অর্থনীতির মেরুদণ্ড, তবুও অদৃশ্য: এসএমই কেন ঋণ পায় না?

Date:

spot_img

এলিন মাহবুব

নারায়ণগঞ্জের একটি সরু গলিতে, মাত্র আটজন কর্মী আর কয়েকটি সেলাই মেশিন নিয়ে এক ক্ষুদ্র গার্মেন্টস সাবকন্ট্রাক্টর তার ব্যবসা চালান। বড় কারখানা থেকে নিয়মিত অর্ডার আসে, কিন্তু পেমেন্ট আসে দেরিতে, আর নগদ প্রবাহ থাকে অনিশ্চিত। তবুও, একটি চলমান ও লাভজনক ব্যবসা থাকা সত্ত্বেও, তিনি কখনো কোনো আনুষ্ঠানিক ব্যাংক ঋণ পাননি।

“আমার নামে কোনো জমি নেই,” তিনি শান্তভাবে বলেন। “তাই ব্যাংকের কাছে আমি অস্তিত্বহীন।”
এটি কোনো বিচ্ছিন্ন গল্প নয়। বরং এটি বাংলাদেশের ক্ষুদ্র ও মাঝারি শিল্প (এসএমই) খাতের একটি বাস্তব প্রতিচ্ছবি—একটি খাত, যা অর্থনীতিকে সচল রাখে, কিন্তু আনুষ্ঠানিক আর্থিক ব্যবস্থার কাছে প্রায় অদৃশ্য রয়ে গেছে।

বাংলাদেশের অর্থনীতিতে এসএমই খাতকে দীর্ঘদিন ধরেই মেরুদণ্ড হিসেবে বিবেচনা করা হয়। কর্মসংস্থান সৃষ্টি এবং শিল্পের বৈচিত্র্য বৃদ্ধিতে এই খাতের অবদান উল্লেখযোগ্য। হালকা প্রকৌশল, কৃষি-প্রক্রিয়াজাতকরণ, ই-কমার্স থেকে শুরু করে হস্তশিল্প—বিভিন্ন খাতে ছড়িয়ে রয়েছে এই উদ্যোগগুলো। বিভিন্ন হিসাব অনুযায়ী, এসএমই খাত দেশের মোট দেশজ উৎপাদনের (জিডিপি) ২৫ শতাংশেরও বেশি অবদান রাখে এবং শহর ও গ্রামে লক্ষ লক্ষ মানুষের কর্মসংস্থান নিশ্চিত করে।

বাংলাদেশ ব্যাংকসহ বিভিন্ন প্রতিষ্ঠান এই খাতের গুরুত্ব স্বীকার করেছে। পুনঃঅর্থায়ন স্কিম, নীতিগত প্রণোদনা এবং বাণিজ্যিক ব্যাংকগুলোর জন্য এসএমই ঋণ বিতরণের লক্ষ্যমাত্রা নির্ধারণ করা হয়েছে। কাগজে-কলমে একটি সহায়ক পরিবেশের চিত্র দেখা যায়। কিন্তু বাস্তবতা ভিন্ন গল্প বলে।

বাংলাদেশে অনেক ছোট ব্যবসা লাভজনক এবং সক্রিয় থাকা সত্ত্বেও একটি বড় সমস্যার কারণে এগোতে পারে না যাকে বলা হয় “অনানুষ্ঠানিকতা”। অর্থাৎ, এসব ব্যবসার ব্যাংক স্টেটমেন্ট, নিরীক্ষিত আর্থিক প্রতিবেদন বা কর-সংক্রান্ত আনুষ্ঠানিক কাগজপত্র থাকে না। এই তথ্যের অভাব উদ্যোক্তাদের সঙ্গে ব্যাংকের একটি অদৃশ্য দেয়াল তৈরি করে।
২০২৩–২০২৪ সালের সাম্প্রতিক গবেষণা অনুযায়ী, ব্যাংকগুলোর জন্য এসএমই-তে ঋণ দেওয়ার ঝুঁকি নিরূপণ করা প্রায় অসম্ভব হয়ে পড়ে, কারণ অধিকাংশ ব্যবসাই নগদ লেনদেনের ওপর নির্ভরশীল এবং তাদের কাছে টিআইএন-এর মতো আনুষ্ঠানিক কর নথি নেই। যেহেতু তাদের আর্থিক লেনদেন ব্যাংকের মাধ্যমে হয় না, তাই তাদের কোনো “ফাইন্যান্সিয়াল ফুটপ্রিন্ট” তৈরি হয় না, যা তাদের বিশ্বাসযোগ্যতা প্রমাণ করতে পারে।
এর ফলাফল হলো ঝুঁকি এবং বাস্তবতার মধ্যে একটি দ্বন্দ্ব। ব্যাংকিং ব্যবস্থায় যদি ঝুঁকি পরিমাপ করা না যায়, তাহলে ঋণ দেওয়া হয় না। ফলে একটি সফল ব্যবসাও শুধুমাত্র কাগজে তার প্রমাণ না থাকার কারণে প্রত্যাখ্যাত হয়।
এই সমস্যার সমাধানে প্রয়োজন “বিকল্প ঋণ মূল্যায়ন পদ্ধতি” বা অল্টারনেটিভ ক্রেডিট স্কোরিং অর্থাৎ, মোবাইল ব্যাংকিং লেনদেন, ইউটিলিটি বিল পরিশোধ, সরবরাহকারীর লেনদেনের রেকর্ড—এসব তথ্য ব্যবহার করে একটি ব্যবসার ঋণযোগ্যতা নির্ধারণ করা যেতে পারে। ডিজিটাল তথ্য ব্যবহার করে এই তথ্যঘাটতি পূরণ করা গেলে অনানুষ্ঠানিক ব্যবসাগুলো ধীরে ধীরে আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় প্রবেশ করতে পারবে।

