
টেলিগ্রাফ অবলম্বনে নিজস্ব প্রতিবেদক
রাশিয়ায় উচ্চ বেতনের চাকরির লোভে গিয়ে যুদ্ধক্ষেত্রে আটকে পড়েছিলেন বাংলাদেশের এক তরুণ। ইলেকট্রিশিয়ান মোহন মিয়াজী। ফেসবুকে দেখা একটি চাকরির বিজ্ঞাপনই তার জীবনের গতিপথ বদলে দেয়। ৩০ বছর বয়সী মোহন ভেবেছিলেন তিনি রাশিয়ায় ইলেকট্রনিক্সের কাজ করবেন এবং পরিবারের আর্থিক অবস্থার উন্নতি করবেন। কিন্তু কয়েক মাসের মধ্যেই তিনি নিজেকে আবিষ্কার করেন ইউক্রেনের দখলকৃত অঞ্চলের যুদ্ধক্ষেত্রে, যেখানে প্রতিদিন মৃত্যুভয়, ড্রোন হামলা এবং নির্যাতনের মধ্যে কাটাতে হয়েছে তাকে।
দ্য টেলিগ্রাফকে দেওয়া সাক্ষাৎকারে মোহন বলেন, বাংলাদেশের অসংখ্য দরিদ্র তরুণের মতো তিনিও বিদেশে গিয়ে ভালো আয়ের স্বপ্ন দেখেছিলেন। গজারিয়ার নিজ বাড়ি থেকে তিনি রাশিয়ার পূর্বাঞ্চলীয় শহর সভোবদনিতে যান। সেখানে প্রথমদিকে ইলেকট্রনিক্সের কাজে নিয়োজিত ছিলেন। বাংলাদেশের উষ্ণ আবহাওয়া থেকে গিয়ে তাকে মাইনাস ২০ ডিগ্রি সেলসিয়াস ঠান্ডায় কাজ করতে হয়েছে। কিন্তু পাঁচ মাস পর পরিস্থিতি নাটকীয়ভাবে বদলে যায়।
মোহনের ভাষ্য অনুযায়ী, এক রুশ এজেন্ট তাকে এবং আরও কয়েকজন বাংলাদেশিকে বোঝায় যে তাদের আরও ভালো জায়গায়, যুদ্ধক্ষেত্র থেকে দূরে কাজ দেওয়া হবে। কিন্তু বাস্তবে তাদের পাঠানো হয় রোস্তভ অন ডনের একটি সামরিক ঘাঁটিতে। সেখানে তিন সপ্তাহের মৌলিক সামরিক প্রশিক্ষণ দেওয়া হয়। তাকে শেখানো হয় কীভাবে অ্যাসল্ট রাইফেল ব্যবহার করতে হয়, আরপিজি ছোড়া যায় এবং গ্রেনেড নিক্ষেপ করতে হয়।
মোহন বলেন, “আমাকে বলা হয়েছিল আমি সামনের সারিতে থাকব না। কিন্তু তারা আমাকে বন্দুক চালানো শেখাচ্ছিল। তখনও আমি বিশ্বাস করেছিলাম, এটা হয়তো স্বাভাবিক প্রক্রিয়া।”
পরে যখন তারা দোনেৎস্কের একটি সেনা ক্যাম্পে পৌঁছান, তখন কমান্ডার তাকে জানায় যে তিনি আসলে একটি সামরিক ব্যাটালিয়নে যোগদানের চুক্তিতে স্বাক্ষর করেছেন। মোহন যখন তার কাছে সেই কাগজ দেখান, যেখানে নিয়োগকারী নারী লিখেছিল যে যুদ্ধের সঙ্গে তাদের কোনো সম্পর্ক থাকবে না, তখন কমান্ডার সরাসরি বলেন যে তাকে প্রতারণা করা হয়েছে।
এরপর মোহনকে নিয়ে যাওয়া হয় আভদিভকা শহরে। ২০২৪ সালে দীর্ঘ ও রক্তক্ষয়ী যুদ্ধের পর শহরটি রাশিয়ার নিয়ন্ত্রণে যায়। সেখানে হাজার হাজার রুশ সেনা নিহত হয়েছিল। যুদ্ধক্ষেত্রে মোহনের দায়িত্ব ছিল সামনের সারির সৈন্যদের জন্য গোলাবারুদ, অস্ত্র ও জ্বালানি পৌঁছে দেওয়া এবং নিহতদের মরদেহ সরিয়ে আনা।
