‎পরিবার আছে, পাসপোর্ট আছে—তবু পাঁচ বছর ধরে রংপুর মেডিকেলের হিমঘরে পড়ে আছে ভারতীয় নাগরিকের মরদেহ

Date:

spot_img


‎রংপুর ব্যুরো

‎পরিবার আছে, পরিচয় আছে, এমনকি আছে ভারতীয় পাসপোর্টও। তবু জীবনের শেষ ঠিকানায় পৌঁছাতে পারেননি ভারতীয় নাগরিক প্রবীর মণ্ডল। মৃত্যুর প্রায় পাঁচ বছর পেরিয়ে গেলেও তাঁর মরদেহ এখনো রংপুর মেডিকেল কলেজ (রমেক) হাসপাতালের হিমঘরে নম্বরবন্দি অবস্থায় পড়ে আছে। স্বজনদের অনাগ্রহ, সীমান্ত ও কূটনৈতিক জটিলতা এবং প্রয়োজনীয় প্রশাসনিক সিদ্ধান্তের দীর্ঘসূত্রতায় আটকে আছে তাঁর শেষকৃত্যের বিষয়টিও। হৃদয়স্পর্শী এই ঘটনা ভারতের পশ্চিমবঙ্গের উত্তর ২৪ পরগনা জেলার নিমচা মৈত্রী স্ট্রিটের এম আলম বাজার এলাকার বাসিন্দা প্রবীর মণ্ডলের। মৃত্যুর সময় তাঁর বয়স ছিল ৪১ বছর। তাঁর বাবার নাম মহাদেব মণ্ডল। সংশ্লিষ্ট সূত্রে জানা গেছে, ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর থেকে প্রবীর মণ্ডলের মরদেহ রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের মর্গের হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। দীর্ঘ এই সময়ে মরদেহটি পরিবারের কাছে হস্তান্তর করা সম্ভব হয়নি। একই সঙ্গে আইনি ও প্রশাসনিক অনুমোদন ছাড়া মরদেহের সৎকারও করা যাচ্ছে না। পুলিশ, হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ ও স্থানীয় প্রশাসনের পক্ষ থেকে একাধিকবার পরিবারের সঙ্গে যোগাযোগ করা হলেও তারা মরদেহ গ্রহণে আগ্রহ দেখায়নি বলে জানিয়েছে সংশ্লিষ্টরা। বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়ের মাধ্যমে ভারতীয় কর্তৃপক্ষকেও জানানো হয়েছে। তবে এখন পর্যন্ত মরদেহ হস্তান্তর কিংবা সৎকারের বিষয়ে চূড়ান্ত কোনো সিদ্ধান্ত হয়নি। ফলে প্রায় পাঁচ বছর ধরে একটি মরদেহ হিমঘরে সংরক্ষিত থাকায় নানা প্রশ্নও উঠেছে।

‎### ফেসবুকে পরিচিত নারী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে এসে মৃত্যু

‎মামলার নথি ও পুলিশ সূত্রে জানা যায়, ২০২১ সালের নভেম্বর মাসে ফেসবুকে পরিচিত এক নারী বন্ধুর সঙ্গে দেখা করতে ঢাকা থেকে লালমনিরহাটের পাটগ্রাম উপজেলার দহগ্রামে যান প্রবীর মণ্ডল। সেখানে আজিজুল ইসলাম নামে এক ব্যক্তির বাড়িতে অবস্থানকালে হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়েন তিনি। পরে স্থানীয়রা তাঁকে পাটগ্রাম উপজেলা স্বাস্থ্য কমপ্লেক্সে নিয়ে গেলে কর্তব্যরত চিকিৎসক তাঁকে মৃত ঘোষণা করেন। এ ঘটনায় পাটগ্রাম থানায় একটি অপমৃত্যুর মামলা করা হয়। পরে মৃত্যুর কারণ নির্ধারণে ময়নাতদন্তের জন্য মরদেহটি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালে পাঠানো হয়। ২০২১ সালের ১০ নভেম্বর প্রবীর মণ্ডলের মরদেহের ময়নাতদন্তের জন্য একটি মেডিকেল লিগ্যাল বোর্ড গঠন করা হয়। এরপর থেকেই মরদেহটি রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে।

‎### পোশাকেই মিলেছিল ভারতীয় পাসপোর্ট

‎মৃত্যুর পর প্রবীর মণ্ডলের পোশাক তল্লাশি করে একটি ভারতীয় পাসপোর্ট উদ্ধার করা হয়। পাসপোর্টের তথ্য অনুযায়ী, তিনি ২০১৭ সালের ৩ মার্চ তিন মাসের ভ্রমণ ভিসায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন। পরে ২০১৮ সালের ১৬ মার্চ বেনাপোল সীমান্ত দিয়ে তিনি ভারতে ফিরে যান। তবে এরপর কীভাবে তিনি পুনরায় বাংলাদেশে প্রবেশ করেছিলেন, সে বিষয়ে মামলার নথিতে স্পষ্ট কোনো তথ্য পাওয়া যায়নি। তাঁর বাংলাদেশে দ্বিতীয়বার প্রবেশের বিষয়টিও তদন্তের পরিধিতে থাকলেও এখন পর্যন্ত এ নিয়ে পরিষ্কার কোনো তথ্য সামনে আসেনি।

