
খুলনা থেকে এম রোমানিয়া ব্যুরো প্রধান
ঘূর্ণিঝড় সিডর, আইলা ও আম্ফানের মতো উপকূলীয় দুর্যোগের দীর্ঘমেয়াদি প্রভাব, অস্বাভাবিক বৃষ্টিপাত, দাবদাহ, শৈত্যপ্রবাহ এবং অপরিকল্পিত পানি ব্যবস্থাপনার কারণে খুলনায় কৃষি এখন স্থায়ী সংকটের মুখে পড়েছে। জেলার আট উপজেলায় বোরো, আমন ও শাক-সবজির আবাদ প্রায় বছরজুড়েই জলাবদ্ধতা ও আবহাওয়াজনিত ক্ষতির শিকার হচ্ছে। কৃষি বিভাগের হিসাব অনুযায়ী, জেলায় প্রায় ১০ হাজার হেক্টর জমি জলাবদ্ধতার কবলে পড়ে বছরে প্রায় ১০০ কোটি টাকার ফসলহানি হচ্ছে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তরের সাম্প্রতিক জরিপে দেখা গেছে, নগরীর লবণচরাসহ রূপসা, বটিয়াঘাটা, দিঘলিয়া, ফুলতলা, ডুমুরিয়া, তেরখাদা, পাইকগাছা ও কয়রা উপজেলায় স্থায়ীভাবে ১ হাজার ১৭৮ হেক্টর এবং অতিবৃষ্টিতে আরও ৮ হাজার ৫৮৬ হেক্টর জমিতে জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়। ফলে কৃষকের উৎপাদন ব্যয় বাড়লেও কাঙ্ক্ষিত ফলন মিলছে না।
মৌসুম বদলালেই নতুন বিপদ
চলতি বোরো মৌসুমের শুরুতেই শৈত্যপ্রবাহে ডুমুরিয়া, ফুলতলা ও তেরখাদার বহু বীজতলা শুকিয়ে যায়। পরে এপ্রিলের শেষ সপ্তাহ ও মে মাসের শুরুতে আকস্মিক বৃষ্টিতে বোরো ধান এবং দাকোপের তরমুজ ক্ষেতে বড় ধরনের ক্ষতি হয়। মাঝারি বৃষ্টিতেই অনেক এলাকায় জমে যায় পানি, ডুবে যায় ক্ষেত।
কৃষি কর্মকর্তারা বলছেন, আগে যেখানে জলাবদ্ধতা ছিল মূলত বর্ষাকেন্দ্রিক সমস্যা, এখন তা সারা বছরের দুর্যোগে রূপ নিয়েছে। শীতকালে সেচ সংকট, গরমে খরা, আবার সামান্য বৃষ্টিতেই দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা—সব মিলিয়ে কৃষি উৎপাদন চরম অনিশ্চয়তায় পড়েছে।
জলাবদ্ধতার পেছনে ১৫ কারণ
কৃষি বিভাগের জরিপে জলাবদ্ধতার জন্য অন্তত ১৫টি প্রধান কারণ চিহ্নিত করা হয়েছে।
এর মধ্যে রয়েছে—
# নগরীর লবণচরা এলাকায় সড়ক নির্মাণের কারণে পানি নিষ্কাশনে বাধা
# রূপসার আঠারোবাকী নদীর পানিপ্রবাহ কমে যাওয়া
# নরনিয়া বিলের গভীরতা হ্রাস
# অপরিকল্পিত চিংড়ি ঘের
# খাল ও নদীতে নাব্যতা সংকট
# স্লুইস গেটের অব্যবস্থাপনা
# সরকারি খাস খাল দখল ও ভরাট
নিচু জমিতে দ্রুত পানি নিষ্কাশনের ব্যবস্থা না থাকা
# অতিবৃষ্টির পরিমাণ বৃদ্ধি
# খাল পুনঃখননের দীর্ঘসূত্রতা
বিশেষ করে পাইকগাছা, কয়রা ও বটিয়াঘাটায় খাল ভরাট ও স্লুইস গেটের অকার্যকারিতা পরিস্থিতিকে আরও জটিল করে তুলেছে।
