একই দিনে সবার জন্মদিন, তবু কারও জন্মদিন জানা নেই

Date:

spot_img


রয়টার্স অবলম্বনে আলী কদর পলাশ

কক্সবাজারের রোহিঙ্গা শরণার্থীশিবিরে নতুন বছরের প্রথম দিনটি অনেকের জন্য আলাদা। দিনটি তাদের জন্মদিন হিসেবেও লেখা আছে। হাজার হাজার মানুষের পরিচয়পত্রে জন্মতারিখ একটাই। সেটি হলো ১ জানুয়ারি।

ক্যাম্প-৭–এ থাকা মোহাম্মদ ফারুক ১ জানুয়ারির সকালে ঘুম থেকে ওঠেন। তাঁর মোবাইলে ফেসবুকের শত শত নোটিফিকেশন আসে। সবাই তাঁকে জন্মদিনের শুভেচ্ছা জানাচ্ছেন। একই দিন তাঁর স্ত্রীর জন্মদিনও। একই দিন তাঁর ভাইবোনদের জন্মদিনও। তাঁর বাবা-মায়ের জন্মদিনও ওই দিনেই। এমনকি তাঁর ঘনিষ্ঠ বন্ধুর জন্মদিনও ওই একই দিনে। ক্যাম্পের অনেক মানুষের ক্ষেত্রেই একই ঘটনা।

ফারুক আগের রাতে একটি পোস্ট করেছিলেন। তিনি সবাইকে শুভেচ্ছা জানিয়েছেন। সঙ্গে রসিকতা করে বলেছেন, সবাইকে আলাদা করে শুভেচ্ছা জানানো সম্ভব হবে না। তাই আগেই ক্ষমা চেয়ে নিয়েছেন।

রোহিঙ্গাদের বড় অংশের প্রকৃত জন্মতারিখ জানা নেই। তাদের অনেকের জন্ম মিয়ানমারের রাখাইনে হয়েছে। সেখানে জন্মনিবন্ধন ছিল খুব কঠিন। রোহিঙ্গাদের ওপর নানা ধরনের বিধিনিষেধ ছিল। নাগরিক অধিকারও ছিল সীমিত। ফলে বেশিরভাগ মানুষের কাছে কোনো সরকারি কাগজপত্র ছিল না।

২০১৭ সালে সহিংসতার পর তারা বাংলাদেশে পালিয়ে আসে। তখন দ্রুত নিবন্ধনের প্রয়োজন হয়। লাখ লাখ মানুষকে পরিচয়পত্র দিতে হয়। সেই সময় অনেকের জন্মতারিখ হিসেবে ১ জানুয়ারি লেখা হয়। এটি একটি ‘ডিফল্ট’ তারিখ হয়ে যায়। জাতিসংঘের নথিতে সেই তারিখই থেকে যায়।

এই তারিখ শুধু কাগজের বিষয় নয়। এটি রোহিঙ্গাদের হারানো পরিচয়ের কথাও মনে করিয়ে দেয়। জন্মদিন মানুষের জীবনের ব্যক্তিগত স্মৃতি। এটি পরিবার ও শেকড়ের সঙ্গে জড়িত। কিন্তু যখন সবাই একই দিনে জন্মায়, তখন আলাদা ইতিহাস হারিয়ে যায়। মানুষ যেন এক ধরনের সংখ্যায় পরিণত হয়।

ক্যাম্পে জন্মদিনের আয়োজন খুব সীমিত। তবু ১ জানুয়ারি কিছুটা ভিন্ন পরিবেশ তৈরি হয়। কেউ চা ভাগাভাগি করেন। কেউ সামান্য মিষ্টি দেন। শিশুদের জন্য ছোটখাটো আনন্দের চেষ্টা থাকে। আবার অনেকের চোখে এটি আনন্দের দিন নয়। এটি তাদের হারানোর কথাই বেশি মনে করিয়ে দেয়।

সহায়তা সংস্থাগুলো বলছে, নিবন্ধনের কাজ এখন আগের চেয়ে উন্নত। বায়োমেট্রিক তথ্যও রাখা হচ্ছে। পরিবারের তথ্যও সংগ্রহ করা হচ্ছে। কিন্তু জন্মতারিখ নিশ্চিত করা এখনও কঠিন। কারণ অনেকের কাছে প্রমাণ করার মতো কোনো দলিল নেই। অনেকের স্মৃতিও স্পষ্ট নয়। তাই পরিচয়পত্রে ১ জানুয়ারি থেকে যাচ্ছে।

কক্সবাজারের ক্যাম্পে তাই এক অদ্ভুত বাস্তবতা দেখা যায়। নতুন বছরের দিন হাজার মানুষের জন্মদিন। শুভেচ্ছার ভিড়। কিন্তু সেই ভিড়ের ভেতর একটি শূন্যতা আছে। তাদের প্রকৃত জন্মদিন হারিয়ে গেছে। তাদের অতীত হারিয়ে গেছে। ১ জানুয়ারি তাদের কাছে শুধু জন্মদিন নয়। এটি হারানো পরিচয়ের একটি চিহ্ন।

৬ জানুয়ারি ২০২৬
ধানমন্ডি, ঢাকা।

লেখক : সম্পাদক ও প্রকাশক দৈনিক এই আমার দেশ, THE BUSINESS in Magazine, প্রধান সম্পাদক দৈনিক মুখপাত্র

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

বাচসাসের নতুন নেতৃত্ব নির্বাচনে ভোট ২০ নভেম্বর

এম.আর.জে শান্ত: বাংলাদেশ চলচ্চিত্র সাংবাদিক সমিতির (বাচসাস) ২০২৬-২০২৮ মেয়াদের...

কমিশনার মামুনের পিতার মৃত্যুতে দোয়া মাহফিল

ঢাকা দক্ষিণ সিটি করপোরেশনের সাবেক কাউন্সিলর ও বংশাল থানা...

আগামী তিন বছরে এক লাখ স্বাস্থ্যকর্মী নিয়োগ দেওয়া হবে: ড. জিয়াউদ্দিন হায়দার

বাগেরহাট প্রতিনিধি আগামী তিন বছরের মধ্যে দেশে এক লাখ নতুন...

খুলনায় ফুটপাত দখলমুক্ত করতে কেসিসির অভিযান, ভাঙা হলো অবৈধ দোকানপাট

খুলনা প্রতিনিধি খুলনা নগরীর ফুটপাত অবৈধ দখলমুক্ত করতে উচ্ছেদ...