বর্তমানে বাংলাদেশের এসএমই খাত একটি “অনানুষ্ঠানিকতার ফাঁদে” আটকে আছে। এই ব্যবসাগুলো অর্থনীতির প্রাণ হলেও তাদের বড় অংশ আনুষ্ঠানিক নথিপত্রের বাইরে পরিচালিত হয়। ফলে তারা বাস্তবে থাকলেও আর্থিক ব্যবস্থার কাছে অদৃশ্য হয়ে থাকে।
এই সমস্যাকে আরও জটিল করে তুলেছে জামানত-নির্ভর ঋণ ব্যবস্থা। বাংলাদেশে জমি বা সম্পত্তি ছাড়া ঋণ পাওয়া প্রায় অসম্ভব। এটি আধুনিক “অ্যাসেট লাইট ” ব্যবসার জন্য একটি বড় বাধা। ডিজিটাল ব্যবসা বা সেবাভিত্তিক প্রতিষ্ঠানগুলোর শক্তিশালী আয় এবং গ্রাহকভিত্তি থাকতে পারে, কিন্তু তাদের কাছে জমির মতো স্থাবর সম্পদ নেই।

বিশ্ব যখন ইনভয়েস ফাইন্যান্সিং বা ক্যাশ-ফ্লো ভিত্তিক ঋণ ব্যবস্থার দিকে এগোচ্ছে, তখন বাংলাদেশ এখনো মূলত স্থাবর সম্পদের ওপর নির্ভরশীল। এর ফলে ব্যবসার সক্ষমতার চেয়ে সম্পদের মালিকানাকে বেশি গুরুত্ব দেওয়া হচ্ছে।

এই আর্থিক বঞ্চনার মূল্য জাতীয় অর্থনীতির জন্য অনেক বড়। আনুষ্ঠানিক ঋণ না পেয়ে এসএমই উদ্যোক্তারা পরিবার, বন্ধু বা স্থানীয় মহাজনের ওপর নির্ভর করতে বাধ্য হন। অনেক ক্ষেত্রে তারা ৩০% থেকে ৪০% পর্যন্ত উচ্চ সুদে ঋণ নেন, যা ব্যবসার খরচ বাড়িয়ে দেয় এবং সম্প্রসারণের পথ বন্ধ করে দেয়।

বাংলাদেশের আর্থিক ব্যবস্থায় একটি স্পষ্ট ফাঁক রয়েছে, যাকে “মিসিং মিডল ” বলা হয়। একদিকে ক্ষুদ্র উদ্যোক্তারা মাইক্রোফাইন্যান্স থেকে সহায়তা পান, অন্যদিকে বড় করপোরেট প্রতিষ্ঠান সহজেই ব্যাংক ঋণ পায়। কিন্তু মাঝামাঝি অবস্থানে থাকা এসএমইগুলোই সবচেয়ে বেশি বঞ্চিত।

এই বৈপরীত্যের মধ্যে একটি অদ্ভুত বাস্তবতা দেখা যায়। ব্যাংকগুলো বলে তারা এসএমই-তে ঋণ দিতে চায়, কিন্তু ঝুঁকি ও কাগজপত্রের কারণে তা কঠিন মনে করে। অন্যদিকে উদ্যোক্তারা ঋণ নিতে চান, কিন্তু প্রয়োজনীয় জামানত বা নথিপত্রের অভাবে তা পান না।
এই ব্যবধান দূর করতে হলে ঋণ দেওয়ার দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করতে হবে। শুধুমাত্র জামানতের ওপর নির্ভর না করে ডিজিটাল লেনদেন, ব্যবসার কার্যক্রম এবং সম্ভাবনার ওপর ভিত্তি করে ঋণ মূল্যায়ন করতে হবে।
এই চ্যালেঞ্জের মাঝেই ফিনটেক একটি সম্ভাবনাময় সমাধান হিসেবে উঠে আসছে। ডিজিটাল আর্থিক সেবা, মোবাইল লেনদেন এবং ডেটা বিশ্লেষণ ঋণ মূল্যায়নের নতুন পথ তৈরি করছে। বিকল্প তথ্য বিশ্লেষণের মাধ্যমে একটি ব্যবসার ঝুঁকি আরও নির্ভুলভাবে নির্ধারণ করা সম্ভব।

