
ছাদেক হোছাইন, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি
আমাদের চারপাশে প্রতিদিন কত শত জিনিস অবহেলায় ডাস্টবিনে বা ঘরের কোণে জমা হয়। ছেঁড়া কাগজ, প্লাস্টিকের বোতল, গাছের শুকনো পাতা কিংবা ভাঙা কাঁচ—এসবকে আমরা ‘আবর্জনা’ বা ‘ফেলনা’ বলেই জানি। কিন্তু এই ফেলে দেওয়া নিস্প্রাণ জিনিসগুলোই যে রঙ-তুলির ছোঁয়ায় একেকটি জীবন্ত ও অমূল্য শিল্পকর্মে রূপ নিতে পারে, তা প্রমাণ করে দেখিয়েছেন এক স্বপ্নবাজ তরুণ চিত্রশিল্পী মিজানুর রহমান। বর্জ্যকে ক্যানভাস বানিয়ে তিনি সামাজিক যোগাযোগ মাধ্যমে এখন দারুণ সাড়া ফেলেছেন।
সবাই যখন ঝকঝকে নতুন ক্যানভাস আর দামি রং কিনে ছবি আঁকার প্রস্তুতি নেন, এই তরুণের ভাবনা তখন কিছুটা ভিন্ন পথ ধরে। তার ক্যানভাস রাজপথের ধুলোয় পড়ে থাকা প্লাস্টিক, ঝরে পড়া শুকনা পাতা কিংবা ঘরের কোণে জমে থাকা বাতিল কাগজ। নিজের টেবিলের এক কোণে বসেই তিনি একের পর এক তৈরি করছেন অসাধারণ সব শিল্পকর্ম। কখনো একটা শুকনো গাছের পাতার ওপর ফুটিয়ে তুলছেন চিরচেনা বাংলার প্রাকৃতিক দৃশ্য, কখনো আবার প্লাস্টিকের টুকরো জোড়া দিয়ে বানাচ্ছেন কোনো পাখির অবয়ব। তার জাদুকরী হাতের ছোঁয়ায় যেকোনো সাধারণ বাতিল জিনিসও মুহূর্তেই হয়ে উঠছে চোখধাঁধানো মাস্টারপিস।
চট্টগ্রামের এই তরুণ শিল্পী পড়াশোনার জীবনে দীর্ঘ একটা বিরতি পেরিয়েও হার মানেননি। ২০১৩ সালে এসএসসি পরীক্ষায় বসলেও মাঝে আর প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা অব্যাহত রাখা সম্ভব হয়নি। তবে শিক্ষার আলো আর শিল্পের টান তাঁকে আটকে রাখতে পারেনি; সব বাধা পেরিয়ে তিনি আবারও উন্মুক্ত বিশ্ববিদ্যালয়ে (বাউবি) ভর্তি হয়ে তাঁর পড়াশোনা শুরু করেছেন।
তার এই অনন্য শিল্পযাত্রা, জীবনের গল্প ও ভবিষ্যৎ স্বপ্ন নিয়ে জানতে চাওয়া হলে মিজানুর রহমান জানান:
ছবি আঁকার শুরু ও অবহেলার জবাব
”একেবারে ছোটবেলা থেকে, যখন আমি প্রাইমারি স্কুলে পড়তাম, তখন থেকেই টুকটাক আঁকাআঁকি করতাম। আর ঠিক তখন থেকেই ছবি আঁকার প্রতি আমার গভীর ভালোবাসা শুরু হয়। ছোটবেলায় ছবি আঁকার প্রতিযোগিতায় অংশ নিয়ে আমি অনেকবার পুরস্কৃতও হয়েছিলাম। শুরুর দিকে আমার পরিবার থেকে তেমন একটা সাহস বা সমর্থন পাইনি, তবে আম্মু সবসময় আমাকে কিছুটা সাহস জোগাতেন। আমি যখন ছবি আঁকতাম, তখন অনেকেই বলতেন—’ছবি এঁকে জীবনে কী হবে?’ মানুষের এই অবহেলা আর নেতিবাচক কথাগুলোকেই আমি নিজের ভেতরের জেদ বানিয়ে ফেলি। একদিন বড় শিল্পী হব—এই দৃঢ় ভাবনা বুকে নিয়ে আমি শিল্প জীবনকে বেছে নিই। তবে আজ আমার কাজের মূল অনুপ্রেরণা হলেন আমার মা ও বাবা।”
