অতিবৃষ্টিতে খুলনা অঞ্চলের কৃষিতে বড় ধাক্কা: ৮ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত, ফসলহানি প্রায় সাড়ে ৪ কোটি টাকা

Date:

spot_img

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো

শ্রাবণের শুরুতেই টানা অতি বৃষ্টিতে খুলনা বিভাগের চার জেলায় কৃষিতে নেমে এসেছে বড় ধরনের বিপর্যয়। আউস ধান, আমনের বীজতলা থেকে শুরু করে বিভিন্ন মৌসুমি সবজি ও পানক্ষেত পানিতে তলিয়ে গিয়ে মাঠেই পচে গেছে। এতে প্রায় ৮ হাজার কৃষক ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছেন। কৃষি বিভাগের হিসাবে ৩৮৬ হেক্টর জমির ফসলের ক্ষতি হয়েছে, যার আর্থিক মূল্য প্রায় ৪ কোটি ৪৯ লাখ ৯০ হাজার টাকা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর সূত্র জানায়, ক্ষতিগ্রস্ত জেলা চারটি হলো খুলনা, বাগেরহাট, সাতক্ষীরা ও নড়াইল। চলতি মাসের ৯ থেকে ১২ জুলাই পর্যন্ত খুলনায় ৫৪.৫ মিলিমিটার, বাগেরহাটে ৪০.৪১ মিলিমিটার, সাতক্ষীরায় ৪১.৮২ মিলিমিটার এবং নড়াইলে ২৪.৯৯ মিলিমিটার বৃষ্টিপাত রেকর্ড করা হয়। টানা এই বৃষ্টির প্রভাবে মাঠে পানি জমে ফসল নষ্ট হয়।

সবচেয়ে বেশি ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে বাগেরহাট জেলা। সেখানে প্রায় চার হাজার মহাজন চাষি, বর্গাচাষি ও প্রান্তিক কৃষক লোকসানের মুখে পড়েছেন। অন্যদিকে নড়াইলে প্রায় ২ হাজার ৪৬৮ জন কৃষক ক্ষতির শিকার হয়েছেন। জেলা কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের তথ্যমতে, নড়াইলেই প্রায় ২ কোটি টাকার ফসল নষ্ট হয়েছে।

ক্ষতির তালিকায় রয়েছে আউস ধান, আমনের বীজতলা, তরমুজ, কাঁচামরিচ, পান, ঢেঁড়স, পুঁইশাক, ঝিঙে, উচ্ছে, বেগুন, করোলাসহ বিভিন্ন গ্রীষ্মকালীন সবজি। ক্ষতিগ্রস্ত উপজেলার মধ্যে রয়েছে খুলনার তেরখাদা, পাইকগাছা, ডুমুরিয়া, বটিয়াঘাটা, ফুলতলা, দিঘলিয়া ও দাকোপ; বাগেরহাট সদর, ফকিরহাট, মোল্লাহাট, কচুয়া, মোরেলগঞ্জ, শরণখোলা ও চিতলমারী; নড়াইল সদর, লোহাগড়া ও কালিয়া; এবং সাতক্ষীরা সদর উপজেলা।

কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর, খুলনা অঞ্চলের অতিরিক্ত পরিচালক মো. রফিকুল ইসলাম মহাপরিচালকের দপ্তরে পাঠানো প্রতিবেদনে উল্লেখ করেছেন, এ অঞ্চলে মোট ১৩ হাজার ৩২০ হেক্টর জমিতে চাষ হওয়া বিভিন্ন ফসলের মধ্যে ৩৮৬ হেক্টর ক্ষতিগ্রস্ত হয়েছে। মাঠে পচে যাওয়া ফসলের বাজারমূল্য প্রায় ৪ কোটি ৪৯ লাখ টাকা।

অতিবৃষ্টির প্রভাব পড়েছে স্থানীয় বাজারেও। দিনমজুরের মজুরি বেড়েছে, অনেক সবজির দাম প্রতি কেজিতে ১৫ থেকে ২০ টাকা পর্যন্ত বৃদ্ধি পেয়েছে। ডুমুরিয়া ও বটিয়াঘাটা থেকে সবজি পরিবহনে ভ্যান ও ট্রলির ভাড়া প্রায় দেড়গুণ বেড়েছে। তবে ক্ষতির মুখে অনেক কৃষক বাধ্য হয়ে কম দামে বেগুন, পটলসহ বিভিন্ন সবজি বিক্রি করেছেন। কৃষি বিভাগের আশঙ্কা, এই বৃষ্টির কারণে শীতকালীন সীম, লাউ ও টমেটো বাজারে আসতেও বিলম্ব হবে।

এদিকে অতিবৃষ্টির কারণে সাতক্ষীরা পৌরসভা ও সদর উপজেলার বিস্তীর্ণ এলাকায় ভয়াবহ জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। কামালনগর, ইটাগাছা, মধুমল্লারডাঙ্গী, বদ্দীপুর কলোনি, মধ্যকাটিয়া, রইচপুর, রাজারবাগান ও পুরাতন সাতক্ষীরাসহ বিভিন্ন এলাকায় ঘরবাড়ি ও সড়ক পানিতে তলিয়ে যাওয়ায় জনজীবন বিপর্যস্ত হয়ে পড়েছে। অনেক পরিবার রান্নাবান্না করতে পারছে না, সাপ ও পোকামাকড়ের উপদ্রবও বেড়েছে।

সাতক্ষীরা নাগরিক অধিকার উন্নয়ন কমিটির সহ-সভাপতি ডা. আবুল কালাম বাবলা বলেন, “জলাবদ্ধতা নিরসনে খালগুলো দ্রুত খনন করতে হবে। পাশাপাশি যত্রতত্র পানি আটকে মাছ চাষ বন্ধ এবং খালের নেট-পাটা অপসারণ না করলে এ সমস্যার স্থায়ী সমাধান হবে না।”

কৃষি সংশ্লিষ্টরা বলছেন, দ্রুত ক্ষতিগ্রস্ত কৃষকদের পুনর্বাসন, কৃষি প্রণোদনা এবং জলাবদ্ধতা নিরসনে কার্যকর পদক্ষেপ না নিলে চলতি মৌসুমে কৃষি উৎপাদনে আরও নেতিবাচক প্রভাব পড়তে পারে।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...