
আলী কদর পলাশ
প্রিয় পাঠক,
বড় স্টেডিয়ামের আলো তখনো তার জন্য নয়। গ্যালারিতে হাজার মানুষের চিৎকারও তখন পরিচিত হয়ে ওঠেনি। পায়ের কাছে বল এলেই পৃথিবী থমকে দাঁড়াবে—এমন কোনো নামও তখন তার ছিল না।
সে ছিল প্যারিসের উপকণ্ঠ বন্ডির এগারো বছরের একটি ছেলে।
নাম কিলিয়ান এমবাপ্পে।
বন্ডির সেই ছোট্ট ছেলেটির জীবনে ফুটবল এসেছিল হাঁটতে শেখার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই। তিন বছর বয়সে বাবা তাকে একটি ছোট বৈদ্যুতিক খেলনা গাড়ি কিনে দিয়েছিলেন। সেই গাড়িতে চেপে সে বাড়ির সামনের ফুটবল মাঠে যেত। নিজেকে ভাবত পেশাদার ফুটবলার। যেন অনুশীলনে যাচ্ছে কোনো বড় ক্লাবে।
কিন্তু মাঠে পৌঁছানোর পর খেলনা গাড়িটির কথা আর মনে থাকত না। সেটি এক পাশে পড়ে থাকত। তার চোখ খুঁজত শুধু বল।
কারণ বলটাই ছিল তার পৃথিবী।
বন্ডি ধনী মানুষের এলাকা ছিল না। সেখানে বড় বড় বাড়ি ছিল না। স্বপ্নকে বাস্তব করে দেওয়ার মতো সুযোগও ছিল সামান্য। কিন্তু স্বপ্ন দেখতে কোনো টাকা লাগে না। তাই ছোট্ট এমবাপ্পের ঘরের দেয়াল ভরে উঠেছিল জিনেদিন জিদান আর ক্রিশ্চিয়ানো রোনালদোর ছবিতে।
সে শুধু তাদের মতো খেলতে চাইত না। একদিন তাদের জায়গায় নিজেকে দেখতে চাইত।
কিন্তু স্বপ্ন যত বড়ই হোক, এগারো বছরের একটি শিশু শেষ পর্যন্ত শিশুই।
সেদিন ছিল বুধবার। ‘কুপ ৯৩’ নামের একটি প্রতিযোগিতার সেমিফাইনাল। ম্যাচটি হচ্ছিল গাগনির একটি বড় স্টেডিয়ামে। এর আগে এত বড় মাঠে, এত মানুষের সামনে কখনো খেলেনি এমবাপ্পে।
মাঠে নামার আগে তার বুক কাঁপছিল।
চারপাশে মানুষের শব্দ। গ্যালারি থেকে ভেসে আসছে চিৎকার। প্রতিটি চোখ যেন তার দিকেই তাকিয়ে আছে। যে ছেলেটি পাড়ার মাঠে বল পেলে সবাইকে পেছনে ফেলে ছুটত, সেই ছেলেটিই হঠাৎ থেমে গেল।
ভয়ে তার পা জমে গিয়েছিল।
সে দৌড়াতে পারছিল না। বল কাছে এলেও এগিয়ে যেতে পারছিল না। পুরো ম্যাচে প্রায় অদৃশ্য হয়ে রইল।
খেলা শেষে মাথা নিচু করে মাঠে দাঁড়িয়ে ছিল এমবাপ্পে। হয়তো ভেবেছিল, খারাপ খেলার জন্য মা তাকে বকবেন। হয়তো বলবেন, সে সুযোগ নষ্ট করেছে। দলের জন্য কিছু করতে পারেনি।
তার মা ফাইজা লামারি মাঠে নেমে এলেন।
কাছে এসে ছেলের দুই কান ধরে ফেললেন।
কিন্তু খারাপ খেলার জন্য নয়।
তিনি রাগ করেছিলেন, কারণ তার ছেলে ভয় পেয়েছিল।
মা বললেন, এই দিনের কথা সে সারাজীবন মনে রাখবে। ব্যর্থ হলেও নিজের ওপর বিশ্বাস রাখতে হবে। একজন খেলোয়াড় ষাটটি গোলের সুযোগ নষ্ট করতে পারে। তাতে পৃথিবী শেষ হয়ে যায় না। কিন্তু ভয়ে যদি সে খেলতেই না চায়, সেই আফসোস তাকে সারাজীবন তাড়া করে বেড়াবে।
কথাগুলো ছিল কঠিন।
কিন্তু কখনো কখনো মায়ের কঠিন কথার ভেতরেই সন্তানের জন্য সবচেয়ে কোমল ভালোবাসা লুকিয়ে থাকে।
সেদিন মা ছেলেকে সান্ত্বনা দেননি। বলেননি, তুমি ছোট, ভয় পাওয়া স্বাভাবিক। তিনি তাকে শিখিয়েছিলেন—ভয় পাওয়া অপরাধ নয়, কিন্তু ভয়ের কাছে নিজেকে সমর্পণ করা যায় না।
এমবাপ্পে পরে লিখেছেন, মায়ের সেই কথাগুলো তাকে বদলে দিয়েছিল। এরপর ফুটবল মাঠে আর কখনো ভয় পাননি তিনি।