‎### পচন ধরেছিল মরদেহে, তবু মেলেনি সমাধান

‎লালমনিরহাট জেলা পুলিশের বিশেষ শাখা থেকে ২০২২ সালের ১৪ ডিসেম্বর বাংলাদেশ পুলিশ সদর দফতরে পাঠানো একটি চিঠিতে উল্লেখ করা হয়, ততদিনে মরদেহে পচন শুরু হয়েছিল। একই চিঠিতে বিজিবির মাধ্যমে বিএসএফের সঙ্গে পতাকা বৈঠক করে মরদেহ ভারতে হস্তান্তরের উদ্যোগ নেওয়ার কথাও জানানো হয়। কিন্তু সেই উদ্যোগ শেষ পর্যন্ত বাস্তবায়ন হয়নি। এরই মধ্যে কেটে গেছে প্রায় পাঁচ বছর। দীর্ঘ সময় হিমঘরে সংরক্ষিত থাকলেও প্রবীর মণ্ডলের মরদেহের গন্তব্য এখনো অনিশ্চিত।

‎### পরিবারকে একাধিকবার জানানো হলেও সাড়া নেই

‎পাটগ্রাম থানার ভারপ্রাপ্ত কর্মকর্তা (ওসি) রমজান আলী বলেন, প্রবীর মণ্ডলের পরিবারের সঙ্গে একাধিকবার যোগাযোগ করা হয়েছে। তবে তারা এখন পর্যন্ত মরদেহ গ্রহণে আগ্রহ দেখাননি। তিনি বলেন, “বিষয়টি পররাষ্ট্র মন্ত্রণালয়কে জানানো হয়েছে। সেখান থেকে সিদ্ধান্ত এলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। প্রবীর মণ্ডলের ছোট ভাই সুবীর মণ্ডলের সঙ্গেও এখনো যোগাযোগ রাখা হচ্ছে। তবে পরিবারের পক্ষ থেকে মরদেহ নিতে আগ্রহ দেখানো হয়নি। পুলিশের এই বক্তব্যে স্বজনদের অনাগ্রহের বিষয়টি স্পষ্ট হলেও, কেন পরিবার মরদেহ নিতে চাইছে না—সে বিষয়ে কোনো বিস্তারিত তথ্য জানা যায়নি।

‎### হাসপাতালের হিমঘরে বছরের পর বছর

‎রংপুর মেডিকেল কলেজ হাসপাতালের হিমঘরের দায়িত্বপ্রাপ্ত কর্মকর্তা দুলাল বসুনিয়া বলেন, প্রবীর মণ্ডলের মরদেহ এখনো হিমঘরে সংরক্ষিত রয়েছে। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশনা পাওয়া গেলে ধর্মীয় রীতিনীতি অনুযায়ী মরদেহের সৎকার কিংবা প্রয়োজনীয় কর্তৃপক্ষের কাছে হস্তান্তরের ব্যবস্থা করা হবে। তিনি বলেন, “আমরা শুধু মরদেহ সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করছি। ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের নির্দেশ পাওয়া গেলে পরবর্তী ব্যবস্থা নেওয়া হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষের ভাষ্য, এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি মরদেহ হিমঘরে সংরক্ষণ করা তাদের জন্যও একটি অস্বাভাবিক ও অনাকাঙ্ক্ষিত পরিস্থিতি। রমেক হাসপাতালের উপ-পরিচালক আব্দুল মোকাদ্দেম বলেন, চিকিৎসকদের পর্যবেক্ষণ অনুযায়ী হৃদযন্ত্রের ক্রিয়া বন্ধ হয়ে প্রবীর মণ্ডলের মৃত্যু হয়েছিল। মৃত্যুর পর থেকেই মরদেহটি হিমঘরে রাখা হয়েছে। তিনি আরও বলেন, পুলিশের অনুরোধেই মরদেহটি সংরক্ষণ করা হয়। পুলিশ যখন প্রয়োজন মনে করবে, তখনই মরদেহ হস্তান্তর করা হবে। হাসপাতাল কর্তৃপক্ষ কেবল সংরক্ষণের দায়িত্ব পালন করছে। বিষয়টি নিয়ে প্রশাসনকে চিঠিও দেওয়া হয়েছে। তবে এখনো কার্যকর কোনো সমাধান হয়নি। এত দীর্ঘ সময় ধরে একটি মরদেহ হিমঘরে পড়ে থাকা কোনোভাবেই কাম্য নয়, বলেন তিনি।

‎### মৃতেরও কি নেই শেষ ঠিকানা?

