
ছাদেক হোছাইন, ভ্রাম্যমাণ প্রতিনিধি
চট্টগ্রাম প্রেসক্লাব ভবনের সুলতান আহমেদ হলে লেখক ও গবেষক এবং চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ আমির উদ্দিনের সদ্য প্রকাশিত ‘বাঙালির লজিক চর্চা’ গ্রন্থের ওপর এক মনোজ্ঞ আলোচনা সভা অনুষ্ঠিত হয়েছে। আজ ১৩ জুন প্রগতি লেখক সংঘ, চট্টগ্রাম শাখার উদ্যোগে আয়োজিত এই সভায় দেশের বিশিষ্ট শিক্ষাবিদ, গবেষক ও প্রগতিশীল ব্যক্তিবর্গ অংশ নেন।
সংগঠনের চট্টগ্রাম শাখার আহ্বায়ক অধ্যক্ষ আবু তৈয়বের সভাপতিত্বে এবং অধ্যাপক ড. শিব প্রসাদ শুরের সঞ্চালনায় অনুষ্ঠানে প্রধান অতিথি হিসেবে বক্তব্য রাখেন প্রগতি লেখক সংঘের কেন্দ্রীয় সহ-সভাপতি মো: জাকির হোসেন।
তিনি বলেন, “’বাঙালির লজিক চর্চা’ মূলত একটি প্রবন্ধসংকলন, যেখানে ব্যক্তি, সমাজ এবং রাষ্ট্রজীবনের নানা বাস্তব সমস্যা যুক্তিনিষ্ঠ দৃষ্টিভঙ্গি থেকে বিশ্লেষণ করার চেষ্টা করা হয়েছে। যুক্তি এখানে কেবল দর্শনের একটি তাত্ত্বিক বিষয় নয়; বরং মানুষের দৈনন্দিন জীবনযাপন, সামাজিক সম্পর্ক, রাজনৈতিক সংস্কৃতি এবং নাগরিক দায়িত্ববোধের সঙ্গে গভীরভাবে সম্পর্কিত।”
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় শিক্ষা ও গবেষণা ইনস্টিটিউট (আইইআর)-এর পরিচালক প্রফেসর ড. উদিতি দাশ বলেন, এই গ্রন্থ সমকালীন সমাজচিন্তার একটি গুরুত্বপূর্ণ দলিল হিসেবে বিবেচিত হবে। যুক্তিনিষ্ঠ মনন, সামাজিক দায়বদ্ধতা এবং মানবিক মূল্যবোধের বিকাশে এই গ্রন্থ পাঠকদের অনুপ্রাণিত করবে।
অপর অতিথি বিশিষ্ট কবি ও সাহিত্যিক অধ্যক্ষ তহুরীন সবুর ডালিয়া বলেন, যে সমাজ যুক্তির আলোকে নিজেকে বিচার করতে পারে, সমালোচনাকে গ্রহণ করতে পারে এবং অভিজ্ঞতার ভিত্তিতে নতুন পথ অনুসন্ধান করতে সক্ষম হয়, সেই সমাজই সময়ের পরীক্ষায় টিকে থাকে। অন্যদিকে, যখন সমাজ আবেগ, গুজব, সংকীর্ণতা ও অযুক্তিকতার দ্বারা পরিচালিত হয়, তখন সামাজিক অগ্রগতি বাধাগ্রস্ত হয় এবং বিভিন্ন ধরনের সংকটের সৃষ্টি হয়। বাংলাদেশের সমাজজীবন, রাজনীতি, শিক্ষা এবং সংস্কৃতির বিভিন্ন ক্ষেত্রে দীর্ঘদিন ধরে একটি মৌলিক প্রশ্ন আমাদের তাড়া করে—‘আমরা কি যথেষ্ট যুক্তিনিষ্ঠ সমাজ গড়ে তুলতে পেরেছি?’ লেখক এ বিষয়ে গভীর দৃষ্টিপাত করেছেন।