বাংলাদেশ ব্যাংক ইতোমধ্যে ই-কেওয়াইসি এবং অনলাইন ঋণ কাঠামোর মতো উদ্যোগ নিয়েছে। তবে এর ব্যবহার এখনো সীমিত। ডেটার বিচ্ছিন্নতা এবং বিভিন্ন সিস্টেমের মধ্যে সমন্বয়ের অভাব বড় বাধা হিসেবে রয়ে গেছে।

বাংলাদেশে নীতির অভাব নেই, অভাব রয়েছে কার্যকর বাস্তবায়নের। এসএমই ঋণ বৃদ্ধি, নারী উদ্যোক্তা সহায়তা এবং আর্থিক অন্তর্ভুক্তি—এসব বিষয়ে বহু উদ্যোগ নেওয়া হয়েছে। কিন্তু বাস্তবে এর প্রভাব সীমিত।
এই ব্যবধান দূর করতে হলে ব্যাংকের জন্য প্রণোদনা তৈরি করতে হবে, ঝুঁকি ভাগাভাগির ব্যবস্থা চালু করতে হবে এবং একটি শক্তিশালী মনিটরিং ব্যবস্থা গড়ে তুলতে হবে।

এসএমই খাতের প্রকৃত সম্ভাবনা উন্মোচনের জন্য আমাদের পুরো অর্থায়ন ব্যবস্থাকে পুনর্বিবেচনা করতে হবে। প্রথমত, জামানতের সংজ্ঞা পরিবর্তন করতে হবে—যন্ত্রপাতি, মজুদ পণ্য এবং বকেয়া বিলকেও জামানত হিসেবে বিবেচনা করতে হবে। দ্বিতীয়ত, সরকার-সমর্থিত ক্রেডিট গ্যারান্টি স্কিমকে শক্তিশালী করতে হবে। তৃতীয়ত, ডেটা-নির্ভর ঋণ ব্যবস্থা চালু করতে হবে। এবং সর্বশেষে, উদ্যোক্তাদের আনুষ্ঠানিক কাঠামোয় আসতে উৎসাহিত করতে হবে।

সবশেষে, এসএমই শুধু অর্থনীতির একটি অংশ নয়—এটাই এর ভিত্তি। তারা উদ্ভাবন আনে, কর্মসংস্থান তৈরি করে এবং অর্থনীতিকে স্থিতিশীল রাখে। কিন্তু যতদিন তারা আর্থিকভাবে “অদৃশ্য” থাকবে, ততদিন তাদের পূর্ণ সম্ভাবনা বাস্তবায়িত হবে না।
বাংলাদেশের জন্য চ্যালেঞ্জটি শুধু অর্থায়ন বাড়ানো নয়—বরং মূল্যায়নের দৃষ্টিভঙ্গি পরিবর্তন করা।
একটি অর্থনীতি কখনোই পূর্ণ গতিতে এগোতে পারে না, যদি তার সবচেয়ে গতিশীল অংশটি প্রবেশদ্বারের বাইরে পড়ে থাকে।

সময় এসেছে এসএমই-কে ঝুঁকি হিসেবে নয়, বরং জাতীয় প্রবৃদ্ধির প্রধান চালিকাশক্তি হিসেবে দেখার।

লেখক : এলিন মাহবুব একজন লেখক, যিনি উদ্যোক্তা উন্নয়ন, এসএমই (ক্ষুদ্র ও মাঝারি উদ্যোগ) প্রবৃদ্ধি এবং ব্যবসায়িক অন্তর্দৃষ্টি বিষয়ে বিশেষভাবে কাজ করেন।

spot_img

Share post:

ইপেপার

জনপ্রিয়

More like this
Related

খুলনায় টাইগার গার্ডেন হোটেলে এসি বিস্ফোরণে আগুন, পুড়ে গেছে কক্ষের সব মালামাল

এম রোমানিয়া, খুলনা ব্যুরো খুলনায় নগরীর শিববাড়ি মোড়ের টাইগার গার্ডেন...

বলিভিয়ায় সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণ, নিহত অন্তত ১০

বলিভিয়ায় একটি সামরিক ঘাঁটিতে ভয়াবহ বিস্ফোরণে অন্তত ১০ জন...

বাবার চাকুরির জন্য সন্তানের মানববন্ধন

দিনাজপুর প্রতিনিধি বাবার চাকরি ফিরে পাওয়ার আশায় মধ্যপাড়া গ্রানাইট...

ছিটকিনি লাগানোকে কেন্দ্র করে ববিতে দফায় দফায় সংঘর্ষ

বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় প্রতিনিধি 
বরিশাল বিশ্ববিদ্যালয় (ববি) সংলগ্ন একটি মেসের...