
আলী কদর পলাশ
প্রিয় পাঠক,
আফগানিস্তানের গজনি প্রদেশের একটি ছোট্ট গ্রাম। যুদ্ধ সেখানে নতুন কিছু নয়। গুলির শব্দ, অনিশ্চয়তা আর দারিদ্র্য—এসবের মাঝেই বড় হচ্ছিল পাঁচ বছরের এক শিশু। তার নাম মুর্তাজা আহমাদি।
পৃথিবীর কোটি কোটি শিশুর মতো সেও ফুটবল ভালোবাসত। আর তার নায়ক ছিলেন একজনই—লিওনেল মেসি।
কিন্তু মেসির জার্সি কেনার সামর্থ্য ছিল না তাদের পরিবারের। প্রতিদিনের খাবার জোগাড় করাই যেখানে কঠিন, সেখানে একটি ফুটবল জার্সি ছিল বিলাসিতা।
একদিন মুর্তাজার বড় ভাই হুমায়ূন একটি অদ্ভুত কাজ করলেন। বাজার থেকে আনা একটি নীল-সাদা প্লাস্টিকের ব্যাগ কেটে তিনি বানিয়ে ফেললেন একটি জার্সি। কালো মার্কার দিয়ে পেছনে লিখলেন—MESSI 10।
মুর্তাজা সেই পলিথিনের জার্সি গায়ে দিয়ে হাসিমুখে মাঠে নেমে পড়ল। তার কাছে সেটিই ছিল আসল আর্জেন্টিনার জার্সি। সেটিই ছিল তার বিশ্বকাপ।
কেউ একজন সেই মুহূর্তের ছবি তুলেছিলেন। তারপর সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছবিটি ছড়িয়ে পড়ে। কয়েক ঘণ্টার মধ্যে ছবিটি পৌঁছে যায় পৃথিবীর নানা প্রান্তে। কোটি কোটি মানুষ দেখল—একটি শিশুর স্বপ্নেরও রং হয় নীল-সাদা।
ছবিটি পৌঁছেছিল লিওনেল মেসির কাছেও।
মেসি অপেক্ষা করেননি। তিনি নিজের স্বাক্ষর করা আর্জেন্টিনা জাতীয় দলের জার্সি, একটি ক্লাব জার্সি এবং একটি ফুটবল পাঠিয়ে দেন মুর্তাজার জন্য। পরে কাতারে একটি প্রদর্শনী ম্যাচে সেই ছোট্ট ছেলেটির সঙ্গে তাঁর দেখা হয়। মেসির হাত ধরে মাঠে হাঁটার সময় মুর্তাজার মুখের হাসি যেন পৃথিবীর সব ট্রফির চেয়েও বড় ছিল।
কিন্তু গল্পটি রূপকথার মতো সেখানেই শেষ হয়নি।
পরবর্তীকালে নিরাপত্তাজনিত হুমকির মুখে পড়ে মুর্তাজার পরিবার। শেষ পর্যন্ত তাদের আফগানিস্তান ছেড়ে অন্য দেশে আশ্রয় নিতে হয়। একটি প্লাস্টিকের জার্সি তাকে বিশ্ববাসীর সামনে পরিচিত করেছিল, কিন্তু যুদ্ধ তার শৈশবকে ছেড়ে দেয়নি।
তবু সেই ছবিটি আজও বেঁচে আছে।
কারণ ফুটবল মাঝে মাঝে এমন কিছু করে, যা রাজনীতি পারে না, যুদ্ধ পারে না, দারিদ্র্যও পারে না। একটি সাধারণ পলিথিনের ব্যাগকে সে পৃথিবীর সবচেয়ে মূল্যবান জার্সিতে পরিণত করে।
বিশ্বকাপের ইতিহাসে অসংখ্য গোল আছে, অসংখ্য ট্রফি আছে, অসংখ্য রেকর্ড আছে। কিন্তু কিছু গল্প সংখ্যায় মাপা যায় না।
একটি নীল-সাদা পলিথিন, এক ভাইয়ের ভালোবাসা, এক শিশুর স্বপ্ন আর একজন কিংবদন্তি ফুটবলারের মানবিক স্পর্শ—এসব মিলেই তৈরি হয়েছিল এমন এক বিশ্বকাপ, যার কোনো স্টেডিয়াম ছিল না, ছিল শুধু মানুষের হৃদয়।
[বিদেশি পত্র পত্রিকা অবলম্বনে]