বিশেষ অতিথির বক্তব্যে ড. আজাদ বুলবুল বলেন, গ্রন্থের প্রথম প্রবন্ধে বাঙালির সামাজিক ও মানস গঠনের সঙ্গে যুক্তিবোধের সম্পর্ক নিয়ে আলোচনা করা হয়েছে। আবেগপ্রবণতা বাঙালি সংস্কৃতির একটি গুরুত্বপূর্ণ বৈশিষ্ট্য হলেও যুক্তিহীন আবেগ অনেক সময় সামাজিক সমস্যার জন্ম দেয়—এই বিষয়টি এখানে বিশ্লেষণ করা হয়েছে। এ বিষয়ে লেখক পরবর্তীতে বিস্তৃত কাজ করবেন বলে আশা রাখি।
আলোচনায় অংশ নিয়ে সমাজকর্মী ও রাজনীতিবিদ মারুফ হাসান রুমি বলেন, লেখক এ বইয়ে বহু সামাজিক ও রাষ্ট্রীয় সংকট ও তা উত্তরণের কথা তুলে ধরেছেন যা নিয়ে সামাজিক ও রাজনৈতিক নেতৃবৃন্দের কাজ করা উচিত।
প্রগতি লেখক সংঘের সাধারণ সম্পাদক এডভোকেট গোলাম আকবর বলেন, সমাজ রাষ্ট্রের দ্বারা নিয়ন্ত্রিত কোনো কাঠামো নয়, বরং এটি নাগরিকদের সম্মিলিত কর্মকাণ্ডের ফল। তাই সামাজিক উন্নয়ন ও গণতান্ত্রিক সংস্কৃতির বিকাশে নাগরিক সচেতনতা ও যুক্তিনিষ্ঠ মনের ভূমিকা অত্যন্ত গুরুত্বপূর্ণ। যা এ গ্রন্থটির মূল প্রতিপাদ্য।
চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সংস্কৃত বিভাগের সহকারী অধ্যাপক প্রশান্ত কুমার মন্ডল বলেন, বর্তমান যুগে তথ্যপ্রযুক্তির বিস্তার মানুষের চিন্তা ও আচরণকে দ্রুত পরিবর্তন করছে। সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমের যুগে তথ্য যেমন দ্রুত ছড়িয়ে পড়ে, তেমনি ভুল তথ্য ও বিভ্রান্তিও দ্রুত বিস্তার লাভ করে। এই পরিস্থিতিতে যুক্তিনিষ্ঠ চিন্তা এবং সমালোচনামূলক বোধ সমাজের জন্য অপরিহার্য হয়ে উঠেছে। এই গ্রন্থ সেই প্রয়োজনীয়তার কথাই স্মরণ করিয়ে দেয়।
অনুষ্ঠানে সমাজকর্মী কামাল আহমেদ বলেন, এই বইয়ের প্রবন্ধগুলো পাঠককে কেবল তথ্য দেয় না, বরং চিন্তার নতুন দিগন্ত উন্মোচন করে। সমাজ, রাষ্ট্র এবং নাগরিক জীবনের বিভিন্ন গ্রন্থি নিয়ে পাঠককে ভাবতে উদ্বুদ্ধ করাই এই গ্রন্থের অন্যতম শক্তি।
সভায় লেখক চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয়ের সহযোগী অধ্যাপক মুহাম্মদ আমির উদ্দিন প্রগতি লেখক সংঘ ও উপস্থিত সকলের প্রতি কৃতজ্ঞতা জ্ঞাপন করে বলেন, বাংলাদেশ এখন এক যুক্তি মহাব্রতে ডুবে আছে। এ থেকে উত্তরণে আমাদের সবাইকে যুক্তির ভিত্তিতে সমাজ গঠন করতে হবে।
অনুষ্ঠানে অন্যান্যদের মধ্যে আরও আলোচনা করেন স্বপন দত্ত, উৎপল কান্তি বড়ুয়া এবং সোমা মুৎসুদ্দী প্রমুখ। সভাপতির বক্তব্যে অধ্যক্ষ আবু তৈয়ব প্রগতিশীল সমাজ ও মুক্তবুদ্ধি চর্চায় যুক্তিবাদী সাহিত্যের প্রয়োজনীয়তা তুলে ধরে সভার সমাপ্তি ঘোষণা করেন।





