
দেশের সাধারণ মানুষের জন্য একটি কল্যাণমুখী রাষ্ট্র ও মানবিক অর্থনীতি গড়ে তুলতে সরকার সর্বাত্মক সংস্কার কর্মসূচি হাতে নিয়েছে বলে জানিয়েছেন অর্থমন্ত্রী আমির খসরু মাহমুদ চৌধুরী। তিনি বলেন, অলিগার্কি বা গোষ্ঠীনির্ভর অর্থনীতি থেকে বেরিয়ে একটি গণমুখী ও অন্তর্ভুক্তিমূলক অর্থনৈতিক ব্যবস্থা প্রতিষ্ঠাই বর্তমান সরকারের মূল লক্ষ্য।
বৃহস্পতিবার (২১ মে) রাজধানীর প্যান প্যাসিফিক সোনারগাঁও হোটেলে অনুষ্ঠিত ‘সংকটকালের বাজেট ও জনপ্রত্যাশা’ শীর্ষক গোলটেবিল আলোচনায় প্রধান অতিথির বক্তব্যে তিনি এসব কথা বলেন।
অর্থমন্ত্রী বলেন, অর্থনীতির গণতান্ত্রিকীকরণ কেবল একটি রাজনৈতিক স্লোগান নয়, এটি সরকারের মূল দর্শন। দীর্ঘদিন ধরে বাজেট কাঠামোর বাইরে থাকা গ্রামীণ কামার-কুমার, তাঁতি ও অন্যান্য প্রান্তিক জনগোষ্ঠীকে অর্থনীতির মূলধারায় যুক্ত করতে বিশেষ গুরুত্ব দেয়া হচ্ছে।
তিনি জানান, আগামী বাজেটে ক্রিয়েটিভ ইকোনমি বা সৃজনশীল অর্থনীতির বিকাশে বিশেষ বরাদ্দ রাখা হবে। থিয়েটার, সংস্কৃতি, সংগীত, পেইন্টিং ও আর্টিফিশিয়াল জুয়েলারি খাতকে বাণিজ্যিকভাবে বিকশিত করতে বিশেষ প্রকল্প নেয়া হচ্ছে। ঢাকাসহ বড় শহরগুলোতে ‘থিয়েটার ডিস্ট্রিক্ট’ গড়ে তোলার পরিকল্পনার কথাও জানান তিনি। পাশাপাশি দেশের সংস্কৃতি, চলচ্চিত্র ও সংগীতকে আন্তর্জাতিক বাজারে ব্র্যান্ডিংয়ের মাধ্যমে বাংলাদেশের সফট পাওয়ার বাড়ানোর উদ্যোগ নেয়া হবে।
ব্যবসা পরিচালনায় আমলাতান্ত্রিক জটিলতা কমাতে সরকার কঠোর পদক্ষেপ নিচ্ছে বলেও জানান অর্থমন্ত্রী। তিনি বলেন, বন্দর থেকে পণ্য পরিবহন পর্যন্ত বিভিন্ন স্তরে অতিরিক্ত চার্জ ও হয়রানি কমানো হবে। ব্যবসা ও প্রকল্প বাস্তবায়নে প্রয়োজনীয় অনুমোদনের সংখ্যা কমিয়ে আনা হচ্ছে।
তিনি আরও বলেন, আগামী এক বছরের মধ্যে দেশের অর্থনৈতিক ও প্রশাসনিক ব্যবস্থাকে ডিজিটাল অটোমেশনের আওতায় আনা হবে। একইসঙ্গে ‘ওয়ান সিটিজেন, ওয়ান কার্ড’ উদ্যোগের মাধ্যমে সব নাগরিক সেবা এক প্ল্যাটফর্মে আনার পরিকল্পনা চলছে। এছাড়া প্রকল্প বাস্তবায়নের প্রতিটি ধাপ নির্দিষ্ট সময়সীমার মধ্যে সম্পন্ন করতে প্রতিদিন মনিটরিং করা হবে।
অর্থমন্ত্রী জানান, উচ্চ সুদের ব্যাংক ঋণের বিকল্প হিসেবে পুঁজিবাজার ও বন্ড মার্কেটকে শক্তিশালী করার উদ্যোগ নেয়া হয়েছে। এ লক্ষ্যে আন্তর্জাতিক বিনিয়োগ ব্যাংকার, ফান্ড ম্যানেজার এবং আইএফসি থেকে ইতিবাচক সাড়া পাওয়া যাচ্ছে। বড় মূলধনী কোম্পানিগুলোর জন্য পুঁজিবাজারে তালিকাভুক্তি বাধ্যতামূলক করার বিষয়টিও বিবেচনায় রয়েছে।
এছাড়া দেশে ও বিদেশে ‘বাংলাদেশ বন্ড’ চালুর প্রক্রিয়া চলছে, যেখানে সুদের হার ৬ থেকে ৯ শতাংশের মধ্যে থাকবে বলে জানান তিনি।
কর ব্যবস্থায় পরিবর্তনের ইঙ্গিত দিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, বহুজাতিক ও বড় তামাক কোম্পানির প্রকৃত বাজার হিস্যা যাচাই করে ন্যায্য কর আদায় নিশ্চিত করা হবে। ছোট ব্যবসায়ী ও রেস্টুরেন্ট মালিকদের জন্য সহজ ‘ফ্ল্যাট রেট’ করব্যবস্থা চালুর পরিকল্পনাও রয়েছে, যাতে কর কর্মকর্তাদের হয়রানি কমে।
তিনি বলেন, কর নীতিনির্ধারণে গুণগত পরিবর্তন আনতে একটি নতুন বিল আনা হচ্ছে। এর মাধ্যমে শুধু কর আদায়ে দক্ষ নয়, বরং বৈশ্বিক অর্থনীতি, স্থানীয় বাণিজ্য ও মানবিক লাভজনকতা বোঝেন—এমন বিশেষজ্ঞদের নিয়ে পলিসি মেকিং বডি গঠন করা হবে।
দেশবাসীকে আগামী দুই বছর ধৈর্য ধরার আহ্বান জানিয়ে অর্থমন্ত্রী বলেন, সরকারের লক্ষ্য শুধু জিডিপি প্রবৃদ্ধি বাড়ানো নয়, বরং সেই প্রবৃদ্ধির সুফল সাধারণ মানুষের জীবনে কতটা পরিবর্তন আনছে তা নিশ্চিত করা। আগামী ছয় মাসের মধ্যে প্রয়োজনীয় ডিরেগুলেশন সম্পন্ন করার লক্ষ্য নিয়ে সরকার কাজ করছে বলেও জানান তিনি।
অনুষ্ঠানে আরও উপস্থিত ছিলেন পিপিআরসির চেয়ারম্যান হোসেন জিল্লুর রহমান, সিপিডির সম্মাননীয় ফেলো দেবপ্রিয় ভট্টাচার্য, বিআইজিডির প্রফেসোরিয়াল ফেলো সেলিম জাহান, ট্রান্সকম গ্রুপের সিইও সিমিন রহমান, এইচএসবিসি বাংলাদেশের ব্যবস্থাপনা পরিচালক মাহবুব উর রহমান, পলিসি এক্সচেঞ্জের চেয়ারম্যান মাসরুর রিয়াজসহ বিভিন্ন ব্যবসায়ী ও নীতিনির্ধারকরা।