প্রকৃতিপ্রেম ও ভিন্ন মাধ্যমের সন্ধান
”আমি মূলত প্রকৃতি নিয়েই বেশি ছবি আঁকতে পছন্দ করি। ক্যানভাস সামনে পেলেই জেলেদের জীবন এবং তাদের জীবনসংগ্রামের ছবি ফুটিয়ে তুলতে আমার ভীষণ ভালো লাগত। প্রকৃতির এই সান্নিধ্য আর ক্যানভাসের মাঝেই আমি জীবনের আসল সুখ খুঁজে পেতাম। তবে আমার শিল্পভাবনা আর দশটা মানুষের চেয়ে একটু ভিন্ন। শিল্পজীবনে প্রথাগত রং, তুলি আর ক্যানভাসের বাইরে গিয়ে আমার নিজের হাতে যা-ই আসে, তা-ই দিয়ে নতুন কিছু তৈরি করার চেষ্টা করি। আমার এই ব্যতিক্রমী শিল্পমাধ্যমের বড় উদাহরণ হলো—জলবিন্দু দিয়ে আঁকা কাজী নজরুল ইসলামের ছবিসহ আরও অনেক কাজ, যা আমি একদম ভিন্ন মাধ্যমে সম্পন্ন করেছি। মূলত ছবি আঁকতে ভালো লাগে বলেই আমি এই শিল্প মাধ্যমটিকে নিজের আপন করে নিয়েছি। একজন প্রকৃত শিল্পীর মনে কোনো কুৎসিত বা খারাপ চিন্তা থাকে না, তাঁরা পৃথিবীর সবকিছুকে সুন্দর দৃষ্টিভঙ্গি দিয়ে দেখেন। আর ঠিক এই কারণেই আমি শিল্পী হওয়াটাকেই নিজের জীবনের একমাত্র কর্ম হিসেবে বেছে নিয়েছি।”
প্রাপ্তি, জীবনসংগ্রাম ও আগামীর স্বপ্ন
”শিল্পী হিসেবে আমার জীবনের সবচেয়ে বড় চ্যালেঞ্জ হলো—একদিন সবাই যেন আমাকে আমার ছবির মাধ্যমে একনামে চেনে। আমার মূল পরিচয়টা যেন গড়ে ওঠে কেবলই আমার কাজের মাধ্যমে। ছবি আঁকার সূত্র ধরেই একদিন ফয়সাল আমিন ভাইয়ের সাথে আমার পরিচয় হয়েছিল। তিনি সবসময় আমার পাশে ছায়ার মতো ছিলেন এবং আমার শিল্পকর্মের প্রতি ভালোবাসা থেকে ওনার একটি বাড়ি আমাকে উপহার দিয়েছিলেন, যা আমার জীবনের অন্যতম একটি প্রিয় প্রাপ্তি।
বর্তমানে দেশের অনেক পরিচিত ও গুণী মানুষের কাছে আমার ছবি পৌঁছে গেছে এবং তাঁরা সবাই আমার কাজের দারুণ প্রশংসা করছেন। ছবি এঁকেই আমি আমার পেটের ক্ষুধা মেটাই, এটাই আমার একমাত্র কর্ম, এটাই আমার ভালোবাসা এবং এটাই আমার পুরো জীবন। একমাত্র আমার এই আঁকাআঁকির জন্যই আজ সবাই আমাকে চেনে। জীবনের এই স্বল্প সময়ে দেশের বহু মানুষ আমার কাজের সুনাম করছেন, এটাই আমার জীবনের সবচেয়ে বড় সফলতা। তবে আমি জানি, একজন শিল্পী হিসেবে সাফল্যের এই আঙিনায় আমার আরও অনেক দীর্ঘ পথ পাড়ি দেওয়া বাকি।”
সীমিত সম্পদ আর অদম্য ইচ্ছাশক্তি থাকলে যে কত চমৎকার কিছু করা সম্ভব, তরুণ চিত্রশিল্পী মিজানুর রহমান তার এক অনন্য উদাহরণ। সরকারি বা বেসরকারিভাবে কিছুটা পৃষ্ঠপোষকতা পেলে তার এই পরিবেশবান্ধব শিল্পকর্ম আন্তর্জাতিক অঙ্গনেও দেশের নাম উজ্জ্বল করতে পারে বলে মনে করছেন শিল্পবোদ্ধারা।