অস্তিত্ব সংকটে ১২ নদী
পানি উন্নয়ন বোর্ডের তথ্যমতে, খুলনার অন্তত ১২টি নদী এখন অস্তিত্ব সংকটে। প্রায় ৩৬৯ কিলোমিটার দীর্ঘ এসব নদীর নাব্যতা কমে যাওয়ায় বর্ষায় আশপাশের এলাকার পানি দ্রুত নিষ্কাশন হতে পারে না।
ঝুঁকিতে থাকা নদীগুলোর মধ্যে রয়েছে শোলমারী, হামকুড়া, হরি, ভদ্রা, আপার সালতা, চিত্রা, শিবসার একাংশ, আঠারোবাকী, কপোতাক্ষ, শাকবাড়িয়া, কয়রা ও ময়ূর নদী।
স্থানীয় সূত্র বলছে, বটিয়াঘাটা ব্রিজ নির্মাণের পর কাজিবাছা নদীর স্বাভাবিক প্রবাহ কমে গেছে। এতে আশপাশের গ্রামগুলোতে বর্ষা মৌসুমে দীর্ঘস্থায়ী জলাবদ্ধতা তৈরি হচ্ছে।
কৃষক হারাচ্ছেন আগ্রহ
জলাবদ্ধতা ও প্রাকৃতিক দুর্যোগের পাশাপাশি কৃষি উপকরণের দাম বৃদ্ধি এবং ন্যায্যমূল্য না পাওয়ায় অনেক কৃষক চাষাবাদ থেকে মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছেন। দাকোপ এলাকায় একসময় লাভজনক তরমুজ চাষ এখন অনেকটাই কমে গেছে। ২০২৩ সালে শিলাবৃষ্টিতে বানিশান্তা এলাকার তরমুজ চাষ মারাত্মক ক্ষতির মুখে পড়ে।
কৃষি সম্প্রসারণ অধিদপ্তর খুলনার অতিরিক্ত উপ-পরিচালক সুবীর কুমার বিশ্বাস বলেন, অপরিকল্পিত বসতি, চিংড়ি ঘের, নিচু জমি ও খাল ভরাট জলাবদ্ধতার বড় কারণ। ডুমুরিয়া-ফুলতলার ‘অভিশাপ’ হিসেবে পরিচিত বিল ডাকাতিয়ায় খাল খননের কাজ শুরু হয়েছে। সঠিকভাবে পানি নিষ্কাশন নিশ্চিত করা গেলে অনেক জমি আবার চাষের আওতায় আনা সম্ভব হবে।
তেরখাদায় স্থায়ী জলাবদ্ধতা
তেরখাদা উপজেলার সাচিয়াদাহ, ছাগলাদাহ ও তেরখাদা ইউনিয়নের নিচু এলাকায় পানি দীর্ঘদিন আটকে থাকে। উপজেলা কৃষি কর্মকর্তা শিউলী মজুমদার জানান, ভুতিয়ার বিলে প্রায় ১০০ হেক্টর জমিতে স্থায়ী জলাবদ্ধতা সৃষ্টি হয়েছে। খাল পুনঃখনন এবং স্লুইস গেট সচল করা গেলে এ সংকট অনেকটাই কমবে।
তিনি বলেন, “স্বাভাবিক পানি প্রবাহ নিশ্চিত করা গেলে শুধু জলাবদ্ধতাই কমবে না, চাষযোগ্য জমির পরিমাণও বাড়বে।”
সমাধান কোথায়?
বিশেষজ্ঞদের মতে, শুধু খাল খনন নয়—সমন্বিত নদী ব্যবস্থাপনা, স্লুইস গেট আধুনিকায়ন, দখলমুক্ত খাল পুনরুদ্ধার এবং পরিকল্পিত পানি নিষ্কাশন ব্যবস্থা ছাড়া খুলনার কৃষিকে টেকসই রাখা কঠিন হবে। অন্যথায় জলবায়ু পরিবর্তনের প্রভাবে ভবিষ্যতে খাদ্য উৎপাদন আরও হুমকির মুখে পড়তে পারে।





