানে নেই প্রয়োজনীয় জনবল ও নিজস্ব বর্জ্য ব্যবস্থাপনা ব্যবস্থা। বিভিন্ন সময়ে পরিদর্শন করে এসব প্রতিষ্ঠানকে সতর্ক করা হলেও পরিস্থিতির খুব একটা উন্নতি হয়নি।

খুলনা পরিবেশ অধিদপ্তরের জেলা কার্যালয়ের এক কর্মকর্তা জানান, নগরীর প্রায় ৭০ শতাংশ বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনায় দুর্বলতা রয়েছে। মাত্র ৪৯টি প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র রয়েছে। অন্য প্রতিষ্ঠানগুলোকে সতর্ক করা হচ্ছে এবং ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।
তিনি বলেন, মেডিকেল বর্জ্যের মধ্যে থাকা রক্ত, ব্যবহৃত সুঁই ও বিভিন্ন রাসায়নিক পদার্থ যথাযথভাবে ধ্বংস করা না হলে রোগ সংক্রমণের ঝুঁকি বাড়ে। একই সঙ্গে এসব বর্জ্য মাটি ও বায়ু দূষণের কারণ হতে পারে। তাই প্রতিষ্ঠানগুলোকে পরিবেশগত আইন ও নির্ধারিত মানদণ্ডের আওতায় আনা জরুরি।

সরেজমিনে নগরীর কয়েকটি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার ঘুরে এবং সংশ্লিষ্টদের সঙ্গে কথা বলে জানা যায়, মেডিকেল বর্জ্য আলাদাভাবে সংরক্ষণ ও অপসারণের জন্য বিভিন্ন রঙের নির্দিষ্ট পাত্র ব্যবহারের নির্দেশনা থাকলেও অনেক প্রতিষ্ঠান তা যথাযথভাবে মানছে না। কোথাও কোথাও মেডিকেল বর্জ্য সাধারণ বাসাবাড়ির বর্জ্যের সঙ্গে পরিবহন করা হচ্ছে। আবার কোনো কোনো প্রতিষ্ঠান ড্রামে করে মেডিকেল বর্জ্য শহরের সেকেন্ডারি বর্জ্য স্টেশনে ফেলে দিচ্ছে।
এসব বর্জ্যের মধ্যে রয়েছে রোগীর রক্ত সংগ্রহের পাত্র, তুলা, গজ-ব্যান্ডেজ, ব্যবহৃত সুঁই-সিরিঞ্জ, অপারেশনের বর্জ্য ও বিভিন্ন মেডিকেল সরঞ্জাম। ফলে এসব বর্জ্য যথাযথভাবে ব্যবস্থাপনা না করলে পরিচ্ছন্নতাকর্মীসহ সাধারণ মানুষের স্বাস্থ্যঝুঁকি তৈরি হতে পারে।

নগরীর বেসরকারি ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মেডিকেল বর্জ্য সংগ্রহে কাজ করছে স্বদিচ্ছা ও প্রদিপন নামের দুটি প্রতিষ্ঠান। স্বদিচ্ছা খুলনা সিটি করপোরেশনের ১ থেকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ড এবং প্রদিপন ১৯ থেকে ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রতিষ্ঠানগুলোর বর্জ্য সংগ্রহ করে।
স্বদিচ্ছায় কর্মরত জীবন কৃষ্ণ কর বলেন, ১ থেকে ১৮ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ৪৬টি প্রতিষ্ঠানের মেডিকেল বর্জ্য তারা সংগ্রহ করেন। তবে এসব প্রতিষ্ঠানের তুলনায় বাসাবাড়ির বর্জ্যের পরিমাণ বেশি।