সম্ভবত সেদিনই নতুন এক এমবাপ্পের জন্ম হয়েছিল।
যে ছেলেটি আর ভুলকে ভয় পায় না।
যে ছেলেটি জানে, গোলের সুযোগ নষ্ট হতে পারে। দর্শক সমালোচনা করতে পারে। দল হেরে যেতে পারে। কিন্তু ভয়ের কারণে চেষ্টা না করার চেয়ে বড় পরাজয় আর নেই।
তারপর জীবন দ্রুত বদলে যেতে থাকে।
এগারো বছর বয়সেই সে লন্ডনে গিয়ে চেলসির যুবদলের সঙ্গে অনুশীলনের সুযোগ পায়। বন্ধুদের কাছে ফিরে এসে যখন বলেছিল, সে দিদিয়ের দ্রগবার সঙ্গে দেখা করেছে, কেউ বিশ্বাস করতে চায়নি। বাবার ফোনে ছবি দেখানোর পর বন্ধুরা অবাক হয়ে শুধু বলেছিল, তাদেরও যেন সঙ্গে নিয়ে যায়।
সেই বন্ধুরা ঈর্ষা করেনি। তারা এমবাপ্পের চোখ দিয়ে নিজেদের স্বপ্নও দেখতে শুরু করেছিল।
চৌদ্দতম জন্মদিনের আগে এলো আরও বড় বিস্ময়। রিয়াল মাদ্রিদ থেকে ডাক পড়ল। জিদান নিজে তাকে দেখতে চেয়েছেন।
যে ছেলেটির ঘরের দেয়ালে জিদানের ছবি ছিল, একদিন সেই জিদানই তাকে নিজের গাড়িতে করে অনুশীলন মাঠে নিয়ে গেলেন। গাড়িতে ওঠার আগে বিস্মিত এমবাপ্পে জিজ্ঞেস করেছিল, জুতা খুলে উঠতে হবে কি না।
কারণ সেটি ছিল জিদানের গাড়ি।
আর সে তখনো বন্ডির সেই সাধারণ ছেলেটি, যে নিজের স্বপ্নের ভেতর হঠাৎ সত্যি সত্যি প্রবেশ করে ফেলেছে।
কয়েক বছর পর রাশিয়া বিশ্বকাপে ফ্রান্সের হয়ে মাঠে নামার আগে টানেলে দাঁড়িয়ে এমবাপ্পে পাশে থাকা উসমান দেম্বেলেকে বলেছিলেন, তাদের দিকে তাকাতে। একজন এসেছে এভরো থেকে। অন্যজন বন্ডি থেকে। অথচ তারা এখন বিশ্বকাপে খেলছে।
জাতীয় সংগীত বেজে উঠেছিল। সামনে বিশাল মাঠ। পেছনে একটি দেশের কোটি মানুষের প্রত্যাশা।
এবারও ভয় পাওয়ার যথেষ্ট কারণ ছিল।
কিন্তু এগারো বছরের সেই বুধবারের পর মাঠে ভয় পাওয়া যেন ভুলেই গিয়েছিলেন এমবাপ্পে।
তিনি দৌড়েছেন। গোল করেছেন। আর্জেন্টিনার রক্ষণ ভেঙেছেন। ফাইনালেও গোল করেছেন। মাত্র উনিশ বছর বয়সে বিশ্বকাপের ট্রফি তুলেছেন।
চার বছর পর আরেকটি বিশ্বকাপ ফাইনালে তিনি একাই তিনটি গোল করেছেন। ট্রফি শেষ পর্যন্ত হাতে ওঠেনি। কিন্তু পরাজয়ের মধ্যেও মাথা নিচু করে লুকিয়ে যাননি।
কারণ তাঁর মা তাকে বহু আগেই শিখিয়েছিলেন—ব্যর্থতা মানুষকে সারাজীবন তাড়া করে না। চেষ্টা না করার আফসোসই তাড়া করে।
আজ পৃথিবী এমবাপ্পের গতি দেখে। তাঁর গোল দেখে। দেখে তারকাখ্যাতি, রেকর্ড আর বিজয়ের ছবি।
কিন্তু সেই গতির ভেতরে লুকিয়ে আছে বন্ডির একটি মাঠ। সেই গোলগুলোর পেছনে আছে একজন মায়ের কয়েকটি কঠিন বাক্য। আর তাঁর প্রতিটি সাহসী দৌড়ের ভেতরে বেঁচে আছে এগারো বছরের ভীত একটি ছেলে, যে একদিন শিখেছিল ভয়কে সঙ্গে নিয়েই সামনে এগিয়ে যেতে হয়।
বিশ্বকাপ জেতার আগে এমবাপ্পে তাই আরও বড় একটি জয় পেয়েছিলেন।
তিনি জয় করেছিলেন নিজের ভয়কে।
আর যে মানুষ একবার নিজের ভয়কে হারাতে শেখে, পৃথিবীর কোনো বড় স্টেডিয়াম, কোনো শক্তিশালী প্রতিপক্ষ কিংবা কোনো পরাজয়ই তাকে আর সহজে থামাতে পারে না।
সূত্র: কিলিয়ান এমবাপ্পের আত্মকথনমূলক লেখা ‘আ লেটার টু দ্য ইয়াং কিলিয়ানস’, দ্য প্লেয়া
[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]