‎প্রবীর মণ্ডলের মরদেহের দীর্ঘ পাঁচ বছর হিমঘরে পড়ে থাকার ঘটনায় মানবিক ও মানবাধিকার প্রশ্নও সামনে এসেছে। একটি মৃতদেহকে এত দীর্ঘ সময় ধরে অনিশ্চয়তায় রেখে দেওয়া কতটা যুক্তিসংগত—এ নিয়ে প্রশ্ন তুলেছেন নাগরিক সমাজের প্রতিনিধিরা। সুশাসনের জন্য নাগরিক—সুজন রংপুর জেলা সভাপতি খন্দকার ফখরুল আনাম বেঞ্জু বলেন, বাংলাদেশের নীতি-রীতি অনুযায়ী মরদেহটির সৎকার করা অত্যন্ত জরুরি ছিল। তিনি বলেন, “একজন মৃত ব্যক্তিরও মানবাধিকার রয়েছে। দীর্ঘদিন ধরে মরদেহটি পড়ে থাকায় সেই মানবিক অধিকার লঙ্ঘিত হয়েছে। একজন মৃত ব্যক্তির সৎকারের দায়িত্ব রাষ্ট্রকে নিতে হয়—আন্তর্জাতিক মানবাধিকার নীতি ও বাংলাদেশের সংবিধানের আলোচনাতেও এর ভিত্তি রয়েছে। সরকারের উচিত ছিল বিষয়টিকে আরও গুরুত্ব দিয়ে সময়মতো একটি সমাধানে পৌঁছানো। তিনি আরও বলেন, পরিবার যদি মরদেহ গ্রহণে অনাগ্রহী হয়, তাহলে আইন, প্রশাসনিক প্রক্রিয়া ও মানবিক দিক বিবেচনায় নিয়ে রাষ্ট্রীয় উদ্যোগে সৎকারের বিষয়ে দ্রুত সিদ্ধান্ত নেওয়া প্রয়োজন।

‎### করোনাকালের সীমান্ত জটিলতার প্রভাব

‎রংপুরের জেলা প্রশাসক রুহুল আমিন বলেন, প্রবীর মণ্ডলের মৃত্যুর সময় দেশে-বিদেশে করোনাভাইরাস মহামারির প্রভাব ছিল। সে সময় দুই দেশের সীমান্তে কঠোর বিধিনিষেধও কার্যকর ছিল। এ কারণে ভারতীয় কর্তৃপক্ষ সম্ভবত তখন মরদেহ গ্রহণে আগ্রহী হয়নি। তবে বর্তমান পরিস্থিতিতে পরিবারের অনাগ্রহের বিষয়টিও বিবেচনায় নেওয়া হচ্ছে বলে জানান তিনি। জেলা প্রশাসক বলেন, ঊর্ধ্বতন কর্তৃপক্ষের সঙ্গে আলোচনা করে বিষয়টির একটি সমাধানের চেষ্টা চলছে। যেহেতু পরিবার মরদেহটি নিতে চাচ্ছে না, তাই সংশ্লিষ্ট সবার সম্মতি ও পরিবারের অনাপত্তির পরিপ্রেক্ষিতে রাষ্ট্রীয়ভাবে মরদেহটির সৎকারের ব্যবস্থা করার বিষয়টি বিবেচনা করা হচ্ছে।

‎### পাঁচ বছরেও হয়নি শেষ পরিণতি

‎প্রবীর মণ্ডলের জীবনের শেষ অধ্যায় শুরু হয়েছিল লালমনিরহাটের পাটগ্রামে অসুস্থ হয়ে পড়ার মধ্য দিয়ে। এরপর মামলা, ময়নাতদন্ত, পুলিশি তদন্ত, প্রশাসনিক যোগাযোগ, সীমান্ত ও কূটনৈতিক প্রক্রিয়া—সবকিছু পেরিয়েও তাঁর মরদেহ আজও পৌঁছাতে পারেনি নিজ পরিবারের কাছে। পোশাকে পাওয়া পাসপোর্ট তাঁর পরিচয় নিশ্চিত করেছে, নথিতে রয়েছে তাঁর নাম-ঠিকানা, পরিবারের সদস্যদের সন্ধানও মিলেছে। কিন্তু তবুও শেষ বিদায়ের আনুষ্ঠানিকতা সম্পন্ন হয়নি। ২০২১ সালের ৮ নভেম্বর থেকে ২০২৬ সাল—দীর্ঘ এই সময়ে রংপুর মেডিকেল কলেজের হিমঘরে একটি নম্বর হয়ে পড়ে আছে একজন মানুষের মরদেহ। জীবিত অবস্থায় যাঁর ছিল পরিবার, পরিচয় ও স্বজন; মৃত্যুর পর তাঁর জন্যও যেন নির্ধারিত হয়নি শেষ ঠিকানা। এখন সংশ্লিষ্টদের প্রত্যাশা, মানবিক ও প্রশাসনিক দিক বিবেচনায় নিয়ে দ্রুত একটি চূড়ান্ত সিদ্ধান্ত নেওয়া হবে, যাতে দীর্ঘ পাঁচ বছরের এই অনিশ্চয়তার অবসান ঘটে এবং প্রবীর মণ্ডল শেষ পর্যন্ত পান তাঁর প্রাপ্য শেষ বিদায়।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...