প্রদিপনের কর্মী ফেরদৌসুর রহমান বলেন, ১৯ থেকে ৩১ নম্বর ওয়ার্ডের প্রায় ১৩৬টি প্রতিষ্ঠানের বর্জ্য তারা সংগ্রহ করেন। প্রতিষ্ঠানগুলো নিজস্ব ব্যবস্থাপনায় বর্জ্য সংরক্ষণ করে রাখে এবং তাদের কর্মীরা সেগুলো সংগ্রহ করেন। শুক্রবার ছাড়া প্রতিদিনই বর্জ্য অপসারণের কাজ চলে।
পরিবেশ আন্দোলন খুলনা জেলার সমন্বয়কারী ও নাগরিক সমাজের সদস্য সচিব অ্যাডভোকেট বাবুল হাওলাদার বলেন, পরিবেশ অধিদপ্তরের ছাড়পত্র ছাড়া ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টার পরিচালনার বিষয়টি অত্যন্ত উদ্বেগজনক। শর্ত পূরণ না করেও কীভাবে এসব প্রতিষ্ঠান কার্যক্রম পরিচালনার সুযোগ পাচ্ছে, সেটিও খতিয়ে দেখা দরকার।

তিনি বলেন, নগরীর সব ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারকে নিয়মিত মনিটরিংয়ের আওতায় এনে আইন মেনে পরিচালনা নিশ্চিত করতে হবে। তা না হলে কয়েকটি প্রতিষ্ঠানের অব্যবস্থাপনার কারণে পুরো নগরীর স্বাস্থ্য ও পরিবেশগত নিরাপত্তা হুমকির মুখে পড়তে পারে।
খুলনা জেলা পরিবেশ অধিদপ্তরের সহকারী পরিচালক মো. হারুন-অর-রশীদ বলেন, সব ডায়াগনস্টিক সেন্টার ও ক্লিনিক পরিদর্শনের আওতায় আনা হচ্ছে। যেসব প্রতিষ্ঠানের পরিবেশগত ছাড়পত্র নেই, তাদের ছাড়পত্র নেওয়ার জন্য বলা হচ্ছে।

এদিকে খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের একজন কর্মকর্তা নাম প্রকাশ না করার শর্তে জানান, সরকারি তালিকায় থাকা প্রতিষ্ঠানের সংখ্যা প্রকৃত সংখ্যার চেয়ে কম হতে পারে। নগরীতে ক্লিনিক ও ডায়াগনস্টিক সেন্টারের সংখ্যা প্রায় সাড়ে তিনশোর কাছাকাছি। অনেক প্রতিষ্ঠান শুধু আবেদন করেই কার্যক্রম চালিয়ে যাচ্ছে, যা নিয়মসঙ্গত নয়।

তিনি আরও জানান, সম্প্রতি স্বাস্থ্য প্রশাসনে রদবদলের পর আগের সময়ের কিছু গুরুত্বপূর্ণ নথি পাওয়া যাচ্ছে না। এ কারণে প্রকৃত প্রতিষ্ঠানের তালিকা নতুন করে প্রস্তুতের কাজ চলছে। পাশাপাশি অনুমোদন ও প্রয়োজনীয় ছাড়পত্র ছাড়া পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো মনিটরিং করে কার্যক্রম বন্ধের নির্দেশ দেওয়ার উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে।

খুলনা স্বাস্থ্য বিভাগের পরিচালক ডা. শেখ মো. মোশাররফ হোসেনের বক্তব্য জানতে একাধিকবার যোগাযোগের চেষ্টা করা হলেও তাকে পাওয়া যায়নি। লিখিতভাবে বক্তব্য চাওয়া হলেও প্রতিবেদন লেখা পর্যন্ত তার কোনো বক্তব্য পাওয়া যায়নি।

জনস্বাস্থ্য বিশেষজ্ঞ ও পরিবেশ সংশ্লিষ্টদের মতে, ক্লিনিক-ডায়াগনস্টিক সেন্টারের মতো স্বাস্থ্যসেবা প্রতিষ্ঠানে লাইসেন্স, পরিবেশগত ছাড়পত্র ও মেডিকেল বর্জ্য ব্যবস্থাপনা নিশ্চিত করা অত্যন্ত জরুরি। তাই নিয়ম না মেনে পরিচালিত প্রতিষ্ঠানগুলো চিহ্নিত করে দ্রুত আইনগত ব্যবস্থার আওতায় আনার পাশাপাশি নিয়মিত তদারকি জোরদার করা প্রয়োজন

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...