মোহন বলেন, “প্রতিবার ট্রেঞ্চ থেকে বের হতে আমার ভয় লাগত। সামনের সারিতে থাকার তৃতীয় দিনেই শার্পনেলের আঘাতে আহত হই।”
তিনি জানান, কিছুদিন পর তার সঙ্গে থাকা আরেক বাংলাদেশি মাইন বিস্ফোরণে নিহত হন। মৃতদেহ সংগ্রহ করতে গিয়ে তাদের ওপর নিয়মিত ড্রোন হামলা, ক্ষেপণাস্ত্র হামলা ও গোলাবর্ষণ চলত। অনেক বিস্ফোরণ তার কয়েক মিটার দূরেই ঘটেছে।
তার ভাষায়, “আমি ভাবতাম আমি বাঁচব না। প্রতি সেকেন্ডে আতঙ্কে থাকতাম।”
মোহন আরও অভিযোগ করেন, রুশ কমান্ডাররা তাদের বেতন আত্মসাৎ করত। প্রতিবাদ করলে তাকে কোদাল ও রাইফেলের বাট দিয়ে মারধর করা হতো। ছোট ভুলের জন্য তাকে সংকীর্ণ বেসমেন্ট সেলে আটকে রেখে নির্যাতন করা হয়েছে। অন্যদের নগ্ন করে উল্টো ঝুলিয়ে রাখার ঘটনাও তিনি দেখেছেন।
তিনি বলেন, “আমি বুঝতে পেরেছিলাম আমি ফাঁদে পড়েছি। পালানোর কোনো উপায় ছিল না।”
মোহনের ইউনিটে শুধু বাংলাদেশিই নয়, আরও বহু বিদেশি ছিল। তিনি নাইজেরিয়া, নেপাল, উগান্ডা, মিশর ও ইরাকের নাগরিকদের দেখেছেন। এছাড়া বিপুল সংখ্যক উত্তর কোরিয়ান সেনাও সেখানে ছিল বলে জানান তিনি।
প্রায় আট মাসের ভয়াবহ অভিজ্ঞতার পর ২০২৫ সালের শেষদিকে সাময়িক ছুটিতে তিনি মস্কো যেতে সক্ষম হন। সেখানে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে অস্থায়ী ভ্রমণ নথি সংগ্রহ করেন। কারণ তার পাসপোর্ট সামরিক বাহিনী জব্দ করেছিল।
মোহন বলেন, “বিমানবন্দরে আমাকে নিরাপত্তা বাহিনী আলাদা করে জিজ্ঞাসাবাদ করেছিল। আমি ভেবেছিলাম তারা আমাকে থামিয়ে দেবে। কিন্তু শেষ পর্যন্ত বিমানে উঠতে পেরেছিলাম।”
বাংলাদেশে ফিরে পরিবারের সঙ্গে পুনর্মিলনের মুহূর্তের কথা বলতে গিয়ে তিনি আবেগাপ্লুত হয়ে পড়েন। তার ভাষায়, “আমার মা কথা বলতে পারছিলেন না। তিনি ভেবেছিলেন আর কোনোদিন আমাকে দেখবেন না। আমরা একে অপরকে জড়িয়ে ধরে কাঁদছিলাম।”
বর্তমানে ভাইয়ের সঙ্গে বাড়িতে থাকছেন মোহন। তিনি স্বীকার করেছেন যে রাশিয়ায় যাওয়ার সিদ্ধান্তে তিনি সরল বিশ্বাসী ছিলেন। এখন তিনি অন্য তরুণদের সতর্ক করছেন যাতে তারা সামাজিক যোগাযোগমাধ্যমে ছড়ানো চাকরির প্রলোভনে পা না দেন।
প্রতারণার এই নেটওয়ার্ক সাধারণত ট্রাভেল এজেন্সি বা চাকরি প্রদানকারী প্রতিষ্ঠানের ছদ্মবেশে হোয়াটসঅ্যাপ ও টেলিগ্রামে সক্রিয় থাকে। দরিদ্র মানুষের দুর্বলতাকে কাজে লাগিয়ে তাদের রাশিয়ায় নেওয়া হয়। প্রতিবেদনে বলা হয়েছে, ইউক্রেন যুদ্ধে প্রায় ৩ লাখ ২৫ হাজার সেনা হারানোর পর রাশিয়া সেনাবাহিনীর ঘাটতি পূরণে বিদেশি নাগরিকদের টার্গেট করছে।





